× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ, কলাম লেখক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

প্রকাশিত: মে ১০, ২০২৬, ০৬:০৬ এএম

কোরবানির পশুর হাট ও অর্থনীতির সমীকরণ

ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ, কলাম লেখক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

প্রকাশিত: মে ১০, ২০২৬, ০৬:০৬ এএম

কোরবানির পশুর হাট ও অর্থনীতির সমীকরণ

পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। হজরত ইবরাহিমের (আ.) ত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করে প্রতি বছর মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোরবানি আদায় করেন। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই ধর্মীয় আয়োজন এখন বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকা-েও রূপ নিয়েছে। কোরবানিকে কেন্দ্র করে দেশের পশুপালন খাত, গ্রামীণ উৎপাদনব্যবস্থা, পশুখাদ্য শিল্প, পরিবহন খাত, অস্থায়ী পশুর হাট, শ্রমবাজার, চামড়া শিল্প এবং ডিজিটাল বাণিজ্যে ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রবাহ তৈরি হয়। কয়েকদিনের এ আয়োজনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে লাখো মানুষ। ফলে কোরবানির অর্থনীতি এখন শুধু ধর্মীয় অনুভূতির বিষয় নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমি খাত।

সরকারি হিসাবে ২০২৬ সালের ঈদুল আজহায় দেশে মোট কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার। সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে এক কোটি এক লাখ ছয় হাজার ৩৩৪টি। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় পশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর মধ্যে রয়েছে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু-মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল-ভেড়া এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রাণী। গত বছরও কোরবানি শেষে প্রায় ৩৩ লাখ ১০ হাজার পশু উদ্বৃত্ত ছিল। এসব তথ্য প্রমাণ করে, বাংলাদেশ এখন কোরবানির পশু উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছে। একসময় দেশের বাজার বিদেশি পশুর ওপর নির্ভরশীল থাকলেও বর্তমানে স্থানীয় খামারিরাই চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছেন। এটি দেশের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের বড় অর্জন।

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে কোরবানির বাজারের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। দেশের হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারি সারা বছর ধরে গরু, ছাগল ও ভেড়া লালন-পালন করেন মূলত কোরবানির বাজার সামনে রেখে। অনেক পরিবার নিজেদের বাড়িতে একটি বা দুটি গরু পালন করে অতিরিক্ত আয় করার সুযোগ পান। এই আয় দিয়ে তারা সন্তানের লেখাপড়া, চিকিৎসা, ঘর মেরামত কিংবা ঋণ পরিশোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। ফলে কোরবানির অর্থনীতি শুধু বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। কোরবানির মৌসুমে গ্রামে অর্থের প্রবাহ বাড়ে, স্থানীয় বাজার সক্রিয় হয় এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হয়।

সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, দেশে কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার প্রায় ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। কয়েকদিনের একটি ধর্মীয় আয়োজনকে কেন্দ্র করে এত বড় অর্থনৈতিক প্রবাহ বিশ্বের অনেক দেশেই বিরল। পশুপালন, পশুখাদ্য, ভেটেরিনারি ওষুধ, পরিবহন, শ্রমবাজার, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন বেচাকেনা এবং চামড়া শিল্পÑ সব খাতেই এ সময় ব্যাপক লেনদেন হয়। কোরবানির পশু কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত থাকে ট্রাকচালক, হাটের শ্রমিক, কসাই, লবণ ব্যবসায়ী, চামড়া সংগ্রাহক ও অস্থায়ী কর্মচারীরা। ফলে এই অর্থনীতি সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব ফেলে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে একটি মৌসুমি গতি তৈরি করে।

এবার দেশে তালিকাভুক্ত প্রায় তিন হাজার ৬০০টি পশুর হাট বসবে। রাজধানী ঢাকায় থাকবে ২৭টি হাটÑ এর মধ্যে উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টি। তবে বাস্তবে তালিকার বাইরেও বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য অস্থায়ী হাট গড়ে ওঠে। এসব হাটে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। ফলে পশুর হাট এখন শুধু বেচাকেনার জায়গা নয়; এটি বড় অর্থনৈতিক কর্মকা-ের কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে। কোরবানির কয়েকদিন আগে এসব হাটে মানুষের ঢল নামে, যার প্রভাব আশপাশের ব্যবসা-বাণিজ্যেও পড়ে। খাবারের দোকান, পরিবহন, অস্থায়ী দোকান এবং ছোটখাটো ব্যবসাও এ সময় বাড়তি আয়ের সুযোগ পায়।

রাজধানীর পশুর হাট ইজারা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সিন্ডিকেট ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় রাজনৈতিক যোগাযোগ ও প্রভাবের কারণে হাট ইজারায় খোলা প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে প্রকৃত প্রতিযোগিতার পরিবর্তে কিছু গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এবার সরকারি মূল্য কমানো এবং দরপত্রে প্রতিযোগিতা বাড়ার কারণে নতুন অংশগ্রহণ দেখা গেলেও বাস্তবতা পুরোপুরি বদলায়নি। একটি বড় পশুর হাটের ইজারা মানেই কোটি কোটি টাকার লেনদেন। ফলে এ খাতে প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা বাড়ে। কিন্তু অতিরিক্ত ইজারামূল্য ও চাঁদাবাজির চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ ক্রেতা ও খামারিদের ওপর।

একসময় দেশের কোরবানির বাজার ভারতীয় গরুর ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল ছিল। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পশু প্রবেশ করায় স্থানীয় খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। বর্তমানে দেশীয় খামারিরা উৎপাদন বাড়িয়েছেন এবং সরকার সীমান্ত নজরদারি জোরদার করেছে। এবার সীমান্তবর্তী পশুর হাট বন্ধের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে বিদেশি পশুর অবৈধ প্রবেশ বন্ধ করা যায়। এটি স্থানীয় খামারিদের জন্য ইতিবাচক উদ্যোগ। কারণ বিদেশি পশু প্রবেশ করলে দেশীয় উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য পান না। তবে শুধু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নয়, স্থানীয় খামারিদের জন্য সহজ ঋণ, উন্নত পশুখাদ্য ও চিকিৎসা সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে।

কোরবানির পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি দীর্ঘদিনের সমস্যা। মহাসড়কে বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রায় প্রতিবছরই ওঠে। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায় এবং সেই অতিরিক্ত খরচ পশুর দামের সঙ্গে যুক্ত হয়। সরকার কঠোর অবস্থানের কথা বললেও মাঠপর্যায়ে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি। খামারিরা অভিযোগ করেন, পথে পথে হয়রানির কারণে তাদের লাভ কমে যায়। ফলে কোরবানির বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং সাধারণ ক্রেতাদেরও বেশি দাম গুনতে হয়।

পশুর হাটে স্বাস্থ্যবিধি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক হাটে পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই। পশুর বর্জ্য, কাদা ও দুর্গন্ধ আশপাশের পরিবেশকে দূষিত করে। বিশেষ করে রাজধানীর অস্থায়ী পশুর হাটগুলোতে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। বর্জ্য অপসারণে সমন্বয়হীনতা থাকায় নগরজীবনে ভোগান্তি বাড়ে। এ ছাড়া অসুস্থ পশু শনাক্ত ও পশুস্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থাও সব হাটে সমানভাবে কার্যকর নয়। আধুনিক ও পরিকল্পিত হাট ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই সমস্যা থেকে উত্তরণ কঠিন

কোরবানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপপণ্য হলো পশুর চামড়া। কিন্তু প্রতি বছর কাঁচা চামড়ার দাম, সংরক্ষণ সংকট ও বাজার বিশৃঙ্খলার কারণে এ খাত বড় ক্ষতির মুখে পড়ে। অনেক সময় চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করায় নষ্ট হয়ে যায়। অথচ বাংলাদেশের চামড়া শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল সম্ভাবনাময় খাত। যদি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, ন্যায্যমূল্য এবং আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়, তা হলে চামড়া শিল্প দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অনলাইন পশু বিক্রি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। শহরের অনেক মানুষ এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পশু দেখে কিনছেন। এতে সময় ও ভোগান্তি কমছে। খামারিরাও সরাসরি ক্রেতার কাছে পৌঁছতে পারছেন। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ই-কমার্সভিত্তিক পশুর হাট নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এখনো নিরাপদ লেনদেন, মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রতারণা প্রতিরোধে কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন রয়েছে।

কোরবানির অর্থনীতি একটি শক্তিশালী ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা চক্রাকার অর্থনীতির উদাহরণ। একটি পশু লালন-পালনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ঘাসচাষি, খড় ব্যবসায়ী, পশুখাদ্য প্রস্তুতকারী, ওষুধ বিক্রেতা, পরিবহন শ্রমিক, কসাই, চামড়া ব্যবসায়ী ও হাটের কর্মচারীসহ অসংখ্য মানুষ। অর্থাৎ একটি পশু বিক্রির অর্থ বহু মানুষের মধ্যে বণ্টিত হয় এবং তা সামগ্রিক অর্থনীতিকে সক্রিয় রাখে। এ কারণেই কোরবানির অর্থনীতি দেশের গ্রামীণ ও জাতীয় অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশের কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। পশুর হাট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ, খামারিদের সহজ ঋণ প্রদান, পশুখাদ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, ভেটেরিনারি সেবার উন্নয়ন এবং চামড়া শিল্প আধুনিকীকরণ এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে ডিজিটাল পশুর হাটের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্যসম্মত বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে। সুশাসন ছাড়া এ বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পূর্ণ সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।

ঈদুল আজহার কোরবানি মূলত ত্যাগ, মানবতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের শিক্ষা দেয়। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অর্থনৈতিক কর্মকা-ও আজ বাংলাদেশের বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোরবানির বাজার দেশের কৃষি, পশুপালন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। একই সঙ্গে এটি লাখো মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থানেরও উৎস। তবে এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকা-কে টেকসই ও স্বচ্ছ রাখতে হলে সুশাসন, পরিকল্পনা ও কার্যকর তদারকি জরুরি। সঠিক নীতি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও গ্রামীণ সমৃদ্ধির অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান : জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!