বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন আবারও অস্থির। গত কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের মধ্যে ধারাবাহিক সংঘর্ষ নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। চট্টগ্রাম, ঢাকা, কুমিল্লা থেকে শুরু করে পাবনা প্রায় সর্বত্রই সংঘাতের পুনরাবৃত্তি একটি গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংঘর্ষের কারণগুলো প্রায়ই তুচ্ছ বিষয় থেকে শুরু হলেও দ্রুত তা সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। যেমন চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে একটি দেয়াল লিখনকে কেন্দ্র করে দুই সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং তা একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলা এ সংঘর্ষের কারণে কলেজের ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। একই ধরনের ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেও ঘটেছে, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ অন্তত ১২ জন আহত হন।
কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে ক্লাস-পরীক্ষা ব্যাহত হয় এবং পুরো ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি ধারাবাহিক প্রবণতার প্রতিফলন।
বাংলাদেশের শিক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ইঅঘইঊওঝ)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে প্রায় ৪০টিরও বেশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং শতাধিক কলেজে ছাত্র-রাজনীতি সক্রিয়। তবে একইসঙ্গে শিক্ষার পরিবেশ বিঘিœত হওয়ার ঘটনাও বাড়ছে। শিক্ষাবিদদের মতে, গত এক দশকে শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা শিক্ষার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (অঝক) এবং বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ছাত্র-রাজনীতিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা ও সহিংসতা প্রায়ই শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করছে। অনেক ক্ষেত্রে নিরীহ শিক্ষার্থীরাও এসব সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (ঞওই) তাদের একাধিক গবেষণায় উল্লেখ করেছে, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং সাংগঠনিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা ছাত্র-সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের অন্যতম কারণ। একইসঙ্গে প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং জবাবদিহিতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবও এখানে উল্লেখযোগ্য। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে উসকানিমূলক বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা সহিংসতার সূত্রপাত ঘটায়। একটি একাডেমিক গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইন ঘৃণামূলক বক্তব্যের বিশাল ডেটাসেট (৫০ হাজারের বেশি মন্তব্য) সহিংসতা উসকে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে একটি ছোট ঘটনা মুহূর্তেই বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।
শিক্ষাবিদ ও সমাজবিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের পেছনে রয়েছে তিনটি প্রধান কারণ। প্রথমত, ছাত্র-সংগঠনগুলোর মধ্যে আদর্শিক রাজনীতির পরিবর্তে ক্ষমতা-কেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা। দ্বিতীয়ত, জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলন হিসেবে ক্যাম্পাসে বিভাজন বৃদ্ধি। তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকার অভাব।
এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (টএঈ) বাংলাদেশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা প্রতিরোধে নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে প্রশ্ন হলো সমাধান কোথায়?
প্রথমত, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু তা সহিংসতায় রূপ নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। কোনো পক্ষের প্রতি পক্ষপাতিত্ব পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে।
তৃতীয়ত, ছাত্র-সংগঠনগুলোর মধ্যে নিয়মিত সংলাপের ব্যবস্থা করা জরুরি। সংঘর্ষ নয়, আলোচনা হোক মতপার্থক্য নিরসনের প্রধান মাধ্যম।
চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও উসকানিমূলক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সবশেষে বলতে হয়, শিক্ষার্থীরা একটি জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের হাতেই গড়ে উঠবে আগামী বাংলাদেশের নেতৃত্ব। কিন্তু যদি সেই শিক্ষার্থীরাই সহিংসতার পথে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা কেবল ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় উন্নয়নকেও বাধাগ্রস্ত করবে।
বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনকে আবারও জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও মানবিক মূল্যবোধের কেন্দ্রে পরিণত করতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সংঘাত নয়, সহাবস্থান এই হোক ছাত্র-রাজনীতির নতুন দর্শন।

