ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হয়েও সম্মানীভাতা নিচ্ছেন ঝালকাঠির আবুল কাশেম

ঝালকাঠি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মে ৯, ২০২৬, ১২:৪৬ এএম

‎ঝালকাঠিতে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হয়েও সরকারি সুবিধা ভোগের অভিযোগ উঠেছে আবুল কাশেম হাওলাদার নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। তিনি ঝালকাঠি সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের বালিঘোনা গ্রামের বাসিন্দা আয়নালী হাওলাদারের ছেলে।

‎সূত্রে জানা গেছে, আবুল কাশেম নিজেকে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র, মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও সম্মানীভাতা গ্রহণ করে আসছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন এবং কখনো যুদ্ধে অংশ নেননি। তবুও সরকারি সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে বয়স পরিবর্তন করে ও জাল প্রত্যয়নপত্র ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা ভোগ করছেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে ২০২১ সালের ১০ জানুয়ারি জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুল কাদের খান। তিনি অভিযোগে উল্লেখ করেন, ‘আবুল কাশেম হাওলাদার আমার (তৎকালীন ফিল্ড কমান্ডারের) স্বাক্ষর জাল করে একটি ভুয়া প্রত্যয়নপত্র তৈরি করেছে। তিনি কখনোই আমার সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেননি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৭-৯ বছর।’

‎অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আবুল কাশেম যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারের কাছ থেকে সাভারে জমি ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা নিয়েছেন। এমনকি তিনি দুইটি জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করছেন। একটি স্মার্ট কার্ড ও একটি সাময়িক এনআইডি। স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, আবুল কাশেমের জন্ম তারিখ সরকারিভাবে ১৯৫৯ হলেও তিনি মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেতে তা পরিবর্তন করে ১৯৪৯ সাল দেখিয়েছেন। এ-সংক্রান্ত জালিয়াতির বিষয়টি আরও স্পষ্ট বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। তাদের অভিযোগ, সরকারের কোটি কোটি টাকা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা হিসেবে অপচয় হচ্ছে। এদিকে, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আ. কাদের খান একটি প্রত্যয়নে জানান, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত থেকে যুদ্ধ শুরু হয়, অথচ আবুল কাশেমের কথিত প্রত্যয়নপত্রে ৩১ জানুয়ারি ১৯৭১ তারিখ দেওয়া হয়েছে, এটি স্পষ্টতই জাল। বর্তমান ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল হাকিম হাওলাদার বলেন, আবুল কাশেম কোথায় মুক্তিযুদ্ধ করেনি, তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতেই আহত হয়েছে।

এই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেমের গেজেট নং-২৫৫। তার প্রকৃত জন্ম তারিখ ঝালকাঠি সমাজসেবা অধিদপ্তরে আছে এবং স্মার্ট কার্ডে ১৯৫৯, তা পরিবর্তন করে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৯ করা হয়েছে। এই ন্যাশনাল আইডি কার্ডটি সাময়িক জাতীয় পরিচয়পত্র। তার জন্ম তারিখ ভুয়া। আবুল কাশেমের বড় চার ভাই-বোন আছে। তারা হলেনÑ মালেকা, মনোয়ারা মহিউদ্দিন ও ফরিদা, এরপর আবুল কাশেম। ভাই মহিউদ্দিন হাওলাদারের জন্ম ১১ জানুয়ারি ১৯৬১ সালে। তার তিন বোন সবার বড়। এলাকাবাসীর দাবিÑ আবুল কাশেমের বড় ভাই ও বড় (তিন) বোনের জন্মসনদ যাচাই করলে আবুল কাশেমের বয়স কত তা জানা যাবে। সরকারের ঘোষণা ছিল বয়স পরিবর্তনের, যার সাল ছিল ২০১৩-১৪ ইং; কিন্তু তার বয়স পরিবর্তন করেছে ২০১৬-১৭ সালে।  এলাকাবাসী দাবি করেছে। এই অমুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম হাং দুইটি এনআইডি কার্ড ব্যবহার করেন। ১। স্মার্ট কার্ড, ২। সাময়িক এনআইডি কার্ড।

সরেজমিনে ও এলাকার লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে জানা যায়, ১৯৭১ স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। সে সময় এই জেলায় ব্যারিস্টার আখতার উদ্দিন আহমেদ ছিল মুসলিম লীগ নেতা ও মন্ত্রী। সে সময় তার একটি ছোট লঞ্চ ছিল। এই লঞ্চ চালাতো বালিঘোনা গ্রামের খোড়া আয়েনালী ও তার ছেলে মহিউদ্দিন। সেই সুবাদে তার ছোট ছেলে আবু কাশেম ঐ লঞ্চে থাকতো। তখন তার বয়স ৭-৯ বছর। এই লঞ্চ বানাড়িপাড়া হইতে বরিশাল লাইনে চালানো হত। যুদ্ধের সয়য় এক রাতে এই লঞ্চে তৎকালীন শান্তি কমিটির সদস্যরা আছে শুনে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের দাওয়া করে। শান্তি কমিটির সদস্যরা রাতের আঁধারে লঞ্চে বরিশাল যাচ্ছিল। পথে কালিজিরা নদীতে (গগনের হাট) গেলে মুক্তিযোদ্ধারা জানতে পেরে  গুলি ছুড়লে সেই গুলি এই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেমের মাথায় ও মুখে লাগে। সে সময় লঞ্চ নিয়ে পালিয়ে ওদের বাড়িতে আসে। তখন রাত ৩টা। এরপর তাকে বরিশাল সদর হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে অন্যত্র গোপন রাখে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সে বরিশাল থেকে বাড়িতে আসে। স্বাধীনতার পর প্রায় ৫২ বছর পরে এলাকাবাসী জানতে পায় আবুল কাশেম মুক্তিযোদ্ধা। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম বলে বেড়াচ্ছে, আমাকে সরকার সাভারে ৬ কাঠা জমি দিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে লোন দিয়েছে বাড়ি করার জন্য। এখানে উল্লেখ্য যে, আবুল কাশেমের ভাই মহিদ হাওলাদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে গানশিপে এসে বিনয়কাঠি ইউনিয়নের মুরাসাতা গ্রামের মোতাহার শরীফের বাড়িতে আগুন লাগিয়েছে এবং অনেকগুলো ঘর পুড়েছে। তাই তদন্ত সাপেক্ষে এই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। সার্বিক অভিযোগ অস্বীকার করে আবুল কাশেম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এইসব বানানো অভিযোগ। আমি বর্তমান ইউনিয়ন কমান্ডার আব্দুল হাকিম হাওলাদারের সঙ্গে যুদ্ধ করিনিÑ যুদ্ধ করেছি শাহজাহান ওমর ও বেণী লালের সঙ্গে।