ঢাকা সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

গাছ হোক উপহারের সংস্কৃতি, সবুজ হোক ভবিষ্যৎ

সেলিম রানা, গণমাধ্যম কর্মী ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: জুন ২১, ২০২৬, ১১:৫২ পিএম

উপহার দেওয়া ও নেওয়া দুটোর মধ্যেই রয়েছে এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি, ভালোবাসা ও আন্তরিকতার প্রকাশ। ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা কিংবা শুভেচ্ছা প্রকাশের জন্য মানুষ যুগে যুগে নানা ধরনের উপহার দিয়ে এসেছে। কিন্তু সেই উপহার যদি হয় একটি গাছের চারা, তবে তা শুধু একটি বস্তুগত উপহার নয়; এটি হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের জন্য একটি জীবন্ত অঙ্গীকার।

একটি গাছ উপহার দেওয়া মানে উপহার গ্রহণকারীর কার্বন নিরপেক্ষ জীবনযাপনের সহায়ক একটি প্রাকৃতিক সম্পদ তুলে দেওয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাছটি যেমন বড় হতে থাকে, তেমনি বাড়তে থাকে তার পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও নান্দনিক মূল্য। গাছ বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, অক্সিজেন সরবরাহ করে, পরিবেশকে শীতল রাখে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে।

সময়ের প্রবাহে একটি গাছ হয়ে ওঠে মূল্যবান সম্পদ। ফল দেয়, ছায়া দেয়, কাঠ দেয়, অক্সিজেন দেয় এবং মানুষের জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করে। এটি একটি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হলেও এর প্রভাব অসাধারণ ও সুদূরপ্রসারী।

আর যখন একটি গাছের চারা উপহার হিসেবে দেওয়া হয়, তখন এই প্রক্রিয়া আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে। কারণ উপহার হিসেবে দেওয়া সেই চারাটি শুধু বেড়ে ওঠে না, বরং উপহারদাতা ও উপহারগ্রহীতার সম্পর্কের স্মৃতিও ধারণ করে রাখে। বছর পেরিয়ে গাছটি যেমন বড় হয়, তেমনি বড় হয় ভালোবাসা, আন্তরিকতা এবং পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধের বন্ধন। একটি ছোট্ট চারার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একটি সবুজ ভবিষ্যৎ, একটি সুন্দর পরিবেশ এবং আগামী প্রজন্মের জন্য এক মূল্যবান উত্তরাধিকার।

তাই আসুন, প্রচলিত উপহারের পাশাপাশি গাছকে উপহারের সংস্কৃতিতে পরিণত করি। প্রিয় মানুষকে এমন একটি উপহার দিই, যা ভালোবাসার স্মারক হওয়ার পাশাপাশি পৃথিবীকে আরও সবুজ, সুন্দর ও বাসযোগ্য করে তুলবে। আজ একটি গাছ উপহার দিন, আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যান সবুজ ভবিষ্যৎ।

একজন নবজাতককে যদি জন্মের সময় কয়েকটি গাছের চারা উপহার দেওয়া হয় এবং সেই গাছগুলো শিশুর মতোই যতœ ও ভালোবাসায় লালন-পালন করা হয়, তাহলে শিশুর বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে গাছগুলোও ধীরে ধীরে বড় হতে থাকবে। শিশুর শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের প্রতিটি ধাপের সাক্ষী হয়ে থাকবে সেই বৃক্ষগুলো। একসময় এসব গাছ ফুল, ফল, ছায়া ও সম্পদ দিয়ে পরিবার ও সমাজের উপকার করবে। এই জন্ম বৃক্ষ ভবিষ্যতে একটি শিশুর শিক্ষা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও পরিবেশ সচেতনতার অংশীদার হতে পারে।

জন্ম বৃক্ষ শুধু পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ নয়; এটি একই সঙ্গে একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক আন্দোলন। একটি শিশুর জন্মের আনন্দকে যদি একটি গাছের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে প্রতিটি পরিবার হয়ে উঠতে পারে পরিবেশ রক্ষার অংশীদার। প্রতিটি নবজাতকের সঙ্গে একটি বৃক্ষের জন্ম হলে, একদিন সেই বৃক্ষগুলোই পৃথিবীর জন্য হয়ে উঠবে অক্সিজেনের ভান্ডার, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সবুজ উত্তরাধিকার।

আবার অনেকেই ছাদ ব্যবহার করার সুযোগ পান না। তাদের জন্য উপহার হিসেবে দেওয়া যেতে পারে ঘরের ভেতরে রাখার উপযোগী ইনডোর প্লান্ট। শোবার ঘর, খাবারের ঘর, বসার ঘর, বারান্দা কিংবা ঝুলবারান্দায় রাখা যায় এমন গাছ ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং একটি সতেজ পরিবেশ তৈরি করে। পরিচিত মানুষজন যখন সেই ঘরে এসে বসেন, তখন সবুজ গাছের উপস্থিতি ঘরকে আরও প্রাণবন্ত ও মনোরম করে তোলে।

