মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সামরিক সংঘাত আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। টানা কয়েক দিনের বিমান হামলার পর ইরান এবার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, হামলা অব্যাহত থাকলে তারা আর শুধু পাল্টা প্রতিরোধে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পূর্ণমাত্রার আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযান শুরু করবে। এতে গোটা অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
ইরানের কঠোর বার্তা: ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আরও কয়েক দিন হামলা চালিয়ে যায়, তাহলে তেহরান বর্তমান সামরিক কৌশল পরিবর্তন করবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান এতদিন সংঘাতকে সীমিত রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু পরিস্থিতি একইভাবে চলতে থাকলে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে বেরিয়ে সরাসরি আক্রমণাত্মক অভিযানে যাবে দেশটি। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, তখন কোনো রাজনৈতিক সীমান্তই নিরাপদ থাকবে না।
টানা হামলায় বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতি: ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক বিমান হামলায় সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সেতু, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং পানি সরবরাহ কেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় বহু মানুষ নিরাপদ পানির সংকটে পড়েছেন। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, একাধিক গ্রামের হাজার হাজার মানুষ বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টা হামলা: মার্কিন হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও মিত্র দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, ওমান ও সিরিয়ার বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। তাদের বক্তব্য, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে, তাদের ভূখ-ও বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।
পানি ও বিদ্যুৎ স্থাপনায় আঘাত: সংঘাতের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো পানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা। কুয়েতের একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রে হামলার ফলে আগুন লাগে এবং উৎপাদন ব্যাহত হয়। কর্তৃপক্ষ জরুরি পরিকল্পনা চালু করে বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে নাগরিকদের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর অধিকাংশই সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধ করে পানীয় জল সরবরাহ করে থাকে। ফলে এ ধরনের স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কয়েক দিনের মধ্যেই বড় ধরনের মানবিক সংকট দেখা দিতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা: সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতেও। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই সেখানে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে। জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। এতে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়বে।
বিমান চলাচলেও প্রভাব: নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় কয়েকটি দেশের আকাশপথেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা: এদিকে ইরান তাদের আঞ্চলিক মিত্রদেরও সম্ভাব্য বৃহত্তর সংঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। বিশেষ করে লেবাননের হিজবুল্লাহসহ মিত্র সংগঠনগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বৃদ্ধি: ক্রমবর্ধমান সংঘাত নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, একের পর এক পাল্টাপাল্টি হামলা পরিস্থিতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সামান্য ভুল সিদ্ধান্তও পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, খাদ্য সরবরাহ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অনিশ্চয়তার মুখে মধ্যপ্রাচ্য: বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানÑ দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। একদিকে ওয়াশিংটন সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে তেহরান আরও কঠোর জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ফলে সংঘাত দ্রুত প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা এখন শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর প্রভাব পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, নৌপথ ও বেসামরিক অবকাঠামোকে ঘিরে সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। কূটনৈতিক উদ্যোগ দ্রুত কার্যকর না হলে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন