ঢাকা রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

‘সরকারি ক্রয়ে চুক্তির শর্ত পালন নিশ্চিত করতে হবে’

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ২১, ২০২৬, ০৫:১২ পিএম

বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) আওতাধীন একটি কারিগরি ইউনিট হিসেবে কাজ করেছে সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ)। এই ইউনিটটি বর্তমানে আইন পাসের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি’তে (বিপিপিএ) রূপান্তরিত হয়েছে। সিপিটিইউ বা বিপিপিএ-এর মূল কার্যাবলি ও উদ্যোগের মধ্যে রয়েছেÑ অনলাইনভিত্তিক ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনার (ক্রয় প্রক্রিয়াকরণ ও চুক্তি ব্যবস্থাপনা) জন্য ইলেক্ট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়া (ই-জিপি) পরিচালনা, পোর্টাল পরিচালনা, আইন ও নীতি প্রণয়নÑ সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) প্রণয়ন ও হালনাগাদ করাসহ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের ক্রয় প্রক্রিয়ায় দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও টেকনিক্যাল সহায়তা প্রদান। সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিপিটিইউ ইউনিটের সাবেক মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন দেশের অন্যতম ক্রয় ও ই-জিপি বিশেষজ্ঞ অমূল্য কুমার দেবনাথ। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বিনামূল্যে বই বিতরণ কর্মসূচিতে ই-জিপি সিস্টেম ব্যবহারের নানা বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে। 

বিদ্যমান পদ্ধতিতে এনসিটিবি পাঠ্যবই ছাপানোর জন্য প্যাকেজগুলোর আওতায় কয়েকশ টেন্ডার করা হয়। এই পদ্ধতি কি সঠিক?

দেখুন, যেটা দেখেছি, ওরা (এনসিটিবি একটি প্যাকেজের আওতায়) ৩০ থেকে ৪০টি লট দিয়ে এক একটি প্যাকেজ করে। এখানে পিপিআর নির্দেশনা ছিল, ই-জিপিতে এক প্যাকেজ, এক লট, এক কন্ট্রাক্ট। ই-জিপিতে একটি প্যাকেজের আওতায়  লটের সংখ্যা বেশি হলে টেন্ডার প্রক্রিয়া করা যায় না। তা ছাড়া, একটি প্যাকেজের আওতায় লটের সংখ্যা বেশি হলে কস্ট ডিসকাউন্টে সমস্যা হয়।

৩০-৪০টির পরিবর্তে ৪-৫টি দিয়ে প্যাকেজ হলে লটের প্রাক্কলিত মূল্য বেড়ে যাবে, এমন টেন্ডারে অংশগ্রহণ করতে হলে এমন কাজের অভিজ্ঞতাও বেশি লাগবে। এক্ষেত্রে পুরো ছাপার কাজ কিছু বড় প্রেসের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কিনা? 

দেখুন, সরকারি ক্রয়ে এভাবে চিন্তা করার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। ইজিপি সিস্টেম ব্যবহার করে ক্রয় করতে হলে সিস্টেম যেভাবে এলাউ করে, টেন্ডারারকে তা মেনেই টেন্ডার জমা দিতে হবে। এটা মানতে হবে। সবার জন্য একই নিয়ম। তবে এটা ঠিক যে, যারা নতুন, যাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই বা কম আছে, তারা ছোট ছোট টেন্ডারে (যেমন কোটেশন) অংশগ্রহণ করার পর ক্রমান্বয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করবে। আমরা এটাকে ‘গ্রাজুয়েশন পলিসি’ বলে থাকি।

প্রতিবছরই এনসিটিবির বই ছাপার টেন্ডার নিয়ে নানা আলোচনা হয়, বিশেষ করে সিন্ডিকেটের অভিযোগ ওঠে। ই-জিপি সিস্টেমে সিন্ডিকেট কি সম্ভব?

প্রকৃত অর্থে সম্ভব নয়। কারণ বহু দরদাতা ই-জিপিতে নিবন্ধিত আছে। তারা কে কোথায় থেকে টেন্ডারে অংশগ্রহণ করছে, তা তো কারোরই দেখার কথা নয়! উন্মুক্ত ক্রয় পদ্ধতিতে যদি পার্টিসিপেশন খুব কম হয়, বুঝতে হবে সেক্ষেত্রে কোনো সমস্যা রয়েছে। সিন্ডিকেশন তার মধ্যে একটি। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঠিকাদাররা নিজেদের মধ্যে ঠিক করে নেন, কে কোন টেন্ডারে অংশগ্রহণ করবেন এবং কত দর দিবেন। অন্যরা তখন কিছু ডামি টেন্ডার জমা দেন। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঠিকাদার দর বাড়াতেও পারেন।

দরপত্রদাতার প্রাক্কলিত দরের চেয়ে কম দর দিয়েও টেন্ডারাররা কি সিন্ডিকেট করতে পারেন? ডামি টেন্ডার কী?

