ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই, ২০২৬

এইচআরএসএসের জুনের প্রতিবেদন

এক মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৯

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ৩, ২০২৬, ০২:২৬ এএম

গত জুন মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দলে ৯ জন নিহত এবং ৩৪৬ জনের অধিক বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। এ সময় মব সহিংসতা সৃষ্টি করে ৩১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। মব সহিংসতায় আহত হয়েছে ৬৯ জন। জুন মাসে সারা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরে এমন তথ্য জানিয়েছে বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি-এইচআরএসএস’।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) সংগৃহীত তথ্য ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের জুন মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে ৫৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৯ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৪৬ জন। জুন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় হতাহতের সংখ্যা মে মাসের তুলনায় বেড়েছে। গত মে মাসে ‘রাজনৈতিক সহিংসতায়’ নিহত হয়েছেন ৫ জন এবং আহত হয়েছেন ২৮৯ জন। রাজনৈতিক সহিংসতার ৫৮টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ২১টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৪৬ জন ও নিহত ৩ জন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ৮টি সংঘর্ষে নিহত ২ জন ও আহত হয়েছেন ৩৬ জন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে ১৪ সংঘর্ষে নিহত ২ জন এবং আহত ১১৫ জন। বিএনপি-এনসিপির মধ্যে ৫ সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৮ জন। এ ছাড়া বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে ৫টি সংঘর্ষে ৯ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন দলের মধ্যে ৫টি ঘটনায় নিহত ২ জন ও আহত ২২ জন। নিহত ৯ জনের মধ্যে বিএনপির ৪ জন, আওয়ামী লীগের ২ জন, শিবিরের ১ জন, পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফের ১ জন ও ১ জন চরমপন্থি দলের সদস্য।

প্রতিবেদনে বলা  হয়, ‘আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, দলীয় ও অন্তর্কোন্দল, ও চাঁদাবাজিকেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ১২টি ঘটনায় কমপক্ষে ২২ জন আহত এবং ৯ নিহত হয়েছেন। নিহত ৯ জনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৩ জন, বিএনপির ৫ জন ও চরমপন্থি দলের সদস্য ১ জন রয়েছেন। এ ছাড়া, অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। জুনে সারা দেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজিকেন্দ্রিক ১৫টি ঘটনায় অন্তত ৪৫টি বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মাসে গণপিটুনি ও মব সহিংসতায় সারা দেশে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগবিত-া, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে ৬৩টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৩১ জন এবং আহত হয়েছেন ৬৯ জন। এ ছাড়া ওই মাসে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন, অভিযান, আসামি ছিনতাই ও স্থানীয় জনগণের মব সহিংসতায় সারা দেশে অন্তত ২৯টি ঘটনায় ৬৬ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আহত ও হামলার শিকার হয়েছেন।

জুন মাসে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, জুন মাসে ৩৯টি ঘটনায় ৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ২৮ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৫ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ০৯ জন সাংবাদিক। ৫ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া ৭টি মামলায় ১২ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

বিচার বহির্ভূত হত্যা, থানা ও কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, জুন মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে, হেফাজতে ও নির্যাতনে কমপক্ষে ৩ জন নিহত হয়েছে। যাদের মধ্যে ২ জন কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে ও ১ জন ডিবি হেফাজতে নির্যাতনে নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধাওয়া খেয়ে গ্রেপ্তার এড়াতে পালাতে গিয়ে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া, ওই মাসে সারা দেশে কারাগারে কমপক্ষে ৭ জন আসামি মারা গিয়েছেন । এর মধ্যে ৪ জন কয়েদি ও ৩ জন হাজতি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের একজন, বিএনপির একজন ও ৫ জন সাধারণ কয়েদি মারা গেছেন।

সীমান্তে হতাহত ও আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, জুন মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৫টি হামলার ঘটনায় ২ জন নিহত ও  ২ জন আহত হয়েছেন। ৪ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং বিএসএফ কর্তৃক ১ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া, ৭ জনকে পুশইন করা হয়েছে এবং ৪ শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশুকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছে।  অপরদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে পৃথক ৩টি ঘটনায় একজন রোহিঙ্গা যুবকসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ৩টি ঘটনায় ১২ জনকে আটক করেছেন আরাকান আর্মি।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন,  জুন মাসে  বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি একটি সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল পর্যায় অতিক্রম করেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, জাতীয় সংসদকে ঘিরে বিতর্ক এবং জননিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে সার্বিক পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। তিনি আরও বলেন, মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি ও মব সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা, শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনার ধারাবাহিকতা রয়েছে। এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।