ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

সম্পাদকীয়

সরকারের নয়া প্ল্যান; বঙ্গোপসাগরে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: মার্চ ২, ২০২৬, ০৩:৪০ এএম

বাংলাদেশের জ্বালানি খাত আজ যে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি, তা আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই। স্থলভাগের গ্যাসক্ষেত্রগুলো ক্রমশ উৎপাদনশীলতা হারাচ্ছে, শিল্প খাতে গ্যাসের চাপ কমছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানি-নির্ভর জ্বালানির ব্যবহার বাড়ছে, আর বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ ক্রমাগত তীব্র হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কেবল একটি উন্নয়নমূলক কর্মসূচি নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের জন্য কৌশলগত অপরিহার্যতা।

বিগত বছরগুলোতে অফশোর অনুসন্ধান নিয়ে বহু আলোচনা, ঘোষণা এবং নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। উৎপাদন বণ্টন চুক্তি বা পিএসসি প্রণয়ন ও সংশোধনকে কেন্দ্র করে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বহু কোম্পানি আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত দরপত্র জমা না পড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

পেট্রোবাংলা আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছিল ২৪টি অফশোর ব্লকের জন্য। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে একটি প্রস্তাবও জমা পড়েনি। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ছিল বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো।  দরপত্র সংগ্রহ করেও তারা শেষ পর্যন্ত অংশ নেয়নি।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি খাতে প্রতিযোগিতা এখন অত্যন্ত তীব্র। ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, ভারত বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো অফশোর ব্লকগুলোতে তুলনামূলক আকর্ষণীয় শর্ত দিয়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে টানছে। গভীর সমুদ্র অনুসন্ধান অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ; একটি কূপ খননেই শত কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে, অথচ সাফল্যের নিশ্চয়তা নেই। ফলে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি-বণ্টন, কস্ট রিকভারি, মূল্য নির্ধারণ ও মুনাফা প্রত্যাবর্তনের নিশ্চয়তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে।

অন্তর্বর্তী সরকার পিএসসি-২০২৫ পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল এবং একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করেছিল। সংশোধনের খসড়াও মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ে। কিন্তু সময়ের সীমাবদ্ধতায় দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া এগোয়নি। এখন দায়িত্ব নিয়েছে জনগণের ভোটে নির্বাচিত নতুন সরকার। এটি এক অর্থে নতুন সূচনার সুযোগ।

শোনা যাচ্ছে, নতুন মডেলে গ্যাসের মূল্য ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে, যা আগের এইচএসএফও ভিত্তিক পদ্ধতির চেয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। লাইবরের পরিবর্তে সোফার ভিত্তিতে অর্থপ্রদানের কাঠামো নির্ধারণ, পাইপলাইন খরচ পুনরুদ্ধারের বিধান স্পষ্ট করা, ডেটা বিক্রির মূল্য যৌক্তিক করা এবং কস্ট রিকভারি কাঠামোয় সংস্কার এসব উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে পারে নিঃসন্দেহে।

তবে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়, শুধু শর্ত শিথিল করলেই কি সমাধান মিলবে? জ্বালানি খাত দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্র। এখানে নীতিগত ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং চুক্তির সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকারীরা শুধু আর্থিক লাভ নয়, নীতির স্থায়িত্বও দেখতে চায়।

একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থও বিসর্জন দেওয়া যাবে না। পিএসসি এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে ঝুঁকি ও লাভের ভারসাম্য রক্ষা পায়। অতিরিক্ত ছাড় দিয়ে স্বল্পমেয়াদি সাফল্য পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার অত্যধিক কড়াকড়ি রাখলে বিনিয়োগই আসবে না। তাই প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক, বাস্তবসম্মত এবং আন্তর্জাতিক তুলনামূলক বিশ্লেষণের ওপর দাঁড়ানো একটি চুক্তি কাঠামো।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে গভীর সমুদ্রসীমা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ে জয়ী হয়েছে। সেই সামুদ্রিক এলাকার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে না পারা এক ধরনের কৌশলগত ব্যর্থতা হবে। সমুদ্রের সম্পদ আহরণ শুধু জ্বালানি সরবরাহ নয়, সংশ্লিষ্ট সেবা খাত, জাহাজ চলাচল, বন্দর অবকাঠামো এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

আমরা মনে করি, জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের অন্যতম ভিত্তি। আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী দশকের শিল্পায়ন ও প্রবৃদ্ধির গতি। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে যে সম্ভাবনা সুপ্ত রয়েছে, তা জাগিয়ে তোলার এখনই সময়। সঠিক নীতি, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে অফশোর অনুসন্ধান আর সম্ভাবনার গল্প হয়ে থাকবে না, বরং তা হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার এক নতুন অধ্যায়।