বিগত অর্ধশতাব্দী ধরে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি লক্ষ্য করলে একটি প্রচ্ছন্ন স্বস্তি আমাদের নীতি-নির্ধারকদের আচ্ছন্ন করে রাখে, যার নাম ‘রেমিট্যান্স’ বা প্রবাসী আয়।
কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির সাম্প্রতিক পরিবর্তন, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতার মুখে দাঁড়িয়ে আজ একটি মৌলিক এবং অত্যন্ত অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে, কেবল শ্রম অভিবাসন-নির্ভর এই মডেল কি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট? নাকি আমরা এমন এক অর্থনৈতিক চক্রে আটকা পড়ে যাচ্ছি, যা সাময়িকভাবে আমাদের সচ্ছলতা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে আমাদের একটি অনুৎপাদনশীল জাতিতে পরিণত করছে?
প্রবৃদ্ধির প্রান্তিক উপযোগিতা : গাণিতিক সমীকরণ ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
আমরা সাধারণত রেমিট্যান্সের অবদানকে দেশের জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) এক-ডিজিটের শতাংশ (৬-৭%) হিসাবে দেখে অভ্যস্ত এবং একেই প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি মনে করি। কিন্তু আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থনীতি ও বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন সমীকরণ এই সরলরৈখিক ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে চ্যালেঞ্জ করে । ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ২০১৩ সালের একটি বৈশ্বিক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে দেখানো হয়েছে যে, কোনো দেশের মাথাপিছু রেমিট্যান্সে যদি স্থায়ীভাবে ১০% বৃদ্ধি ঘটে, তবে তার বিপরীতে সেই দেশের মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঘটে মাত্র ০.১৩%। ২০২২ সালের আরও একটি সাম্প্রতিক ও তুলনামূলক গবেষণা বলছে, এই প্রভাব বড়জোর ০.৬৬% হতে পারে।
এই গাণিতিক সমীকরণটিকে যদি আমরা বাংলাদেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে মেলাই, তবে এর অন্তর্নিহিত বার্তাটি বেশ চিন্তার খোরাক জোগায়। ধরুন, বাংলাদেশের বর্তমান বার্ষিক রেমিট্যান্স প্রবাহ গড়ে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার । কোনো বছর যদি আমাদের রেমিট্যান্সে ১০% এর একটি বিশাল লাফ দেখা যায় এবং তা ২৬.৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, তবে ২০২২ সালের প্রাক্কলন (০.৬৬%) অনুযায়ী আমাদের মোট জাতীয় জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে (৬% হিসেবে) এর সরাসরি নেট অবদান হবে মাত্র ০.০৩৯৬% (০.৬৬%ী৬%)।
এই গাণিতিক মডেলটি একটি চরম সত্যকে উন্মোচন করে : রেমিট্যান্স মূলত একটি সামাজিক নিরাপত্তা জাল হিসেবে চমৎকার কাজ করে এবং দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রাখে (যেমন নেপালে দারিদ্র্য ৪০% কমিয়েছে), কিন্তু এটি এককভাবে কোনো দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে টেকসইভাবে টেনে তোলার বা ‘ইকোনমিক পাওয়ার হাউস’ তৈরি করার মূল ইঞ্জিন হতে পারে না।
অনুৎপাদনশীল ভোগ বনাম বিনিয়োগের সংকট
কেন রেমিট্যান্সের এই বিশাল প্রবাহ জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে কচ্ছপগতির প্রভাব ফেলে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে উন্নয়ন অর্থনীতির ‘কনসাম্পশন-ইনভেস্টমেন্ট রেশিও’ বা ভোগ বনাম বিনিয়োগের অনুপাতের মধ্যে। কেরালা ও বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের ব্যবহারের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই অর্থের সিংহভাগ ব্যয় হয় তাৎক্ষণিক ভোগ, বিলাসবহুল জীবনযাপন, জমি কেনা এবং সুউচ্চ ও আধুনিক অট্টালিকা বা ঘরবাড়ি নির্মাণে।
গাণিতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এ ধরনের ব্যয় সামাজিকভাবে জীবনযাত্রার মান ও মানুষের মাথাপিছু ক্রয়ক্ষমতা বাড়ালেও, দেশের দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন ক্ষমতা বা নতুন কোনো কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে না। একটি বহুতল ভবন নির্মাণ জিডিপির খাতায় সাময়িক এককালীন অবদান রাখলেও, তা থেকে পরবর্তী বছরগুলোতে কোনো ধারাবাহিক ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’ বা শিল্প উৎপাদন আসে না। ফলে অর্থনীতির যে ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ বা গুণক প্রভাব থাকার কথা, তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়।
ডাচ ডিজিজ এবং মজুরি মুদ্রাস্ফীতির ফাঁদ
রেমিট্যান্স-নির্ভর অর্থনীতির আরেকটি বড় তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক সংকট হলো আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বহুল পরিচিত ‘ডাচ ডিজিজ’ বা ওলন্দাজ রোগ। যখন কোনো দেশে বৈদেশিক মুদ্রার (রেমিট্যান্সের মাধ্যমে) ব্যাপক আগমন ঘটে, তখন স্থানীয় মুদ্রার মান কৃত্রিমভাবে শক্তিশালী হয় এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে এক ধরনের ‘মজুরি মুদ্রাস্ফীতি’ দেখা দেয়।
কেরালার শ্রমবাজারে দেখা গেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চ মজুরির সঙ্গে স্থানীয় শ্রমবাজারের একটি গভীর লিংক তৈরি হওয়ায় স্থানীয় শ্রমিকদের মজুরি প্রত্যাশাও অনেকখানি বেড়ে গেছে। এর ফলে স্থানীয় ছোট ও মাঝারি শিল্পমালিকদের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তাদের প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। ফলস্বরূপ, বিনিয়োগকারীরা কেরালা ছেড়ে প্রতিবেশী তামিলনাড়ুর মতো ব্যবসাবান্ধব ও সাশ্রয়ী রাজ্যে চলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের রেমিট্যান্স-সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোতেও (যেমন সিলেট, নোয়াখালী বা চট্টগ্রাম) ঠিক একই চিত্র দৃশ্যমান। রেমিট্যান্সের সহজলভ্যতার কারণে ওইসব অঞ্চলে স্থানীয় কৃষি বা উৎপাদনশীল খাতে তীব্র শ্রমসংকট দেখা দেয় এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, যা পরোক্ষভাবে দেশের সামগ্রিক শিল্পায়নের গতিকে মন্থর ও ব্যয়বহুল করে তোলে।
ব্রেন ড্রেন বনাম ব্রেন সার্কুলেশন
এই দুষ্টচক্র থেকে বের হওয়ার কি কোনো উপায় নেই? ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ গৌরব খান্নার গবেষণা এখানে একটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে, যাকে তিনি ‘ব্রেন সার্কুলেশন’ বা মেধা সঞ্চালন বলে অভিহিত করেছেন। বাংলাদেশ যেভাবে প্রথাগতভাবে ‘ব্রেন ড্রেন’ বা মেধা পাচারের শিকার, সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিকে কিন্তু তার প্রতিফলন হয়নি বা সেভাবে অর্থনীতিকে চালিত করা যায়নি।
ভারতে গত দুই দশকে লাখ লাখ তরুণ সিলিকন ভ্যালিতে পাড়ি জমানোর আশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ও উচ্চতর প্রযুক্তিগত ডিগ্রি অর্জন করেছে। তাদের মধ্যে যারা লটারি জিতে বা সুযোগ পেয়ে বিদেশে গেছে, তারা যেমন রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে; তেমনি যারা সুযোগ না পেয়ে দেশে রয়ে গেছে, তারা দেশের মাটিতেই এক অভূতপূর্ব আইটি বিপ্লবের জন্ম দিয়েছে। এর ফলে তৈরি হয়েছে বেঙ্গালুরু বা কর্ণাটকের মতো বৈশ্বিক আইটি হাব, যা কোনো পণ্য জাহাজীকরণ না করেই দূরবর্তীভাবে (জবসড়ঃবষু) তথ্যপ্রযুক্তি সেবা রপ্তানি করতে পারছে ।
গাণিতিক সমীকরণে ভারতের এই ‘সেবা রপ্তানি’র মডেলটির শক্তি খুবই দৃশ্যমান। বর্তমানে ভারতের আইটি বা সেবা খাতের বার্ষিক রপ্তানি আয় ২২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা তাদের দেশের মোট প্রথাগত রেমিট্যান্স আয়ের (১৩৫ বিলিয়ন ডলার) চেয়েও অনেক বেশি । ভারত শুধু শ্রম রপ্তানি করেনি, তারা দক্ষতা ও মেধা সঞ্চালন করেছে। বিপরীতে, বাংলাদেশ এখনো মূলত অদক্ষ বা আধা-দক্ষ কায়িক শ্রম রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল, যার ফলে আমাদের মানব মূলধনের গুণক প্রভাব (গঁষঃরঢ়ষরবৎ বভভবপঃ) স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে না ।
‘অবিরাম চক্র’ ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি
রেমিট্যান্সের টাকা দিয়ে সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করা অবশ্যই একটি ভালো ‘মানব মূলধন বিনিয়োগ’। কিন্তু সমীকরণটি তখনই ভেঙে পড়ে, যখন সেই শিক্ষিত তরুণের জন্য দেশের অভ্যন্তরে কোনো উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বা শিল্প খাত তৈরি হয় না। কেরালা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে ভারতের শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও তাদের পুঁজিবাদবিরোধী নীতি এবং দুর্বল শিল্পায়নের কারণে দেশের সেরা গ্র্যাজুয়েটরা বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়ছে। এটি একটি বিপজ্জনক ‘অবিরাম চক্র’ (ঠরপরড়ঁং ঈুপষব) তৈরি করে দেশ সচ্ছল হচ্ছে, তাই মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে; কিন্তু দেশে শিল্প না থাকায় সেই শিক্ষিত মানুষগুলো আবার দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ভীতি হলোÑ বাহ্যিক ধাক্কা বা ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি। ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণ এবং শিল্পের স্থানীয়করণ নীতির কারণে এ বছর কেরালার প্রবাসী আয় প্রায় ২০% পর্যন্ত ধসে পড়তে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতিও সম্পূর্ণভাবে মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। যদি কোনো কারণে আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ ২০% কমে যায়, তবে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং টাকার মানের ওপর যে বিপর্যয় নেমে আসবে, তা সামাল দেওয়ার মতো বিকল্প কোনো শক্তিশালী শিল্প খাত বা সেবা খাত আমাদের তৈরি নেই।
বাংলাদেশের জন্য করণীয়
বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে চীন, ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সাধারণ ম্যানুফ্যাকচারিং বা পণ্য রপ্তানি করে রাতারাতি ধনী হওয়া বাংলাদেশের জন্য কঠিন, যেখানে আমরা তৈরি পোশাক (জগএ) খাতের বাইরে বড় কোনো বৈচিত্র্য আনতে পারছি না । কিন্তু তার সমাধান কেবল আরও বেশি শ্রম অভিবাসন হতে পারে না। যদি আমরা কেবল রেমিট্যান্সের ওপর ভরসা করে বসে থাকি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ‘ব্যবসা করার সহজ সূচক’ (ঊধংব ড়ভ উড়রহম ইঁংরহবংং) বা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ উন্নত না করি, তবে টেকসই উন্নয়ন অধরাই থেকে যাবে।
আমাদের জরুরি ভিত্তিতে দুটি জায়গায় নীতিগত পরিবর্তন আনতে হবে : ১. বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি: কেরালা যেভাবে অতি-রাজনৈতিকীকরণ ও নীতিগত কারণে বিনিয়োগ হারিয়েছে, বাংলাদেশকেও সেই ভুল থেকে শিখতে হবে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে না গিয়ে যাতে বন্ড, পুঁজিবাজার এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (ঝঊত) সরাসরি বিনিয়োগ হয়, তার জন্য আর্থিক ও নীতিগত প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে। ২. দক্ষতা ও সেবা রপ্তানি: আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সস্তা কেরানি তৈরির কারখানা থেকে বের করে প্রযুক্তি ও আইটি-নির্ভর করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ভারতের মতো ‘সেবা রপ্তানি’ (ওঞ/ঝবৎারপব ঊীঢ়ড়ৎঃ), যাতে আমাদের মেধাবীরা দেশে বসেই বিশ্ববাজার থেকে ডলার আয় করতে পারে, যা ডাচ ডিজিজের ঝুঁকি ছাড়াই দেশের জিডিপিতে সরাসরি অধিক প্রভাব ফেলবে।
অভিবাসন সাময়িকভাবে একজন প্রবাসী এবং তার পরিবারকে সচ্ছল করে তোলে, এতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু বর্তমানের এই ক্রমবর্ধমান বিশ্বায়নবিরোধী নীতি, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, সংরক্ষণবাদ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (অও) যুগে সামগ্রিক জাতীয় প্রবৃদ্ধির জন্য কেবল ‘শ্রম রপ্তানি’র ওপর নির্ভর করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশকে যদি সত্যিকার অর্থে একটি উচ্চ মধ্যম আয়ের বা উন্নত অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে হয়, তবে রেমিট্যান্সের এই ‘নিরাপত্তা জাল’কে দ্রুত ‘বিনিয়োগের জ্বালানিতে’ রূপান্তর করে দেশের অভ্যন্তরেই শিল্পায়ন ও সেবা খাতের বিকাশ ঘটাতে হবে। অন্যথায়, আমরা চিরকাল কেবল শ্রমিক প্রেরক দেশ হিসেবেই থেকে যাব, কখনোই টেকসই অর্থনৈতিক পাওয়ার হাউস হতে পারব না।

