ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সম্পাদকীয়

কাঠগড়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নজর দিন

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ৩, ২০২৬, ০৬:০৩ এএম

একটি হাসপাতাল মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। অসুস্থতা, বিপদ কিংবা নতুন জীবনের আগমনের মুহূর্তে মানুষ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওপরই সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখে। কিন্তু যখন সেই হাসপাতালই মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়, বরং গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য গভীর লজ্জা ও উদ্বেগের বিষয়। রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা সেই ভয়াবহ বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিয়েছে।

একজন মা দশ মাস দশ দিন গর্ভে সন্তান ধারণ করেন। অসংখ্য স্বপ্ন, অপেক্ষা আর ভালোবাসা নিয়ে তিনি সন্তানের মুখ দেখার প্রহর গোনেন। অথচ জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যদি অব্যবস্থাপনা, অবহেলা কিংবা দায়িত্বহীনতার কারণে সেই সন্তান মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে, তবে তার চেয়ে নির্মম ঘটনা আর কী হতে পারে? আদ্-দ্বীন হাসপাতালে যা ঘটেছে, তা কোনোভাবেই সাধারণ দুর্ঘটনা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ একটি হাসপাতালে নবজাতক পরিচর্যার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে ন্যূনতম নিরাপত্তা ও পরিবেশ নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের মৌলিক দায়িত্ব।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নবজাতকদের রাখা হয়েছিল এমন একটি কক্ষে, যেখানে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা ছিল না। একদিকে এসির তীব্র ঠান্ডা, অন্যদিকে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাÑ দুইয়ের মাঝে অসহায় হয়ে পড়ে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুরা। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মায়েদের অভিযোগ অনুযায়ী, রাতেই দায়িত্বরত কর্মীদের কাছে এসি বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। যদি সত্যিই এমন সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হয়ে থাকে, তবে সেটি কি নিছক অবহেলা নাকি দায়িত্ব পালনে গুরুতর ব্যর্থতা।

ঘটনার পর পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে হাসপাতালটিতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ঘাটতি, খাদ্য সংরক্ষণে অনিয়ম এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব তথ্য আরও স্পষ্ট করে যে, এটি কেবল আকস্মিক দুর্ঘটনা নয় বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিহীনতার বহির্প্রকাশ। প্রশ্ন হচ্ছে, এত বড় একটি প্রতিষ্ঠানে যদি মৌলিক মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পর্যন্ত নিশ্চিত না থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এতদিন কী করছিল?

বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন, অতিরিক্ত বিল, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাব নিয়ে বহুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্ত কমিটি গঠন, প্রতিবেদন জমা এবং কিছুদিনের আলোচনা শেষে বিষয়গুলো ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায়। ফলে ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার বদলে দায়মুক্তির সংস্কৃতিই শক্তিশালী হয়।

এই ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পৃথকভাবে তদন্ত করছে। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে জনগণ শুধু তদন্ত প্রতিবেদন দেখতে চায় না।  তারা দেখতে চায় কার্যকর বিচার। প্রকৃত দায়ী ব্যক্তি চিকিৎসক, নার্স, প্রশাসনিক কর্মকর্তা কিংবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যেই হোক না কেন, কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখা যাবে না। একই সঙ্গে তদন্ত যেন কোনো প্রভাব, পরিচয় বা প্রতিষ্ঠানের সামাজিক অবস্থানের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের সব হাসপাতালের নবজাতক পরিচর্যা ইউনিট, প্রসূতি বিভাগ এবং জরুরি সেবার মান পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। নিয়মিত অডিট, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, রোগী নিরাপত্তা প্রটোকল এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে পারে।

ছয়টি নবজাতকের মৃত্যু কোনো সংখ্যা নয়। প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি মায়ের আশা এবং একটি সম্ভাবনাময় জীবনের অবসান। তাই এই ঘটনায় দায়ীদের বিচারের পাশাপাশি এমন সংস্কার প্রয়োজন, যাতে আর কোনো হাসপাতালের অবহেলায় কোনো মায়ের কোল খালি না হয়। স্বাস্থ্যসেবার নামে অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার যে সংস্কৃতি দেশে গড়ে উঠেছে, তার অবসান ঘটানোর কোনো বিকল্প নেই। কেননা হাসপাতাল মানুষের জীবনের নিরাপত্তার প্রতীক, মৃত্যুর নয়।