ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬

অবৈধ পথে গ্রিস যাওয়ার সময়

সমুদ্রে ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় মানবপাচার চক্রের এক সদস্য গ্রেপ্তার

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২৬, ০৫:৫০ এএম

অবৈধভাবে সমুদ্রপথে গ্রিসে পাঠানোর সময় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নৌকা ডুবে ১৮ বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় মানব পাচারকারী চক্রের হোতা মোহাম্মদ মিকাইল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির অভিযানে সিলেট এলাকা থেকে এ মানবপাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সিআইডি জানিয়েছে, চলতি বছরের মার্চ মাসে ভূমধ্যসাগরে গ্রিসে যাওয়ার সময় প্রাণ হারান ১৮ জন বাংলাদেশি। পরে মারা যাওয়া ১৮ বাংলাদেশির মরদেহ সাগরে ফেলে দেয় মানবপাচারকারীরা। সেই হতভাগ্য নিহতদের তালিকায় ছিল মাসুম (ছদ্মনাম)। পরে এ ঘটনায় নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। মামলাটি তদন্ত করে সিআইডির মানব পাচার প্রতিরোধ ইউনিট। এ মামলার তদন্ত করতে গিয়ে চক্রের বাংলাদেশি সহযোগী মোহাম্মদ মিকাইল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভূমধ্যসাগরে নিহতদের একজন ভুক্তভোগী মাসুম (ছদ্মনাম) ও গ্রেপ্তারকৃত অভিযুক্ত মোহাম্মদ মিকাইল ইসলাম একই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার আশায় মাসুম মানব পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে ইউরোপ যাত্রার বিপজ্জনক পথে পা বাড়ান। মানবপাচার চক্রটি ইউরোপের দেশ গ্রিসে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে মাসুমের পরিবারের কাছে মোট ১৩ লাখ টাকা দাবি করে। চক্রের সদস্যরা প্রথমে বিমানযোগে লিবিয়ায় পাঠানোর জন্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং গ্রিসে পৌঁছানোর পর আরও ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের শর্ত দেয়। উন্নত জীবনের আশায় পরিবারের সদস্যরা দালাল চক্রের কথায় বিশ্বাস করে এ অর্থ পরিশোধে সম্মত হন। ঢাকায় ১৭ দিন থাকার পর চক্রের সদস্যরা অন্যদের সঙ্গে মাসুমকেও লিবিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছানোর পর মাসুম পরিবারকে ফোনে এই চক্রের এক সদস্যকে টাকা পাঠানোর নির্দেশনা দেয়। নির্দেশনা মোতাবেক একটি ব্যাংক হিসাবে গত জানুয়ারি মাসে ৪ লাখ টাকা জমা করেন মাসুমের পিতা। কয়েক দিন পর গ্রেপ্তারকৃত অভিযুক্ত মিকাইল মিয়ার কাছে নগদ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ভূমধ্যসাগরের উত্তাল জলরাশিতে নিভে যায় তার জীবন। প্রতিকূল আবহাওয়ায় পথ হারিয়ে টানা ৬ দিন খাবার ও পানীয় ছাড়াই সমুদ্রে ভাসতে থাকায় যাত্রীরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও চরম ক্লান্তিতে মৃত্যু হয় বেশ কয়েকজনের। পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো মাঝসমুদ্রেই ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে উদ্ধার হওয়া জীবিত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

মামলাটির তদন্তে জানা যায়, একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্র ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশগমনেচ্ছু ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করত। চক্রটি বৈধ অভিবাসনের পরিবর্তে অবৈধভাবে লিবিয়া হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর নামে মানবপাচার কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের আটকে রেখে বিভিন্নভাবে অর্থ আদায় এবং ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে ইউরোপে পাঠানোর ব্যবস্থা করত। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মাসুমকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে কয়েক মাস অবস্থানের পর গত চলতি বছরের ২১ মার্চ  ১৮ জন বাংলাদেশিসহ মোট ৪৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে অবৈধ সমুদ্রপথে গ্রিসের উদ্দেশে পাঠানো হয়। যাত্রাপথে নৌযানটি কয়েক দিন ভূমধ্যসাগরে আটকা পড়ে। খাদ্য ও পানির তীব্র সংকটে একে একে অসুস্থ হয়ে পড়েন যাত্রীরা। অবশেষে অনাহার ও পানিশূন্যতায় প্রাণ হারান একাধিক ব্যক্তি, যাদের মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে যে মৃতদের মধ্যে তাদের মাসুমও রয়েছেন। গ্রিসে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ১৩ লাখ টাকা গ্রহণ করা হয়।

মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতায় মানবপাচার চক্রের সদস্য মোহাম্মদ মিকাইল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মানবপাচার কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে। গ্রেপ্তারকৃতকে পরবর্তী আইনানুগ প্রক্রিয়ার জন্য আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে সিআইডির টিএইচবি ইউনিট। এ প্রতারক চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, আর্থিক লেনদেনের উৎস অনুসন্ধান এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততা উদ্ঘাটনে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

সিআইডি বিদেশে কর্মসংস্থান, অভিবাসন বা ভ্রমণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত ও বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণের জন্য জনসাধারণকে পরামর্শ প্রদান করছে। একই সঙ্গে মানবপাচার, জাল ভিসা, অভিবাসী চোরাচালান কিংবা এ ধরনের অপরাধ সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে সিআইডিকে অবহিত করার জন্যও অনুরোধ জানানো হচ্ছে।