একসময় বাংলাদেশের পরিবারগুলোতে একটি বিশ্বাস খুব দৃঢ় ছিলÑ ছেলে-মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করতে পারলেই জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। দরিদ্র কৃষক বাবা জমি বিক্রি করেছেন, দিনমজুর মা গহনা বন্ধক রেখেছেন, শুধু সন্তানের হাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ তুলে দেওয়ার আশায়। সেই সনদই ছিল পরিবারের স্বপ্ন, সামাজিক মর্যাদা আর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রতীক। কিন্তু আজ বাস্তবতা নির্মমভাবে বদলে গেছে। হাতে সনদ আছে, কিন্তু নেই নিশ্চিত কর্মসংস্থান; আছে ডিগ্রি, কিন্তু নেই জীবনের স্বপ্ন দেখার সাহস। বাংলাদেশের লাখো তরুণ এখন এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।
বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ১৭৫টি। গত দুই দশকে উচ্চশিক্ষার বিস্তার চোখে পড়ার মতো হলেও সেই অনুপাতে বাড়েনি শিক্ষার মান কিংবা কর্মসংস্থানের সুযোগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও বিভিন্ন শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বলছে, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যেই বেকারত্বের হার তুলনামূলক বেশি। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হলেও চাকরির বাজারে তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ফলে ডিগ্রিধারী তরুণদের একটি বড় অংশ হতাশা, অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপে আক্রান্ত হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলোÑ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি এখন অনেক ক্ষেত্রে কেবল আনুষ্ঠানিক সনদে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা চার-পাঁচ বছর পড়াশোনা শেষ করেও বাস্তব দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না। চাকরিদাতারা প্রায়ই অভিযোগ করেনÑ গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে যোগাযোগ দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষা ও কর্মবাজারের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর বিচ্ছিন্নতা।
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা যেন ধীরে ধীরে ‘সনদ উৎপাদনের কারখানায়’ রূপ নিচ্ছে। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হচ্ছে, আসন বাড়ছে, বিভাগ বাড়ছে; কিন্তু বাড়ছে না গবেষণা, উদ্ভাবন কিংবা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা। বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, গবেষণাগার নেই, আধুনিক লাইব্রেরি নেই। কোথাও কোথাও ভাড়া করা ভবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় শিক্ষার্থীরা যে মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে, সেটাই স্বাভাবিক।
অন্যদিকে সমাজেও একটি ভুল ধারণা গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেÑ সফল হতে হলে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাগবে। ফলে কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাকে এখনো অনেক পরিবার নিচু চোখে দেখে। অথচ বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় দক্ষতাই সবচেয়ে বড় শক্তি। উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তি, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও উদ্ভাবনভিত্তিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশ এখনো প্রচলিত মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার ভারে আটকে আছে।
শিক্ষিত বেকারত্বের এ সংকট কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ও মানসিক সংকটেও রূপ নিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে বছরের পর বছর চাকরি না পাওয়া তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশার চাপ তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। অনেকেই আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছেন, কেউ কেউ হতাশায় অপরাধ কিংবা মাদকাসক্তির পথেও জড়িয়ে পড়ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের হতাশা, ক্ষোভ ও ব্যর্থতার গল্প এখন নিয়মিত দৃশ্য।
আরও বেদনাদায়ক হলোÑ শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ এখন বিদেশমুখী। দেশে যোগ্যতা অনুযায়ী সুযোগ না পেয়ে তারা বিদেশে নি¤œমানের কাজ করতেও রাজি হচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন দেশের মেধা বাইরে চলে যাচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রও দক্ষ মানবসম্পদ হারাচ্ছে। অথচ এই তরুণরাই হতে পারত দেশের উন্নয়নের প্রধান শক্তি।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষার মান, গবেষণার পরিবেশ ও দক্ষতার উন্নয়ন। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা প্রয়োগ করতে হবে। অবকাঠামো, শিক্ষক সংখ্যা, গবেষণা সুবিধা ও আর্থিক সক্ষমতা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়।
একইসঙ্গে শিক্ষাক্রমকে যুগোপযোগী করতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান দিয়ে টিকে থাকা সম্ভব নয়। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, যোগাযোগ দক্ষতা এবং বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণকে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সময়ই বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন।
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতিও গুরুত্ব বাড়ানো জরুরি। সব শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়মুখী করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দক্ষ টেকনিশিয়ান, কৃষি উদ্যোক্তা, সফটওয়্যার ডেভেলপার বা ফ্রিল্যান্সারÑ এদের চাহিদা বিশ্বব্যাপী বাড়ছে। তাই শিক্ষাকে চাকরির সনদ নয়, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যম হিসাবে গড়ে তুলতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, একটি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ সমাজ। কিন্তু সেই তরুণদের যদি আমরা শুধু সনদ দিয়ে হতাশা উপহার দিই, তবে তা জাতির ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ সংকেত। উচ্চশিক্ষা এমন হওয়া উচিত, যা তরুণদের আত্মবিশ্বাসী করে, স্বপ্ন দেখতে শেখায় এবং জীবন গড়ার পথ দেখায়। আজ বাংলাদেশের বহু তরুণের হাতে সনদ আছে, কিন্তু চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন নেই। এই বাস্তবতা বদলাতে না পারলে শিক্ষার বিস্তার কোনো অর্জন নয়; বরং সেটি হবে এক নীরব জাতীয় ব্যর্থতার গল্প।

