অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গুমের বিচার হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) অনুষ্ঠানের বক্তারা। পাশাপাশি ভবিষ্যতে দেশের রাজনীতিকরা যাতে গুম-খুন না করেন, মিথ্যা মামলা বন্ধ করেনÑ তাদের কাছে অনুষ্ঠান থেকে সেই অঙ্গীকারও চাওয়া হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে ‘গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস-২০২৫’ শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
আলোচনা সভায় এইচআরএসএসের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য ও ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা এবং আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক আইন বাস্তবায়ন, গুমের ঘটনা তদন্তের জন্য গঠিত গুম কমিশনকে আরও শক্তিশালী ও স্থায়ী করা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জবাবদিহির আওতায় আনাসহ সাত দফা দাবি তুলে ধরা হয়। আলোচনা সভায় ধারণাপত্র পাঠ করেন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম এবং সাত দফা দাবি উপস্থাপন করেন সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান।
আলোচনা সভায় গুমের শিকার হওয়া ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) রাজনৈতিক সংগঠক মাইকেল চাকমা বলেন, প্রত্যাশা ছিল অন্তর্বর্তী সরকার গুমের ঘটনার বিচার করবে; কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পেরোনোর পর এই বিচার আর হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে।
আলোচনা সভায় সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিরা শুধু একটি দল বা মতাদর্শের মানুষ নয়, বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের মানুষ। আজ (গতকাল) এখানে রাজনীতিবিদেরাও এসেছেন। আমরা তাদের কাছ থেকে এই অঙ্গীকার পেতে চাই যে তারা আমাদের একটি ভিন্ন ধরনের ভবিষ্যৎ দেখাবেন, যেখানে তারা গুম-খুন করবেন না। পাশাপাশি কোনো ধরনের মিথ্যা মামলা দেবেন না।
রাজনীতিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিনা বিচারে মাসের পর মাস লোকজনকে আটকে রাখবেন না এবং তারা মধ্যরাতে লোকজনকে ডিবি অফিসে তুলে নিয়ে যাবেন না বিনা কারণে। এই অঙ্গীকারগুলো আপনারা করুন। তাহলেই আমরা বিশ্বাস করব যে, পরিবর্তন আসবে।
সভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, বিগত ১৫ বছরে বিএনপির অনেক নেতাকর্মী শহিদ হয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষ মিথ্যা মামলায় জর্জরিত হয়েছেন। ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে আমরা মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করব। একই সঙ্গে গুম ও শহিদ হওয়া ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াব।
এইচআরএসএসের উপদেষ্টা মো. নূর খান বলেন, গুম কমিশন কিছু কাজ করছে, যা শিগগির প্রতিফলিত হবে। তবে মনস্তাত্ত্বিক যে ফ্যাসিজম আছে, সেটাও বিলুপ্ত করতে হবে।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের এখনো জবাব দেওয়ার মতো কিছু করা যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এস এম মঈনুল করিম। তিনি বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে, যাতে এই সংস্কৃতি আর কখনো ফিরে না আসে।
আলোচনা সভায় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জোবায়ের বলেন, গুমের প্রকৃত চিত্র খুব অল্পই জনসমক্ষে এসেছে। কোনো সভ্য দেশ ও মানুষ এই ঘটনাপ্রবাহ মেনে নিতে পারে না।
জামায়াতে ইসলামী গুমের শিকার ভুক্তভোগী ও পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে উল্লেখ করে এহসানুল মাহবুব বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের আইনি, আর্থিক ও সামাজিক সহায়তার পাশাপাশি এই সংস্কৃতি যেন আর ফিরে না আসে, তা নিশ্চিতে কাজ করবেন তাঁরা।
সরকার পরিবর্তনের এক বছর পরেও গুমের শিকার ব্যক্তিরা বঞ্চনার শৃঙ্খল থেকে বের হতে পারেননি বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের আবাসিক অফিসের জ্যেষ্ঠ মানবাধিকার উপদেষ্টা হুমা খান।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে হুমা খান বলেন, গুমের শিকার ভুক্তভোগী ও পরিবারকে যেন সার্বিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা হয়। পাশাপাশি গুম সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি রোধে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সব পদক্ষেপ নিতে হবে।
আগামী নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসবে, তা নিয়ে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে নানা তৎপরতা দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম।
আরিফুল ইসলাম বলেন, তারা ডিজিএফআই ও এনএসআই সংস্কার করার কথা বলেছিলেন। যেসব সদস্য গত ১৫ বছরে খুন-গুমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের তালিকা করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। কারণ, পুরোনো সেই কাঠামো ঠিক রেখে নির্বাচনে যাওয়া মানে নির্বাচনকে তারা নিজেদের মতো প্রভাবিত করবে।
বিএনপির ‘কুসুম কুসুম বক্তব্য’ এনসিপি সন্দেহের চোখে দেখে উল্লেখ করে এনসিপির এই নেতা বলেন, বিএনপির জোরালো কোনো বক্তব্য দেখা যায় না। তারা যেভাবে নির্বাচন করতে সরকারকে বাধ্য করে, তেমনি এই বিচারকে বাধ্য করার জন্য যতটুকু প্রতিবাদ করা উচিত, মিছিল করা উচিত, বক্তব্য দেওয়া উচিত, তা দেখা যায় না।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিষদ সদস্য মাবরুক মোহাম্মদ, নাগরিক ঐক্যের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সার, গুমবিষয়ক তদন্ত কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস, ২০১৭ সালে ধানমন্ডি থেকে নিখোঁজ হওয়া ইশরাক আহমেদের বাবা জামালউদ্দীন আহম্মেদ, ২০১৩ সালে মোহাম্মদপুর থেকে গুমের শিকার হাফেজ জাকিরের ভাই জিয়াউর রহমান, রাজশাহী থেকে গুমের শিকার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মহিদুলের ভাই শহীদুল ইসলাম, রাজশাহী থেকে গুম হওয়া গোলাম মর্তুজা, ২০২৩ সালে ধামরাই থেকে গুম হওয়া রহমত উল্লাহ, ২০১৪ সালে রংপুর থেকে গুম হওয়া আবদুল বাসেত, ২০১৪ সালে নীলফামারী থেকে গুমের শিকার আতিকুর রহমানের ভাই আশিকুর রহমান প্রমুখ।
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন