× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মো. মোজাম্মেল হক মৃৃধা, ই-কমার্স উদ্যোক্তা

প্রকাশিত: মে ১০, ২০২৬, ০৬:০৮ এএম

লজিস্টিকস খাত হতে পারে অর্থনীতির লাইফলাইন

মো. মোজাম্মেল হক মৃৃধা, ই-কমার্স উদ্যোক্তা

প্রকাশিত: মে ১০, ২০২৬, ০৬:০৮ এএম

লজিস্টিকস খাত হতে পারে অর্থনীতির লাইফলাইন

বাংলাদেশের চিরাচরিত অর্থনৈতিক কাঠামোতে এক নিঃশব্দ অথচ শক্তিশালী বিপ্লব ঘটে গেছে। এক সময়ের কৃষিনির্ভর কিংবা পরবর্তী সময়ে পোশাক খাতকেন্দ্রিক অর্থনীতি এখন ডিজিটাল কমার্স এবং তার অবিচ্ছেদ্য অংশ ‘লজিস্টিকস’ ও অনলাইন ডেলিভারি বিপ্লবের ওপর দাঁড়িয়ে। আজ স্মার্টফোনের একটি ক্লিকের মাধ্যমে যখন কোনো পণ্য গ্রাহকের দোরগোড়ায় পৌঁছে, তখন সেটি কেবল একটি পার্সেল পরিবহন নয়Ñ বরং এটি উদীয়মান স্মার্ট বাংলাদেশের সক্ষমতার এক জীবন্ত প্রমাণ।

বাংলাদেশের অর্থনীতির উদীয়মান চালিকাশক্তি এখন লজিস্টিকস ও অনলাইন ডেলিভারি খাত। ৩-৪ লাখ কর্মীর এই বিশাল ইন্ডাস্ট্রি আজ সরাসরি ১৫ লাখ মানুষের অন্নসংস্থানের জোগান দিচ্ছে। তৈরি পোশাক খাতের পর এটিই হতে যাচ্ছে দেশের পরবর্তী বড় কর্মসংস্থান ক্ষেত্র। ডিজিটাল অর্থনীতির এই ‘লাইফলাইন’কে টেকসই করতে একটি সমন্বিত ‘জাতীয় লজিস্টিকস নীতিমালা’ এখন সময়ের দাবি।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডÑ তারুণ্যের এক বিশাল কর্মসংস্থান ক্ষেত্র : লজিস্টিকস খাতের জনবল কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি এখন আর কেবল কায়িক শ্রমের কোনো ক্ষেত্র নয়, বরং দেশের তরুণ ও শিক্ষিত জনশক্তির এক বিশাল কর্মযজ্ঞে পরিণত হয়েছে। মূলত ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্ররা তাদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে এবং পরিবারকে সাহায্য করতে এখানে পার্ট-টাইম ও ফুল-টাইম কাজ করছে। তারা প্রতি মাসে গড়ে ১৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত আয় করছে, যা উচ্চশিক্ষার ব্যয়ভার নির্বাহে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

বাকিদের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ হলো স্নাতক সম্পন্ন করা যুবক, যারা স্থায়ী চাকরির অপেক্ষায় না থেকে নিজেকে স্বাবলম্বী করছে এবং স্বল্প আয়ের পেশাজীবী, যারা কর্মঘণ্টার বাইরে অতিরিক্ত আয়ের উৎস হিসেবে এই ডেলিভারি পেশাকে বেছে নিয়েছেন। যদিও বর্তমানে নারী কর্মীর অংশগ্রহণ ৩-৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তবে এফ-কমার্স বা ফেসবুক-ভিত্তিক নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই হার দ্রুত বাড়ছে। 

লজিস্টিকস ইকোসিস্টেমÑ প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সক্ষমতা ও বিশালত্বের পরিসংখ্যান : 

বাংলাদেশের প্রধান লজিস্টিকস ও ডেলিভারি কোম্পানিগুলোর জনবল কাঠামো এই খাতের বিশালত্বের চাক্ষুষ প্রমাণ দেয়। বর্তমানে ফুডপান্ডা সারা দেশে এক লাখের বেশি নিবন্ধিত রাইডার নিয়ে দেশের বৃহত্তম ডেলিভারি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। শীর্ষ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান দারাজের নিজস্ব লজিস্টিকস উইং ‘ডেক্স’-এ বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার ডেলিভারি পার্টনার নিয়োজিত। দেশীয় মালিকানাধীন স্টার্টআপগুলোর মধ্যে স্টেডফাস্ট কুরিয়ার অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে, যেখানে বর্তমানে প্রায় ১৮ হাজার থেকে ২০ হাজার কর্মী কাজ করছেন। এ ছাড়াও পাঠাও, রেডএক্স এবং ই-কুরিয়ারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে আরও প্রায় এক লাখ কর্মীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে। 

অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তিÑ প্রবৃদ্ধিও ডেটা ও ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন :

