সংঘাত-রক্তপাতের রাজনীতির আশঙ্কা জোরালো করে ফের রাজপথ দখলের হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তার শরিকরা। তাদের দাবি, বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে গণভোটের রায় এবং জনআকাক্সক্ষার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তারা বলছে, সরকার গণভোটের রায় উপেক্ষা করে দেশকে নতুন করে রাজনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গণরায় দ্রুত না মানলে পরিস্থিতি বিবেচনায় হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচির দিকে অগ্রসর হবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আপাতদৃষ্টিতে সংস্কারের বিপক্ষে নয় সরকার। ফলে সম্ভাবনা বিবেচনায় এখনই কোনো ধরনের সহিংস আন্দোলনের পক্ষে থাকবে না জনগণ।
রাজধানীসহ সারা দেশে প্রচণ্ড বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে জামায়াতসহ ১১-দলীয় জোটের গণমিছিল ও সমাবেশ হচ্ছে। সমাবেশ থেকে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জ্বালানি সংকট নিরসন এবং সংবিধান সংস্কারের দাবি জোরালো হচ্ছে। সমাবেশগুলোতে জোটের নেতাকর্মীরা বলছেন, জনগণের অধিকার আদায় এবং চলমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করা হবে। দাবি না মানলে আগামীতে আন্দোলন হবে আরও কঠোর। এনসিপি বলছে, সংস্কারের পক্ষে ভোট চেয়ে এখন তা বাস্তবায়ন না করাই মূলত অন্তহীন প্রতারণা। যারা গণভোটে সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তার প্রতিফলন না দেখলে তারা চুপ করে বসে থাকবেন না। তারা রাজপথে নেমে আসবেন।
রাজনীতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার সরাসরি সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নেয়নি; বরং ধাপে ধাপে কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে সরাসরি সংঘাতমুখী রাজনীতির যৌক্তিকতা নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘাত ও সহিংসতার অভিজ্ঞতা থেকে সাধারণ জনগণও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং পূর্বানুমেয় রাজনৈতিক পরিবেশকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে গণআন্দোলনের সম্ভাবনা থাকলেও তা সহিংস রূপ নেবে- এমন সম্ভাবনা সীমিত। একই সঙ্গে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে প্রতিফলিত না হয়, কিংবা বিরোধী মত দমনের অভিযোগ জোরদার হয়, তা হলে জনঅসন্তোষ দ্রুত তীব্র হতে পারে। সেক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ, সংলাপের পরিবেশ বজায় রাখা এবং জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটানো পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখবে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, জনআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রতারণা করেছে বিএনপি। জুলাই সনদের আড়ালে গণভোটের রায়কে অস্বীকার করা হচ্ছে। এটি কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, সরাসরি জনগণের ম্যান্ডেটের বিরুদ্ধে অবস্থান। তিনি বলেন, সরকার সচেতনভাবেই জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায়- এই দুই বিষয়কে আলাদা করে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। তার দাবি, সরকার ও মন্ত্রীরা সংসদে দাঁড়িয়ে বারবার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও গণভোটে জনগণের দেওয়া সরাসরি রায়ের বিষয়ে নীরবতা বজায় রাখছে। তিনি আরও বলেন, একবারও কোনো মন্ত্রী বলেননি গণভোটের রায় অক্ষরে অক্ষরে মানা হবে। কারণ তারা জানেন, সেটি মানলে তাদের রাজনৈতিক হিসাব ভেঙে পড়বে। গণভোটের আগে দীর্ঘ চার মাস সময় থাকা সত্ত্বেও সরকার বা সংশ্লিষ্টরা কেন কোনো আপত্তি তোলেনি। ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদে স্বাক্ষর, ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশ, ২৫ নভেম্বর গণভোটের অধ্যাদেশ, ফেব্রুয়ারিতে ভোট- এই পুরো সময় কেউ বলেননি এসব অসাংবিধানিক। অথচ ক্ষমতায় বসেই সবকিছু অবৈধ বলা হচ্ছে। এটি সুস্পষ্ট দ্বিচারিতা।
গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের বর্তমান অবস্থানে কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতা স্পষ্ট। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের রায়কে অস্বীকার করা হচ্ছে। এটি গণতন্ত্র নয়, ফ্যাসিবাদের লক্ষণ। তিনি সতর্ক করেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশে আবারও সংঘাত, অস্থিরতা ও রক্তপাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, পার্লামেন্টে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলনের পথেই যেতে বাধ্য হবে সংশ্লিষ্টরা। পাঁচ কোটি মানুষ যে রায় দিয়েছে, তা যদি সংসদে বাস্তবায়ন না হয়, আমরা আবার জনগণের কাছে ফিরে যাব। আন্দোলনই তখন একমাত্র পথ। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এখনো সুযোগ আছে। সংকট এড়াতে হলে জনগণের ম্যান্ডেটকে সম্মান করতে হবে। অন্যথায় এর দায় সরকারকেই নিতে হবে।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, সরকারকে অনতিবিলম্বে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণ করতে হবে। কারণ প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার এ রায় প্রদান করেছেন। এ রায় নিয়ে টালবাহানা করলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলে গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করা হবে।
জোটের নেতারা বলেন, দেশ এক সংকটময় সময় অতিক্রম করছে। জনগণের প্রত্যাশা ও গণতান্ত্রিক অধিকার দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং গণভোটের রায় কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি। বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও গণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের মতামতের প্রতিফলন জরুরি। সরকার যদি জনগণের প্রত্যাশাকে সম্মান না করে, তবে গণআন্দোলনের মাধ্যমেই জনগণ তাদের ন্যায্য অধিকার আদায় করবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেন, ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারকে ‘হুঁশে ফিরে’ এসে সংস্কারে মনোযোগ দিতে হবে। গণভোটের রায় যদি না মানে, তা হলে এই সরকারকে আমরা সেদিন থেকেই অবৈধ সরকার বলা শুরু করব। আমরা এটার জন্য সময় নেব না। আপনারা যেমন আমাদের সব অর্জন ধূলিসাৎ করে দেওয়ার জন্য সময় নিচ্ছেন না, আমরাও কিন্তু সেটার জন্য সময় নেব না।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকার শুধু জুলাই সনদ নয়, তাদের নিজেদের ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামত কর্মসূচি বাস্তবায়নের নীতিও মানছে না। সরকারের প্রাথমিক কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে, তারা ক্রমেই পুরোনো দলীয়করণ নীতির পথে হাঁটছে। সরকার যদি দ্রুতই জনআকাক্সক্ষা পূরণে উদ্যোগী না হয়, তবে আন্দোলন ছাড়া বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, বিএনপি ঐকমত্য কমিশনে থেকে সবকিছুতে স্বাক্ষর করলেও এখন সব অবজ্ঞা করছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। দেশের নাজুক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে আমরা এখনই হরতাল-অবরোধ না দিয়ে ধাপে ধাপে কর্মসূচি দিচ্ছি। কিন্তু বিএনপি যদি পরিবর্তন না চায় এবং পূর্ববর্তী সরকারের মতো আচরণ করে, তবে জনরোষের মুখে সরকার শান্তিতে থাকতে পারবে না।
গণভোটের রায় কার্যকর ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে আন্দোলনে নেমেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য। বর্তমানে দেশজুড়ে ‘প্যাকেজ কর্মসূচি’ পালন করা হচ্ছে। এরপরও দাবি আদায়ে কাজ না হলে পর্যায়ক্রমে কঠোর আন্দোলনের কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে এ জোট। এরই মধ্যে সমাবেশ, মহাসমাবেশ, গণমিছিল, সেমিনার, লিফলেট বিতরণ ও দেয়াল লিখনের পর বিভাগীয় শহরগুলোতে সমাবেশ করা হচ্ছে। ১১-দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা বলছেন, রাজপথে আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য হলো রাজনৈতিক চাপ বাড়ানো এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করা। রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ধাপে ধাপে কর্মসূচির তীব্রতা বাড়ানো হবে। পরিস্থিতি বুঝে হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচির দিকে যাওয়ার বিষয়েও জোটে আলোচনা চলছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন