যে মাঠ হওয়ার কথা ছিল সোনালি ধানের হাসিতে ভরে ওঠার, সেখানে আজ শুধুই হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাস। কৃষকের ঘাম, শ্রম আর স্বপ্নে লালিত বোরো ধান এখন মাঠজুড়ে অঙ্কুরিত সবুজ চারায় পরিণত হয়েছে। গতকাল সোমবার সকালে বরগুনার তালতলী উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বিস্তীর্ণ মাঠ ঘুরে দেখা যায়, কাটা ও আঁটি বেঁধে রাখা ধান কিংবা জমিতে নুয়েপড়া শীষ থেকে গজিয়ে উঠেছে নতুন সবুজ চারা। টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা এবং সময়মতো ধান ঘরে তুলতে না পারায় কৃষকের সোনালি স্বপ্ন এখন বিষাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। কালবৈশাখী ঝড়ের প্রভাব কাটতে না কাটতেই অকাল বৃষ্টি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। শ্রমিক সংকট ও যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক কৃষক সময়মতো ধান কাটতে পারেননি। আবার কেউ ধান কেটে মাঠে রাখলেও টানা বৃষ্টিতে তা পচে গিয়ে শীষের ভেতরেই অঙ্কুরোদগম শুরু হয়েছে। মাঠের পর মাঠ এখন সবুজ অঙ্কুরে ঢেকে গেছে। দূর থেকে দেখে মনে হয় যেন ঘাস জন্মেছে, অথচ সেই সবুজের নিচে চাপা পড়ে আছে কৃষকের সারা বছরের আশা, পরিশ্রম ও জীবিকা।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক শহিদুল ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এই ধান আছিল আমার বাঁচার ভরসা। এনজিও থেইকা ঋণ নিছি, জমিতে সার-ওষুধ দিছি, কত কষ্ট করছি। রোদে পুইড়া, বৃষ্টিতে ভিইজা দিন-রাত মাঠে আছিলাম। ভাবছিলাম ধান উঠলে সংসারটা একটু সামলাইতে পারমু। কিন্তু আল্লাহ এমন পরীক্ষা দিব বুঝি নাই। এখন মাঠে ধান না, সবুজ ঘাস জন্মাইছে। এই ক্ষতি কেমনে সামলাই, কিছুই বুঝতাছি না।’
কৃষক আবুল হাসান বলেন, ‘আমাগো গরিব মানুষের সব স্বপ্ন এই ধানের ওপর। পোলাপানের মুখে ভাত দিব, ঋণ শোধ করমুÑ এই আশায় চাষ করছি। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে সব শেষ হইয়া গেছে। ধান ঘরে তোলার আগেই শীষে চারা গজাইছে। এখন মনে হয় বুকের ভিতরটা ফাঁকা হইয়া গেছে। কিস্তির চিন্তা, সংসারের চিন্তাÑ রাইতে ঘুমও আসে না।’
উপজেলার আরও একাধিক কৃষক জানান, মাঠে যা দেখা যাচ্ছে তা শুধু ধান নষ্ট হওয়ার দৃশ্য নয়, এটি কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার বাস্তবতা। অঙ্কুরিত হওয়ায় ধানের গুণগত মান নষ্ট হয়ে গেছে। বাজারে এই ধানের মূল্য খুবই কম। উৎপাদন খরচের সামান্য অংশও উঠবে না বলে আশঙ্কা করছেন তারা। ফলে ঋণের বোঝা, সংসারের খরচ ও ভবিষ্যৎ চাষাবাদ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কৃষক পরিবারগুলো।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু জাফর মো. ইলিয়াস বলেন, ‘অতিরিক্ত বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে অনেক জমির ধানে অঙ্কুরোদগম হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।’
তালতলী সরকারি কলেজের অধ্যাপক ও কৃষি গবেষক আ. হালিম বলেন, ‘ধান পরিপক্ব হওয়ার পর দীর্ঘসময় ভেজা অবস্থায় থাকলে শীষের ভেতরেই অঙ্কুরোদগম শুরু হয়। এতে ধানের গুণগত মান মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়ে যায় এবং বাজারমূল্যও কমে যায়। অনেক কৃষক সঠিক সময়ে ধান তুলতে পারেননি, ফলে ফসল খেতেই নষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া অনেক এলাকায় পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে এ ধরনের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। এভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলাবদ্ধতা অব্যাহত থাকলে কৃষকরা ভবিষ্যতে ধান চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এখনই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক এনজিও ম্যানেজার বলেন, ‘কিস্তির টাকা আদায়ের জন্য ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে চাপ থাকে। তবে মাঠের বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক কৃষকই কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। বাস্তবতা হলো, ফসলহানির কারণে তারা চরম সংকটে আছেন। অনেক ফিল্ড অফিসারও মানবিক দিক বিবেচনা করে গ্রাহকদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করছেন।’
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কৃষি ঋণের কিস্তি সাময়িক স্থগিত বা চাপ প্রয়োগ না করে সহজ শর্তে আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া আগামী মৌসুমের জন্য কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ ও সার দেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন