× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ডা. মো. নাসির উদ্দিন, পিএইচডি, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ও গবেষক, সাবেক অতিরিক্ত সচিব

প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ০৫:৫৭ এএম

বাংলাদেশে শিশুধর্ষণ ও হত্যার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট

ডা. মো. নাসির উদ্দিন, পিএইচডি, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ও গবেষক, সাবেক অতিরিক্ত সচিব

প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ০৫:৫৭ এএম

বাংলাদেশে শিশুধর্ষণ ও হত্যার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট

সম্প্রতি বাংলাদেশে শিশুধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা উদ্বেজনক সামাজিক সমম্যায় পরিণত হয়েছে। সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ও হত্যার প্রবণতা গত কয়েক বছরে আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসার ধর্ষণ ও হত্যার নিশৃংস ঘটনা সমগ্র বাংলাদেশকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে।

বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেশের শিশু নির্যাতনের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে মোট দুই হাজার ৩৩৯টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সর্বশেষ ২০২৬ সালে ৯৪টি, এর আগে ২০২৫ সালে ৪৫৬টি, ২০২৪ সালে ২৩৪টি, ২০২৩ সালে ৩১৪টি, ২০২২ সালে ৫৬১টি এবং ২০২১ সালে ৭৭৪টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিগত পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ বছরের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪৪৯টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিশু যৌন সহিংসতার কারণসমূহ:

বাংলাদেশে শিশু যৌন সহিংসতা একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক সংকট, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং দুর্বল সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, যখন একটি সমাজে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক অস্থিরতা ও নৈতিক বিভ্রান্তি বৃদ্ধি পায়, তখন দুর্বল জনগোষ্ঠী বিশেষত নারী ও শিশুরা সহিংসতার প্রধান শিকার হয়ে ওঠে।

১. দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য ও অনিরাপদ শৈশব

বাংলাদেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুরা তুলনামূলক বেশি  যৌন সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকে। শহর অঞ্চলের বস্তিতে শিশুদের পিতা মাতাকে জীবিকার উদ্দেশ্যে শিশুকে একা রেখে বা কারো জিম্মায় রেখে বের হতে হয় যা শিশুকে পরিপূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পারে না। বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাব, অপর্যাপ্ত বাসস্থান এবং অপরাধপ্রবণ পরিবেশ শিশুদের আরও অনিরাপদ করে তোলে। দরিদ্র পরিবারের শিশুরা অনেক সময় গৃহকর্ম, কারখানা, দোকান বা অনিরাপদ শ্রমপরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হয়, যেখানে তারা যৌন শোষণ ও নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকে।

এ ধরনের সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা শিশুদের যৌন সহিংসতার  মুখোমুখি করে। সমাজবিজ্ঞানী ক্রিসটিন স্কেউটেন পারিবারিক সহিংসতা ও ক্ষমতার কাঠামো বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি সহিংসতার শিকার হয়।

২. পারিবারিক ভাঙন ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা

বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো ঐতিহ্যগতভাবে পরিবারকেন্দ্রিক হলেও সাম্প্রতিক সময়ে নগরায়ণ, অর্থনৈতিক চাপ, দাম্পত্য সংকট ও সামাজিক পরিবর্তনের ফলে পারিবারিক বন্ধন ক্রমাগত দুর্বল হয়ে যাচ্ছ। অনেক পরিবারে বাবা-মায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব, বিচ্ছেদ, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা বাবা-মায়ের দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে থাকার কারণে শিশুরা পর্যাপ্ত মানসিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হয়।

গবেষক ডেভিড ফিঙ্কেলহোর শিশু নির্যাতনের সামাজিক বিশ্লেষণে উলে¬øখ করেন যে, শিশুদের অসহায়ত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও নীরবতা অপরাধীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে।

৩। সহমর্মিতার সংকট ও বিকৃত যৌন মানসিকতা

বর্তমান সমাজে সহমর্মিতা, নৈতিক দায়িত্ববোধ ও মানবিক সংবেদনশীলতার সংকট নিয়ে অনেক গবেষক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যখন মানুষ অন্যের কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা হারাতে শুরু করে, তখন সহিংসতা ও নির্যাতনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

মনোবিজ্ঞানী জুডিথ হারম্যান বলেন, সহিংস সমাজে মানুষ ধীরে ধীরে অন্যের যন্ত্রণার প্রতি অসংবেদনশীল হয়ে পড়তে পারে। এই অসংবেদনশীলতা সামাজিক সহিংসতার বিস্তারে ভূমিকা রাখে।

৪. প্রযুক্তি, মাদক, পর্নোগ্রাফি ও সহিংস সংস্কৃতি

প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনলেও এর অপব্যবহার নতুন ধরনের সামাজিক সংকট সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের কিশোর ও তরুণদের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট ব্যবহার, পর্নোগ্রাফি এবং অনলাইন যৌন কনটেন্টের সহজলভ্যতা আচরণগত বিকৃতি তৈরির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে অনেক গবেষক মত দিয়েছেন। বিশেষত শিশুদের অনলাইন গ্রুমিং, ব¬্যাকমেইল এবং সাইবার শোষণ নতুন বাস্তবতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে শিশুদের  মানসিকভাবে প্রভাবিত করে।

শিশু যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে করণীয়:

১. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারভিত্তিক নিরাপত্তা শিক্ষা

শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রথম দায়িত্ব পরিবারের। পরিবারের পক্ষ থেকে শিশুর সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।  শিশুদের বয়সোপযোগী ভাষায় শরীর সচেতনতা, ব্যক্তিগত সীমারেখা, অনিরাপদ স্পর্শ এবং ‘না’ বলার অধিকার সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। বাংলাদেশের অনেক পরিবারে যৌনতা বা শরীরবিষয়ক আলোচনা নিষিদ্ধ বা লজ্জাজনক মনে করা হয়। ফলে শিশুরা নির্যাতনের শিকার হলেও বিষয়টি প্রকাশ করতে ভয় পায়। পরিবারে বন্ধুত্বপূর্ণ ও বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি, যাতে শিশু বিপদের সময় সহজে কথা বলতে পারে।

২. রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন

শিশু যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে শুধু আইন নয়; বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন অপরিহার্য। যখন সমাজে রাজনৈতিক সহিংসতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিচারহীনতা বৃদ্ধি পায়, তখন সামগ্রিক সামাজিক নৈতিকতাও দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব ব্যবহার করে বিচার এড়ানোর চেষ্টা করে। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি করে। সামাজিকভাবে নারী ও শিশুর প্রতি সম্মানভিত্তিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতষ্ঠানকে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল উপস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভুক্তভোগীকে হেয় না করা হয়।

৩. আইনের যথাযথ ও কার্যকর প্রয়োগ

শিশু যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও কেবল আইন থাকাই যথেষ্ট নয়; এর কার্যকর, নিরপেক্ষ ও দ্রুত প্রয়োগ নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটনের পর বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক চাপ এবং প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের কারণে বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যা অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির মানসিকতা তৈরি করে। বিশেষত গ্রামীণ অঞ্চলে অনেক ঘটনা স্থানীয়ভাবে আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়, যা ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করে।

বাংলাদেশে শিশুধর্ষণ ও হত্যার বৃদ্ধি একটি গভীর সামাজিক সংকটের প্রতিফলন। এটি কেবল ব্যক্তিগত নৈতিক বিচ্যুতি নয়; বরং পারিবারিক দুর্বলতা, সামজিক বৈষম্য, প্রযুক্তির অপব্যবহার, সামাজিক, সাংস্কৃতিক নৈতিক অবক্ষয় এবং বিচারহীনতার সম্মিলিত বহির্প্রকাশ। সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণা বিশ্লে¬ষণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, শিশু যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে একক কোনো পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। শিশু যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র, আইনব্যবস্থা, গণমাধ্যম, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানসহ সকলকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!