পারেন। সিন্ডিকেট হওয়ার জন্য দর কোনো বিষয় নয়। সাধারণত সিন্ডিকেটের ফলে চুক্তির মূল্য বাড়ে। একজন টেন্ডারার চান টেন্ডারে তিনিই জিতুন। দরদাতারা প্রাক্কলিত দরের চেয়ে কম দর দিয়ে কাজ নিবেন, এটাই আমাদের নিয়ম। পণ্য মানসম্পন্ন হবে এমন কথা বলেই তো টেন্ডারার কাজটি নেন। ক্রয়কারী যদি ক্রয়চুক্তি অনুযায়ী যথাযথভাবে কাজ বুঝে না নেন, তা হলে কাজের গুণগত মান খারাপ হবে, এটাই স্বাভাবিক। যদি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে টেন্ডারার কে কোন টেন্ডারে অংশ গ্রহণ করবেন, এটা ঠিক করে দর দেন, সেটাও এক ধরনের সিন্ডিকেট। কারণ এখানে পার্টিসিপেশন ও কম্পিটেশন দুটোই কম হবে। কাজের মান খারাপ হবে। আর ডামি টেন্ডার হলো কোনো নির্দিষ্ট কাজে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য বা আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার উদ্দেশ্যে জমা দেওয়া একটি সাজানো বা নকল দরপত্র। এটিও সিন্ডিকেটের এক বাস্তব উদাহরণ।

ই-জিপি সিস্টেমে সিগনিফিকেন্টলি লো-প্রাইসড টেন্ডার বা এসএলটি যুক্ত করা হয়েছে। এসএলটি সব প্রতিযোগীর জন্যই কী ভালো ফল দিবে?

দেখুন, প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ৩০-৪০ শতাংশ কম দরের দরপত্র দিয়ে কাজ নেওয়া ঠেকাতেই এটি নতুন করে ইন্ট্রোডিউস করা হয়েছে বলে জানি। এখন এটি (এসএলটি) কেমন কাজ করছে,  সেটি ইভ্যালুয়েশন (মূল্যায়ন) করতে সময় লাগবে। মাত্র তো এটি চালু করা হলো। হলে হয়তো বোঝা যাবে। তবে এসএলটির কারণে এখন যেহেতু সর্বনি¤œ দরদাতা হলেও কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, তাই সরকারের রাজস্ব ব্যয় বাড়তে পারে। টেন্ডারে খুব কম মূল্যে দর দেওয়ার প্রবণতা রুখতে এই পদ্ধতিতে মূল্যায়নের কথাটি এসেছে। বিপিপিএ থেকে কিছুদিন আগেও একটি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। কিছুদিন যাওয়ার পর মূল্যায়নের ভিত্তিতে বলা যাবে, এটি সঠিক হয়েছে কিনা।

দরদাতার কাছ থেকে মানসম্পন্ন পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে কোন বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?

পিপিআর-এ টেন্ডার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি-অনিয়ম প্রতিরোধে অনেক ‘মিসকন্ডাক্ট’-এর উল্লেখ আছে। কিন্তু ২০০৮ সালে পিপিআর ইন্ট্রোডিউস হওয়ার পর মিসকন্ডাক্টের অভিযোগে কারো শাস্তি হয়েছে বলে আমার জানা নেই। তবে এটা জানি যে, বহু টেন্ডারারকে এজন্য ভবিষ্যৎ টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখা হয়েছে। কেউ শাস্তি পেয়েছেন এমন উদাহরণ নেই। আমাদের সরকারি ক্রয়ে শেষ পর্যন্ত টেন্ডারারের কাছেই যেতে হবে। তাই এনসিটিবির পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে চুক্তির শর্তগুলো টেন্ডারার কঠিন ও সঠিকভাবে  প্রতিপালন করেছেন কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে।

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

রূপালী বাংলাদেশকেও ধন্যবাদ।