লজিস্টিকস খাতের এই অগ্রযাত্রা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বিশাল প্রভাব ফেলছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ২০২৬ সাল নাগাদ এটি চার বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা স্পর্শ করবে। সাধারণত ই-কমার্সে পণ্যমূল্যের ১০-১২ শতাংশ লজিস্টিকস খরচ হিসেবে ধরা হয়, যার অর্থ হলো, লজিস্টিকস খাতের নিজস্ব বার্ষিক বাজারমূল্য বর্তমানে প্রায় আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার কোটি টাকা। 

প্রবৃদ্ধির অন্তরায়Ñ রিভার্স লজিস্টিকস ও লাস্ট-মাইল চ্যালেঞ্জ : 

এত প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও এই খাতকে কিছু জটিল অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘রিভার্স লজিস্টিকস’ বা পণ্য ফেরত আসা। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ অর্ডার কোনো না কোনো কারণে রিটার্ন হয়। একটি পণ্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং আবার তা ফেরত নিয়ে আসার প্রক্রিয়াটি লজিস্টিকস কোম্পানির জন্য দ্বিগুণ ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে একটি সমন্বিত ‘রিটার্ন পলিসি’ বা ডেলিভারির সময় ‘স্পট ভেরিফিকেশন’ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হলে এই সিস্টেমের অপচয় কমিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মার্চেন্টদের বড় লোকসানের হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট প্রতিবেশী দেশগুলোর নীতি থেকে শিক্ষা : 

বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্স (খচও) অনুযায়ী বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানোর অনেক সুযোগ রয়েছে। উন্নত বিশ্বে লজিস্টিকস খরচ জিডিপির ৮ শতাংশের নিচে থাকে, যেখানে বাংলাদেশে এটি এখনো ১০-১২ শতাংশ। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত তাদের ‘ঘধঃরড়হধষ খড়মরংঃরপং চড়ষরপু (২০২২)’-এর মাধ্যমে লজিস্টিকস খরচ জিডিপির ১৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে আট শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় শিক্ষা যে, তীব্র যানজট এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করতে না পারলে লাস্ট-মাইল ডেলিভারি কস্ট কমিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টেকা কঠিন হবে।

নীতিনির্ধারণী অগ্রাধিকারÑ স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি ও সামাজিক সুরক্ষা : 

এত বিশাল একটি খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য বিচ্ছিন্ন নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সমন্বিত নীতিমালা ও সরকারি নজরদারি প্রয়োজন

শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি : লজিস্টিকসকে একটি ‘স্বতন্ত্র শিল্প’  হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিলে উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ ও ট্যাক্স হলিডে সুবিধা সহজে পাবেন।

গিগ ওয়ার্কার পলিসি : রাইডারদের জন্য বাধ্যতামূলক ‘দুর্ঘটনা ও স্বাস্থ্য বিমা’ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ন্যূনতম মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, যাতে তারা কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ বোধ করে।

আগামীর প্রস্তুতি গ্রিন লজিস্টিকস ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়ন : 

লজিস্টিকস এখন একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত বিজ্ঞান, তাই এর আধুনিকায়ন জরুরি

কারিগরি শিক্ষা : জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধীনে ‘সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টে’র ওপর বিশেষায়িত কোর্স চালু করা দরকার।

ইলেকট্রিক ভেহিকেল : লজিস্টিকস কাজে ব্যবহৃত ই-বাইক বা ভ্যান আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলে অপারেশনাল খরচ যেমন কমবে, তেমনি কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পেয়ে পরিবেশবান্ধব সাপ্লাই চেইন গড়ে উঠবে।

ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোরিং : রাইডারদের কাজের ট্রানজেকশন ডেটা ব্যবহার করে তাদের জন্য ব্যাংক লোন বা ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে তারা সহজেই তাদের পেশাগত উন্নতির জন্য পুঁজি পায়।

ডিসিআরএএফের ভিশন গ্রামীণ অর্থনীতি ও নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়ন :

ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ফোরাম (উঈজঅঋ) মনে করে, ডাক বিভাগ ও ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের অবকাঠামোকে বেসরকারি লজিস্টিকসের সঙ্গে যুক্ত করলে (চচচ মডেল) প্রান্তিক পর্যায়ে ডেলিভারি খরচ কয়েকগুণ কমবে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৫ লাখের বেশি এফ-কমার্স উদ্যোক্তা রয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশ নারী। এই লজিস্টিকস সুবিধা গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়নে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে মূলধারার সঙ্গে সংযুক্ত করবে।

বাংলাদেশের অনলাইন ডেলিভারি ও লজিস্টিকস খাত আগামীর অর্থনীতির প্রধান ইঞ্জিন। ১৫ লাখ মানুষের অন্নসংস্থানের এই জোগানদাতাকে অবহেলার সুযোগ নেই। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সঠিক নীতিমালা এবং প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটলে লজিস্টিকস খাতই হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির পরবর্তী ‘মাস্টারস্ট্রোক’। গ্রাম ও শহরের অর্থনৈতিক বৈষম্য ঘুচিয়ে এক অন্তর্ভুক্তিমূলক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এই খাতের সংস্কার ও আধুনিকায়ন এখন রাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!