ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬

বিশ্ব মরুময়তা ও খরা দিবস

চারণভূমি ও তৃণভূমি পুনরুদ্ধারের আহ্বান পরিবেশমন্ত্রীর

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২৬, ০৫:৫৫ এএম

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বিশ্ব মরুময়তা ও খরা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে চারণভূমি ও তৃণভূমি পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল বুধবার রাজধানীর পরিবেশ অধিদপ্তরে বিশ্ব মরুময়তা ও খরা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ আহ্বান জানান।

পরিবেশমন্ত্রী  বলেন, বিশ্ব মরুময়তা ও খরা দিবস শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়। এটি ভূমি, পরিবেশ, খাদ্য নিরাপত্তা, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ বছরে দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘জধহমবষধহফং : জবপড়মহরুব, জবংঢ়বপঃ, জবংঃড়ৎব’, যা পৃথিবীর চারণভূমি ও প্রাকৃতিক তৃণভূমি সংরক্ষণ এবং পুনরুদ্ধারের গুরুত্ব তুলে ধরে। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক স্থলভাগ কোনো না কোনো ধরনের চারণভূমি ইকোসিস্টেমের অন্তর্ভুক্ত, যা কোটি কোটি মানুষের জীবিকা, খাদ্যব্যবস্থা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পানি চক্র এবং কার্বন সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ মরুভূমির দেশ না হলেও মরুময়তা, ভূমি অবক্ষয় এবং খরার ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, অনিয়ন্ত্রিত ভূমি ব্যবহার, মাটির উর্বরতা হ্রাস, লবণাক্ততার বিস্তার, নদীভাঙন, বন উজাড় এবং দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক মৌসুম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমি অবক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত জমি, পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষয়প্রাপ্ত পাহাড়ি ভূমি এবং নদী অববাহিকার ভঙ্গুর ইকোসিস্টেম উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

তিনি উল্লেখ করেন, গবেষণা অনুযায়ী দেশে মাঝারি থেকে অতিতীব্র মাত্রার ভূমি অবক্ষয়ের পরিমাণ ২০০০ সালের ১০.৭০ মিলিয়ন হেক্টর থেকে ২০২০ সালে বেড়ে ১১.২৪ মিলিয়ন হেক্টরে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ গত দুই দশকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২৭ হাজার হেক্টর ভূমি অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে। একইভাবে খরাপ্রবণ এলাকার পরিমাণ ২০০০ সালের ১.৪৩ মিলিয়ন হেক্টর থেকে ২০২০ সালে ১.৫৪ মিলিয়ন হেক্টরে পৌঁছেছে, যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় ১০.৪ শতাংশ। অন্যদিকে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার কৃষি উৎপাদন, সুপেয় পানি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ভূমি ও পানি সম্পদের ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরা কৃষি উৎপাদন, পানিসম্পদ এবং জীবিকার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি জানান, বাংলাদেশ ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের মরুময়তা প্রতিরোধ কনভেনশনে (টঘঈঈউ) স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করে এবং সেই থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু অভিযোজন মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়নকে জাতীয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।

মন্ত্রী বলেন, সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃক্ষ আচ্ছাদন বৃদ্ধি করা হচ্ছে। উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী কর্মসূচি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি ভূমি সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া টেকসই কৃষি, সমন্বিত মৃত্তিকা উর্বরতা ব্যবস্থাপনা, জৈব সার ব্যবহার, সংরক্ষণ কৃষি এবং জলবায়ু-সহনশীল ফসলের জাত সম্প্রসারণে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

বৈশ্বিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ভূমি অবক্ষয়, খরা এবং জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক সমস্যা; তাই এর সমাধানেও প্রয়োজন বৈশ্বিক সংহতি। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অধিকতর অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, সক্ষমতা উন্নয়ন এবং জ্ঞান বিনিময়ের আহ্বান জানায়। তিনি উন্নয়ন সহযোগী, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতি ভূমি পুনরুদ্ধার, খরা মোকাবিলা এবং প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানে বিনিয়োগ বৃদ্ধির আহ্বান জানান।

কর্মশালায়  মন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করে যে, ভূমি অবক্ষয় নিরপেক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা হবে। অবক্ষয়প্রাপ্ত বনভূমি, জলাভূমি, চরাঞ্চল ও অন্যান্য ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধার কর্মসূচি সম্প্রসারণ, খরা মোকাবিলায় আগাম সতর্কীকরণ ও অভিযোজন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, বিজ্ঞানভিত্তিক ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা হবে। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্ম, নারী এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে এই প্রচেষ্টার কেন্দ্রীয় অংশীদার হিসেবে সম্পৃক্ত করা হবে।

পরিশেষে মন্ত্রী সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আসুন, আমরা সবাই মিলে ভূমিকে স্বীকৃতি দিই, প্রকৃতিকে সম্মান করি এবং অবক্ষয়প্রাপ্ত ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধারে সম্মিলিতভাবে কাজ করি। এই অঙ্গীকারের মধ্য দিয়েই আমরা একটি সবুজ, সমৃদ্ধ, জলবায়ু-সহনশীল ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হব।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমানের সভাপতিত্বে কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তর সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা , উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা, গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং পরিবেশবিদ।