ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড দেশের সর্ববৃহৎ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে লাখ লাখ সাধারণ গ্রাহকের আস্থা ও স্বপ্নের প্রতীক। কিন্তু সম্প্রতি নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ ঘিরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা গ্রাহকদের জীবনে ব্যাপক ভোগান্তি নিয়ে এসেছে। মতিঝিলে গ্রাহকদের বিক্ষোভ, পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাসের ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই সংকট শুধু প্রাতিষ্ঠানিক নয়, বরং লাখ লাখ সাধারণ আমানতকারীর দৈনন্দিন জীবন ও ভবিষ্যৎকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।
গ্রাহক ভোগান্তির চিত্র:
* হাজার হাজার সাধারণ আমানতকারী, যারা শরিয়াহ অনুসারে লাভের আশায় কষ্টার্জিত টাকা জমা রেখেছেন, তারা এখন চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। অনেকে টাকা তুলে নিয়েছেন, যা ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতিকে আরও চাপে ফেলেছে।
* অনেক প্রবাসী গ্রাহক দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন শুধুমাত্র টাকা তুলতে। যেমনÑ আমার খালা ও খালুর জব পারপাসে মালদ্বীপে থাকেন। টাকা তুলতে তিনি ৮ জুন দেশে আসার টিকিট কেটেছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে গিয়েছিলেন, আবার ফিরে যেতে হয়েছে শুধু এই অনিশ্চয়তার কারণে। এভাবে প্রবাসীদের কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।
* বয়স্ক ও অসুস্থ গ্রাহকরা শাখায় গিয়ে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। অনেকে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, কিন্তু টাকা তুলতে বাধ্য হচ্ছেন।
* ছাত্র, চাকরিজীবী ও ছোট ব্যবসায়ীরা তাদের নিয়মিত লেনদেনে সমস্যায় পড়ছেন। টিউশন ফি, বিল পরিশোধ, মেডিকেল খরচ বা ব্যবসায়িক পেমেন্ট করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
* অনেক গ্রাহক মানসিক চাপে ভুগছেন। ‘কখন ব্যাংক আরও খারাপ হয়ে যায়’Ñ এই আশঙ্কায় ঘুমাতে পারছেন না। বিশেষ করে যাদের পুরো সঞ্চয় এই ব্যাংকে আছে, তাদের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি।
* ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা (এমডির ছুটি, বোর্ড পরিবর্তন, কর্মীদের অসন্তোষ) সেবার মানকে অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে। অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত সেবা, চেক ক্লিয়ারেন্স, অনলাইন ব্যাংকিংÑ সবকিছুতেই বিলম্ব দেখা যাচ্ছে।
* রাজপথে প্রতিবাদ করতে গিয়ে গ্রাহকদের কর্মদিবস, ব্যবসা ও পারিবারিক সময় নষ্ট হচ্ছে। অনেকে দিনের পর দিন শাখায় বা বিক্ষোভে সময় দিচ্ছেন, যা তাদের আয়-রোজগারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
* ব্যাংকের সুনাম ক্ষুণœ হওয়ায় নতুন গ্রাহক আসা কমেছে এবং পুরোনো গ্রাহকরা অন্য ব্যাংকে স্থানান্তরের চেষ্টা করছেন, যাতে অতিরিক্ত খরচ ও ঝামেলা বাড়ছে।
এই ভোগান্তির মূল কারণ হলোÑ ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত পরিবেশের অভাব। এস আলম গ্রুপসহ বিভিন্ন অভিযোগ এবং অতীতের ঋণ কেলেঙ্কারির স্মৃতি গ্রাহকদের আস্থা নষ্ট করেছে।
কী করা উচিত?
১. বাংলাদেশ ব্যাংককে অবিলম্বে নতুন চেয়ারম্যানসহ বোর্ডের যোগ্যতা, স্বার্থের সংঘাত ও অতীত রেকর্ড যাচাই করে স্বচ্ছ প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।
২. পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, দক্ষ ও স্বাধীন ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
৩. আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি আরও জোরদার করা উচিত এবং প্রয়োজনে বিশেষ নজরদারি টিম গঠন করা।
৪. গ্রাহক ফোরামের সঙ্গে খোলামেলা সংলাপের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
৫. ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য ও তারল্য পরিস্থিতি নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা উচিত যাতে গ্রাহকরা সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
ইসলামী ব্যাংক শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়Ñ এটি লাখ লাখ মানুষের জীবিকা, সঞ্চয় ও স্বপ্নের সঙ্গে জড়িত। এর স্থিতিশীলতা পুরো অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি: রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে গ্রাহকদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিন। অস্থিরতা দূর করে ইসলামী ব্যাংককে আবার বিশ্বস্ত ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করুন। গ্রাহকরা আর ভোগান্তি চান নাÑ তারা চান নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা।
গৃহিণী, শান্তিনগর, ঢাকা

