× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

এটিএম মোস্তফা কামাল, অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

প্রকাশিত: এপ্রিল ২১, ২০২৬, ০১:২৫ এএম

লুটেরাদের রাহুগ্রাস থেকে ব্যাংকিং খাতের সুরক্ষা জরুরি

এটিএম মোস্তফা কামাল, অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

প্রকাশিত: এপ্রিল ২১, ২০২৬, ০১:২৫ এএম

লুটেরাদের রাহুগ্রাস থেকে ব্যাংকিং খাতের সুরক্ষা জরুরি

ব্যাংকিং ব্যবসা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ব্যাংকে টাকা গচ্ছিত রাখলে সেটা সুরক্ষিত থাকবে এবং প্রয়োজনের সময় সেটা উঠিয়ে নেওয়া যাবে এরূপ আস্থা রেখেই সাধারণ মানুষ ব্যাংকে টাকা গচ্ছিত রাখে। ব্যাংক ব্যবসা সঠিকভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে পাবলিকের এরূপ আস্থার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। আস্থার বিষয়টি আবার নির্ভর করবে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে চলছে কি-না তার ওপর। সঠিকভাবে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে সরকারের ওপর। সরকার বলতে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকারের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকেই বোঝানো হচ্ছে।

ব্যাংকিং ব্যবসার সঙ্গে সারা দেশের সব মানুষের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সে কারণে ব্যাংকিং ব্যবসাকে সুশৃঙ্খল নিয়মনীতি মেনে চলতে হবে। ব্যাংকিং সেক্টরে যেকোনো ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে সেটাকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।

ব্যাংক খোলার অনুমতি সরকারই দিয়ে থাকে। ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন সরকারই প্রণয়ন করে থাকে। কোন ব্যাংকে টাকা গচ্ছিত রাখা নিরাপদÑ এটা নির্ধারণ করার দায়িত্ব সরকারের, সাধারণ জনগণের নয়। যে ব্যাংকে টাকা গচ্ছিত রাখা নিরাপদ নহে সে ব্যাংককে ব্যবসা চালিয়ে যেতে দেওয়া সরকারের উচিত নয়। কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেলে, ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেÑ ব্যাংকে কোনো অস্বাভাবিক লেনদেন হয়ে থাকলেÑ ব্যাংকের টাকা তুলে নিয়ে ব্যবসায়িক কাজে না লাগিয়ে বিদেশে পাচার করা হলেÑ এর দায় চলে আসবে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকারের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ওপর।

দেশে কতগুলো ব্যাংক থাকার দরকার সেটা নির্ধারণ করার দায়িত্ব সরকারের। আবার ব্যাংকগুলো সঠিকভাবে চলছে কি-না সেটা মনিটরিং করে দেখার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ওপর। একটা গ্রুপ অব কোম্পানি সরকারপ্রধানের পৃষ্ঠপোষকতায়  এক সঙ্গে ৭টা ব্যাংকের মালিকানা নিজের কব্জায় নিয়ে নিলÑ যা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ তখন কি করেছিল? সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলেই এটা ঘটেছিল। শেখ হাসিনা নিজে বিষয়টি তদারক করেছিলেনÑ প্রতিরক্ষা  গোয়েন্দা সংস্থাকে ও তিনি এ কাজে ব্যবহার করেছিলেন বলে শোনা যায়Ñ কি জঘন্য ন্যক্কারজনক কা-? জনগণ কি একটা গ্রুপ অব কোম্পানিকে অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে নিয়মবহির্ভূত পন্থায় ৭টা ব্যাংক পাইয়ে দিতে তাকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল? একটা সরকারপ্রধানের জন্য এটা কি শোভনীয় কাজ? লজ্জা শরম বলে তো একটা কথা আছেÑ ন্যায্য আর অন্যায্য কাজ বলে তো একটা কথা আছে! একটা সরকারপ্রধান এরূপ অন্যায্য কাজে জড়িয়ে পড়লে তার পক্ষে সঠিকভাবে দেশ শাসন করা সম্ভব নয়। এরূপ কাজ করিয়ে দিয়ে তিনি নিজে কিংবা তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন? সরকারপ্রধানের এরূপ অনৈতিক কর্মকা-ে নিজেকে জড়ানো একদম উচিত হয়নি।

এখন ব্যাংকিং সেক্টরে সংঘটিত কিছু অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা যায়:

 (১)  বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে ২০০৮ থেকে ২০২৩-এই ১৫ বছরে দেশের ব্যাংক খাত থেকে ছোট বড় ২৪টি অনিয়মের মাধ্যমে ৯২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে।

(২)  জামানত ছাড়া একজন ব্যক্তিকে ৫৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিলে তো দুর্নীতি বাড়তেই থাকবে

(৩) বড় সাত শিল্প গ্রুপের বেনামি ঋণ পৌনে ২ লাখ কোটি টাকা (জাতীয় দৈনিকÑ ১৭ এপ্রিল-২০২৫)

ভুয়া নাম ঠিকানা ব্যবহার করে নিবন্ধন করা প্রতিষ্ঠান বা একেবারেই অস্তিত্বহীন কোম্পানির নামে এসব ঋণ নেওয়া হয়েছে। ঋণের একটি অংশ নেওয়া হয়েছে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট থেকে আমদানির নামে। ঋণ নিতে ব্যাংক কর্মকর্তারা গ্রুপগুলোকে সহায়তা করেছে। ঋণের বড় অংশই পাচার করা হয়েছে।

(৪) ২০০৯-২০২৪ সালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লুণ্ঠনের শিকার হয়েছিল সরকারের ব্যাংকিং খাত। এ সময় ১১টি ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। তন্মধ্যে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ৭টি ব্যাংকও অন্তর্ভুক্ত ছিল। উল্লেখ্য, ২০১৭ সাল পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের অবস্থান ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় এবং সার্বিক তত্ত্বাবধানে এ ব্যাংকটির মালিকানা পরিবর্তন করে নিয়ে আসা হলো এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। মালিকানা পরিবর্তনের কাজে শেখ হাসিনা  প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থাকেও ব্যবহার করেছিল বলে জানা গিয়েছিল। ২০১৭-২০২৪ সাল পর্যন্ত এস আলম  গ্রুপ বিভিন্ন কায়দায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা লুট করে নিয়েছিল। তা ছাড়া, এস আলম তার নিয়ন্ত্রণাধীন ৭টি ব্যাংক থেকে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা লুটে নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিয়েছেন

উপর্যুক্ত ঘটনাগুলোর সবই অস্বাভাবিক ঘটনা। এটা বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকারের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অগোচরে ঘটেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকারের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কি কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন? না করে থাকলে কেন করেননি? কারা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছিলেন সেটা নিরূপণ করে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার অপরিহার্যতা অনস্বীঃকার্য। যেসব ব্যাংক এরূপ অযৌক্তিক ঋণ প্রদান করেছে সেসব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক।

যে ব্যবসায়ী গ্রুপ অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে এরূপ ঋণ গ্রহণ করেছে তাদের বিরুদ্ধে ঋণের টাকা আদায়ের জন্য সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবশ্যকতা রয়েছে। তাদের কাছ থেকে এরূপ ঋণের টাকা সম্পূর্ণ রূপে আদায়ের পূর্বে তাদেরকে কোনো ব্যাংক থেকেই আর কোনো ঋণ দেওয়া সঠিক হবে না। এরূপ খেলাপি ঋণগ্রস্ত কোনো ব্যক্তিকে ঋণের অর্থ সম্পূর্ণ পরিশোধ করে দায়মুক্ত হয়ে আসার পূর্বে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার কোনো প্রশ্নই আসে না। যদি সেটা করা হয় তাহলে সেটা হয়ে যাবে ডাকাতির অভিযোগে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তিকে তার নিজের বিচার নিজে করার জন্যে হাকিমের আসনে বসিয়ে দেওয়া। সেরূপ ক্ষেত্রে বিচারিক কার্যক্রম ডাস্টবিনে নিক্ষিপ্ত হবে আর ডাকাত পূর্ব ঘোষণা দিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে ডাকাতির কার্যক্রম দ্বিগুণ গতিতে চালিয়ে যাবে।

উল্লেখ্য, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আনুকূল্যে ৮-১০টা গ্রুপ সমগ্র ব্যাংকিং সেক্টরকে লুটেপুটে খেয়েছে যার ফলে সমগ্র দেশের সাধারণ মানুষ বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের জন্য অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে।

রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সরকার যদি তাকে তার ব্যাংকসমূহের মালিকানা ফেরত দিতে চায় তাতে কারো আপত্তি থাকার কথা নয় যদি কিছু পূর্বশর্ত প্রতিপালন করা হয়Ñ পূর্বশর্তগুলো হচ্ছে- তার মালিকানাধীন ৭টি ব্যাংক থেকে তিনি অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে যে ২ লাখ কোটি টাকা লুণ্ঠন করেছেন সেটার পুরোটাই ৭টি ব্যাংকে ফিরিয়ে দিয়ে তাকে দায়মুক্তি সার্টিফিকেট নিতে হবে। ব্যাংকের ঋণ দান কার্যক্রমকে সংশোধন করে সিঙ্গাপুর/ইউরোপ স্ট্যান্ডার্ডে উন্নীত করতে হবে যাতে মালিকপক্ষের কেউ অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে নিজের মালিকানাধীন ব্যাংকের অর্থ লুণ্ঠনের কোনো সুযোগ না পায়।  বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির সঙ্গে তখনকার গভর্নরসহ অন্য যেসব কর্মকর্তা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে অতি দ্রুত আইনি কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। যেসব ব্যক্তি/গ্রুপ অব কোম্পানি বিভিন্ন ব্যাংকের অর্থ লুটপাটের সঙ্গে জড়িত তাদের কাছ থেকে লুণ্ঠিত অর্থ আদায়ের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যেসব কর্মকর্তা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন তাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার আবশ্যকতা রয়েছে।  

সর্বোপরি লুটেরাদের পুনর্বাসনের কোনো কর্মসূচি বিএনপির নির্বাচনি মেনিফেস্টোতে ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তুতকৃত জাতীয় সনদেও এরূপ কোনো সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত নেই। সুতরাং লুটেরা পুনর্বাসনের কার্যক্রম থেকে সরকারের পিছু হটার আবশ্যকতা রয়েছে।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!