নাটোরের বাগাতিপাড়া সামাজিক বন বিভাগ ও নার্সারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দীর্ঘদিনের অবহেলা, জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং তীব্র জনবল সংকটে কার্যত ধুঁকছে। অফিস ভবন, কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবন ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোয়ার্টারগুলো বছরের পর বছর সংস্কার না হওয়ায় এখন প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে, ভবনের ওপর জন্মেছে আগাছা, আর পরিত্যক্ত কোয়ার্টারগুলো ঝোপঝাড়ে ঢেকে সাপ-পোকামাকড়ের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মাত্র দুজন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে পুরো দপ্তরের কার্যক্রম।
সরেজমিনে দেখা যায়, বন বিভাগের এক কক্ষবিশিষ্ট অফিস ভবনের দেয়াল ও ছাদের বিভিন্ন অংশ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। ভবনের ছাদজুড়ে জন্মেছে আগাছা, যা দীর্ঘদিনের অযত্নের চিত্র স্পষ্ট করে। পাশেই থাকা কর্মকর্তার আবাসিক ভবনটি বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত। ভবনের দেয়ালে বড় বড় ফাটল, খসে পড়া পলেস্তারা, ভাঙা দরজা-জানালা এবং চারপাশে ঝোপঝাড় ও ময়লা-আবর্জনা ভবনটিকে ব্যবহার অনুপযোগী করে তুলেছে।
একই অবস্থা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক কোয়ার্টারগুলোরও। একটি ফরেস্টার কোয়ার্টার, একটি রেঞ্জ কর্মকর্তার কোয়ার্টার এবং তিনটি স্টাফ কোয়ার্টার দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সংস্কারের অভাবে ভবনগুলো এখন প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বাগাতিপাড়া সামাজিক বন বিভাগে মোট ছয়টি অনুমোদিত পদ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুজন মালি, একজন নাইটগার্ড, একজন ফরেস্ট গার্ড, একজন ফরেস্ট কর্মকর্তা এবং একজন রেঞ্জ কর্মকর্তা। কিন্তু বর্তমানে একজন মালি ও একজন ভারপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তাকে দিয়েই পুরো দপ্তরের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ওই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লালপুর উপজেলাসহ দুটি উপজেলার দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, একসময় বাগাতিপাড়া বন বিভাগের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত মনোরম। প্রবেশমুখজুড়ে ছিল ফুলের বাগান, নার্সারিতে মিলত উন্নতমানের ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে চারা সংগ্রহ করতে আসতেন। কিন্তু বর্তমানে দপ্তরের বেহাল দশা ও কার্যক্রমের স্থবিরতায় মানুষ ব্যক্তিমালিকানাধীন নার্সারির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
ঘোরলাজ গ্রামের বাসিন্দা আল মামুন বলেন, ‘একসময় বন বিভাগ ছিল উপজেলার অন্যতম আকর্ষণ। এখন ভবনগুলোর অবস্থা এতটাই খারাপ যে, দেখে পরিত্যক্ত স্থাপনা মনে হয়। সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিলে এই দপ্তর আবারও আগের সৌন্দর্য ও কার্যকারিতা ফিরে পেতে পারে।’
বন বিভাগের মালি ইউসুফ মিয়া বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে কোয়ার্টারগুলোতে কেউ বসবাস করেন না। ঝোপঝাড়ে ভরে গিয়ে সাপ-পোকামাকড়ের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। ভবনগুলোর অবস্থা এতটাই নাজুক যে, সেখানে থাকা সম্ভব নয়। জনবল সংকটের কারণে দাপ্তরিক কাজও চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।’
উপজেলা ভারপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ছয়জনের কাজ বর্তমানে মাত্র দুজনকে দিয়ে চালাতে হচ্ছে। আমি অতিরিক্ত দায়িত্বে দুটি উপজেলার কার্যক্রম দেখছি। অফিস ভবনের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে, ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হচ্ছে। পুরোনো ভবনগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন বরাদ্দ পাওয়া গেলে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। আবাসনের ব্যবস্থা থাকলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এখানে বসবাস করতে পারবেন।
এ বিষয়ে জেলা বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহেদুল ইসলাম বলেন, আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত নই। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।
তবে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ডা. জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
স্থানীয়দের দাবি, জরাজীর্ণ ভবনগুলো দ্রুত অপসারণ করে নতুন অফিস ভবন ও আবাসিক কোয়ার্টার নির্মাণ এবং দীর্ঘদিনের জনবল সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল নিশ্চিত করা গেলে বন বিভাগের সেবার মান যেমন বাড়বে, তেমনি সরকারি সম্পদও রক্ষা পাবে এবং দপ্তরটি তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন