কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ি। বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা একটা দ্বীপ, যেখানে লবণ খেতের নীরব জীবন ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা, সেখানে এখন গড়ে উঠছে এক গভীর সমুদ্রবন্দরÑ যাকে ঘিরে বদলে যাচ্ছে পুরো দেশের অর্থনীতির চাকা। যেখানে সম্ভাবনা, প্রতিযোগিতা আর পরিবর্তনের নাম হয়ে উঠছে মাতারবাড়ি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বন্দর চালু হলে সিঙ্গাপুর বা কলম্বো হয়ে পণ্য স্থানান্তরের যে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল নির্ভরতা, তা অনেকাংশে কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে আগামীতে মাতারবাড়ি বন্দরই প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে সিঙ্গাপুর-কলম্বো বন্দরের।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য মতে, মাতারবাড়ি বন্দর উন্নয়ন নামে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে ২৪৩৮১,৪০৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে। জানা যায়, প্রকল্পটি তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপ ২০২৫ থেকে ২০৩০, দ্বিতীয় ধাপ ২০৩০ থেকে ২০৪৫ এবং তৃতীয় ধাপ ২০৪৫ থেকে ২০৫৫ পর্যন্ত। বিডা ও মিডার মাধ্যমে ৩৩ হাজার একর জমিতে এই প্রকল্প কার্যকর করা হচ্ছে।
বন্দরের পরিসংখ্যান বলছে, প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে প্রথম ধাপে ১১ লাখ এবং ২০৪১ সালে ২৬ লাখ টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা যাবে। ২০৪১ সালের মধ্যে আনুমানিক ২ দশমিক ২ থেকে ২ দশমিক ৬ মিলিয়ন টিইইউএস কন্টেইনার কার্গো হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে শিপিং ব্যবসায়ীরা বলছেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বন্দরনির্ভর বাণিজ্য কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে সিঙ্গাপুর-কলম্বোকেন্দ্রিক। সেই কাঠামোর ভেতরেই নতুন এক বিকল্প শক্তি হিসেবে উঠে আসতে চাইছে মাতারবাড়ি। যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী অবকাঠামো ও পরিচালনা গড়ে ওঠে, তা হলে এটি আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট ম্যাপে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
আগামীতে বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানিকারকদের আর ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্ট ব্যবহার করতে হবে না। ইউরোপ-আমেরিকা থেকে সরাসরি বড় জাহাজ ভিড়বে মাতারবাড়ি জেটিতে। ফলে সময় এবং ব্যয় দুই-ই কমে যাবে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, মাতারবাড়ি বন্দরের কার্যক্রম শুরু হলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের আমদানি-রপ্তানির পরিধি যেমন অনেক বাড়বে, তেমনি শিপিং সেক্টরে নতুন পথের ব্যবসা সৃষ্টি হবে।
তিনি আরও বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, মধ্য এশিয়ার মিয়ানমার, পশ্চিম চীন, নেপাল, ভুটানসহ ভারতের সেভেন সিস্টার্সখ্যাত সাত রাজ্য এই বন্দরের সুবিধা পাবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব প্রকৌশলী সৈয়দ রেফায়েত হামিম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হবে। দেশের আমদানি-রপ্তানির জন্য এ প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সচিব আরও বলেন, বতমানে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে ২০০০-২৫০০ টিইইউএস কন্টেইনার নিয়ে জাহাজ আসতে জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করতে হয়। মাতারবাড়িতে যেকোনো সময় ১৪ মিটার ড্রাফটের বিশালাকারের ৮ থেকে ১০ হাজার টিইইউএস বহনকারী কন্টেইনারবাহী কার্গো জাহাজ অনায়াসে মাতারবড়ি বন্দরে ভিড়তে পারবে। এতে করে সময় কমার সঙ্গে কমবে পণ্য পরিবহন খরচ। ফলে আমদানি-রপ্তানিকারকরা এই বন্দর ব্যবহারে উৎসাহিত হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন