ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬

বরাদ্দ বাড়িয়ে ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা করার প্রস্তাব

জ্বালানি নিরাপত্তায় বহুমুখী উদ্যোগ

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ১২, ২০২৬, ০৫:৪০ এএম

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ সময় বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতের গুরুত্ব বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের বিশ্বাস প্রস্তাবিত উদ্যোগগুলোর সফল বাস্তবায়ন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সহায়ক হবে। আমির খসরু বলেন, বিগত সরকারের অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি এবং এ খাতে সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিদ্যুৎ খাতে হরিলুট ও অর্থ পাচার হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিগত সরকারের সময়ে সম্পাদিত বেশকিছু মেগা প্রকল্পে একতরফা ও বিতর্কিত শর্ত যুক্ত থাকায় বিদ্যুৎ আমদানি ও ক্রয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা আমাদের ওপর চেপে বসেছে। এ খাতে বার্ষিক ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলেও যোগ করেন তিনি।

বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ কমেছে ৫ হাজার কোটি টাকা : বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতে বরাদ্দ বাড়লেও বিদ্যুৎ খাতে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ ছিল ২০ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুতে বরাদ্দ ছিল ২০ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুতের উন্নয়নে বরাদ্দ প্রস্তাব ছিল ২৯ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা; যা সংশোধিত বাজেটে কমে ২১ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা করা হয়।

বাজেটে দীর্ঘ সময় ধরে অগ্রাধিকার পাওয়া বিদ্যুৎ খাত ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে বরাদ্দ কমিয়ে আনা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৯ হাজার ২৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব ছিল; যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা কম। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদ্যুতে বরাদ্দ ছিল ৩৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। আর সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে এনে ২৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা করা হয়।

বাজেট বক্তৃতায় মন্ত্রী বলেছেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি এবং এ খাতের সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিদ্যুৎ খাতে হরিলুট ও অর্থ পাচার হয়েছে। বেশকিছু মেগা প্রকল্পে একতরফা ও বিতর্কিত শর্ত যুক্ত থাকায় বিদ্যুৎ আমদানি ও ক্রয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা আমাদের ওপর চেপেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট হলেও নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি। আমরা বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধ করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়েছে। অদক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছি। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৪০ শতাংশ গ্যাসভিত্তিক। গ্যাসের মজুত কমে যাওয়ায় আমদানিকৃত গ্যাস দিয়ে উৎপাদন করা ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে ২০৩০ সালে উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে ৩০ শতাংশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে আয়-ব্যয়ের ব্যবধান বা বাজেট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

জ¦ালানি নিরাপত্তায় বহুমুখী উদ্যোগ : জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, তেল শোধন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে সরকার। আগামী তিন বছরে ব্যাপক ভূতাত্ত্বিক ও সাইসমিক জরিপ, নতুন কূপ খনন, অফশোর গ্যাস অনুসন্ধান এবং নতুন রিফাইনারি নির্মাণসহ একাধিক উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট বক্তৃতায় মন্ত্রী বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের দীর্ঘদিনের ভুল নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে দেশের জ্বালানি খাত গভীর সংকটে পড়েছে। সে সময় মূলত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও জ্বালানি তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হলেও স্থলভাগ ও বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধান, তেল পরিশোধন এবং মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেল ও এলএনজির স্পট মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তবে সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় সরকার বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়েছে, জ্বালানি তেলের দাম সীমিতভাবে সমন্বয় করেছে এবং গ্যাসের সরবরাহ ও মূল্য অপরিবর্তিত রেখেছে।

জ্বালানি খাতে সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে আগামী তিন বছরে বাপেক্সের মাধ্যমে ২৭০ কিলোমিটার ভূতাত্ত্বিক জরিপ, ৭০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক (টু-ডি) সাইসমিক জরিপ এবং ৭০০ বর্গকিলোমিটার ত্রিমাত্রিক (থ্রি-ডি) সাইসমিক জরিপ সম্পন্ন করা। পাশাপাশি মধ্যমেয়াদে বাপেক্সের নিজস্ব রিগ ব্যবহার করে ৬৯টি কূপ খনন এবং ৩১টি কূপের ওয়ার্কওভার সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জ্বালানি অনুসন্ধান কার্যক্রমে সক্ষমতা বাড়াতে নতুন অনুসন্ধান রিগ কেনা হবে।

বাজেটে আরও বলা হয়, জ্বালানি আমদানিতে একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখীকরণ নীতি অনুসরণ করা হবে। মহেশখালীতে বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পাশাপাশি নতুন টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মাতারবাড়িতে একটি স্থলভিত্তিক (ল্যান্ড-বেজড) এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণ ও পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। জ্বালানি তেল পরিবহনে নির্মিত ৬০১ দশমিক ৫০ কিলোমিটার পাইপলাইনের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।

পাশাপাশি তেল খালাস কার্যক্রমে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বা উপকূলীয় শিল্পাঞ্চলে ধাপে ধাপে ৫০ লাখ মেট্রিক টন পরিশোধন সক্ষমতার নতুন ক্রুড অয়েল রিফাইনারি নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। আগের অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১৬ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা।

২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ খাতে শূন্য করের প্রস্তাব : পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানি উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য শতাংশ কর সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কর রেয়াত সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারে উৎসাহ দিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নতুন নিবন্ধন ও নবায়নের ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর নির্ধারণ করা হবে।