ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

মাধবপুরে প্রকাশ্যে তোলা হচ্ছে সিলিকা বালু

হীরেশ ভট্টাচার্য হিরো, মাধবপুর (হবিগঞ্জ)
প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২৬, ০৫:৫১ এএম

হবিগঞ্জের মাধবপুরে সিলিকা বালু উত্তোলন বন্ধ করতে পারছে না প্রশাসন। উপজেলায় ৪টি সিলিকা বালুমহাল রয়েছে। সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করে অদৃশ্য শক্তি। যেখান থেকে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে দিনে-রাতে বালু তুলে বিক্রি করছে একটি সিন্ডিকেট। প্রভাবশালী কতিপয় নেতার কালো থাবায় দেদার বালু তোলা হলেও বন্ধ করতে পারছে না প্রশাসন। যে কারণে আদায় হচ্ছে না রাজস্ব। প্রকাশ্য দিবালোকে সোনাই নদীর মনতলা, মনতলা চৌমুহনী এবং রসুলপুর, শাহজীবাজার ছড়াÑ এই ৪টি কোয়ারি থেকে বালু তোলা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করছে। এই ৪টি মহাল ইজারা হলে সরকারি কোষাগারে প্রায় ১০ কোটি টাকার রাজস্ব জমা হতো।

খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৪৩০ বাংলা অর্থাৎ ২০২৩ সালে মাধবপুরের রসুলপুর, মনতলা ও মনতলা চৌমুহনী বালু কোয়ারি (অংশ-০১)-৫৬৫ স্মারকের ইজারা দেওয়া হয়েছিল। যেখানে ভ্যাট, ট্যাক্সসহ প্রায় ৭ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। ওই তিন কোয়ারির ইজারার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল।

রাজনৈতিক সরকার গঠনের পর থেকে কোনো ধরনের ইজারা ছাড়াই মাধবপুর উপজেলার রঘুনন্দন পাহাড়, শাহজিবাজার রাবার বাগান, সোনাই নদী এবং বিভিন্ন ছড়া থেকে অবাধে সিলিকা বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই রঘুনন্দন পাহাড়, সুরমা চা-বাগান ও তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের বিভিন্ন ছড়া এবং সোনাই নদীর বিভিন্ন স্থানে শতাধিক ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রঘুনন্দন পাহাড়ের শাহজীবাজার রাবার বাগান-সংলগ্ন খেলার মাঠ, সাতপাড়িয়া ছড়া, মনতাজ শাহ মাজার-সংলগ্ন তেঁতুলতলা ছড়া, জেদ্দা ছড়া, রসুলপুর ছড়া, তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের সীমানা ছড়া এবং সোনাই নদীর বোরহানপুর, ভবানীপুর, দুর্লভপুর, আফজলপুর, বহরা, কাশিমপুর, আলাবক্সপুর, মনোহরপুর, মঙ্গলপুর, গাজীপুর ও আশ্রবপুর মৌজাসহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপকভাবে বালু উত্তোলন চলছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব ড্রেজার দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। উত্তোলিত বালু ট্রাক ও ট্রাক্টরের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এতে পাহাড়, নদী ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে সোনাই নদীতে নির্মিত দুটি রাবার ড্যাম ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ। এই বালু কা-ের সঙ্গে কিছু প্রভাবশালী নেতা, স্থানীয় প্রশাসনের অসৎ কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে। যে কারণে প্রশাসন কঠোর কোনো ভূমিকা রাখছে না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করছে সচেতন মহল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৪৩৩ বাংলা সনের জন্য মনতলা সাধারণ বালুমহালের ইজারা নেন মাধবপুর পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ফিরোজ মিয়া। তার মালিকানাধীন মেসার্স শারমীন এন্টারপ্রাইজ কিসমতপুর কিসমত ও মনোহরপুর এই দুই মৌজার সাধারণ বালুর জন্য ইজারা গ্রহণ করে। সাধারণ বালুমহালের আড়ালে সোনাই নদীর আশপাশের প্রায় ৩০টি মৌজার সিলিকা বালু তুলে বিক্রি করা হচ্ছে বলে স্থানীয় একাধিক লোকজন জানিয়েছে।

এই অভিযোগ অস্বীকার করে মাধবপুর পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘তারা কেবল ইজারাকৃত সাধারণ বালু বিক্রি করছে।’

এ বিষয়ে মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমি নতুন যোগদান করেছি। কিছু বালু জব্দ করে ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে, সিলিকা কি না পরীক্ষা করার জন্য। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. জি. এম. সরফরাজ সিলিকা বালুমহালের ইজারা না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি জানান, অবৈধ বালু তোলা বন্ধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে আছে। মোবাইল কোর্টে জরিমানা ও কারাদ- দেওয়া হচ্ছে। পুলিশকেও চোরাই বালু তোলা বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখার জন্য বলা হয়েছে।