ঘরের ভেতরের গাছ শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধির মাধ্যম নয়, এটি ঘরের পরিবেশকেও আরও আরামদায়ক করে। অনেক ইনডোর গাছ বাতাসের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করে, ঘরে সতেজ অনুভূতি তৈরি করে এবং কিছু ক্ষতিকর দূষক কমাতে ভূমিকা রাখে। সবুজের উপস্থিতি মানুষের মানসিক প্রশান্তি বাড়ায় এবং ঘরের পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

অন্যদিকে, যাদের বাড়ির উঠান, খালি জায়গা বা অনাবাদি জমি রয়েছে, তাদের জন্য দেওয়া যেতে পারে ফলজ, বনজ, ঔষধি ও ফুলের গাছ। এসব গাছ ভবিষ্যতে ফল, ছায়া, কাঠ, ঔষধি গুণ ও সৌন্দর্য সবকিছুই প্রদান করবে। একটি গাছ ধীরে ধীরে পরিবারের সম্পদে পরিণত হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাবে সবুজ উত্তরাধিকার।

আজ বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, ঘন ঘন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন এবং তীব্র তাপপ্রবাহ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বন উজাড় এবং সবুজের ক্রমাগত সংকোচন।

এই বাস্তবতায় যদি আমরা উপহারের সংস্কৃতিকে পরিবেশবান্ধব রূপ দিতে পারি, তাহলে তা হবে সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ। একজন মানুষ যদি বছরে অন্তত কয়েকজন প্রিয়জনকে গাছের চারা উপহার দেন এবং সেই চারাগুলো সঠিকভাবে পরিচর্যা করা হয়, তাহলে তা পরিবেশ সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।

ভাবুন, একজন বাবা তার সন্তানের জন্মদিনে একটি আমগাছ রোপণ করলেন। সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছটিও বড় হলো। কয়েক বছর পর সেই গাছ ফল দিতে শুরু করল। তখন সেই গাছ কেবল একটি বৃক্ষ নয়; এটি হয়ে উঠবে একটি স্মৃতি, একটি আবেগ, একটি পারিবারিক ঐতিহ্য।

বর্তমান সমাজে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় আড়ম্বর দেখা যায়। জন্মদিনে হাজার হাজার টাকা খরচ করে সাজসজ্জা করা হয়, বিবাহ অনুষ্ঠানে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয় এবং বিভিন্ন উৎসবে অসংখ্য সামগ্রী উপহার দেওয়া হয়। কিন্তু এসবের অনেক কিছুই ক্ষণস্থায়ী।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে ‘একটি অনুষ্ঠান, একটি গাছ’ বা ‘একটি জন্মদিন, একটি বৃক্ষ’ ধরনের উদ্যোগ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের উদ্যোগ সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হতে পারে।

গাছের চারা উপহার দেওয়ার বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এটিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কৃতী শিক্ষার্থীদের পুরস্কার হিসেবে গাছের চারা দেওয়া যেতে পারে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সামাজিক অনুষ্ঠানে চারা বিতরণ করতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচির অংশ হিসেবে বৃক্ষ উপহার কার্যক্রম চালু করতে পারে।

এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন। যদি মানুষ দেখতে পায় যে গাছের চারা উপহার দেওয়া একটি সম্মানজনক ও ইতিবাচক সামাজিক প্রবণতা, তাহলে অনেকেই এতে উৎসাহিত হবে।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে বৃক্ষ সবসময়ই জীবন ও কল্যাণের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মেই বৃক্ষরোপণকে মহৎ কাজ হিসেবে দেখা হয়।

ইসলামে বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়ার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। একটি গাছ থেকে যদি মানুষ, পাখি কিংবা অন্য কোনো প্রাণী উপকৃত হয়, তবে তার সওয়াব গাছ রোপণকারীর আমলনামায় যুক্ত হতে থাকে। ফলে গাছ উপহার দেওয়া শুধু পরিবেশবান্ধব কাজ নয়, এটি মানবকল্যাণ ও নৈতিক দায়িত্ববোধেরও বহির্প্রকাশ।

উপহার হিসেবে দেশীয়, দীর্ঘজীবী ও পরিবেশবান্ধব গাছকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কারণ দেশীয় গাছ স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারে, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং দীর্ঘ সময় ধরে মানুষ ও প্রকৃতির উপকার করে।

তবে সব ধরনের গাছ সব জায়গার জন্য উপযুক্ত নয়। তাই গাছ নির্বাচন করার সময় স্থান, মাটির ধরন, জলবায়ু, পরিচর্যার সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ ব্যবহার বিবেচনা করা প্রয়োজন। শহরের ছোট জায়গার জন্য টব বা ছাদ বাগানের উপযোগী গাছ নির্বাচন করা যেতে পারে, আর গ্রামীণ এলাকায় ফলজ, বনজ ও ছায়াবৃক্ষকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

যদি দেশের কোটি কোটি মানুষ বছরে অন্তত একটি করে গাছ উপহার দেন এবং সেগুলো সঠিকভাবে পরিচর্যা করেন, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশে সবুজ বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। এটি পরিবেশ রক্ষা করবে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।

আসুন, আমরা উপহারের প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন এক সবুজ সংস্কৃতি গড়ে তুলি। জন্মদিনে, বিবাহবার্ষিকীতে, সন্তানের জন্মে, সাফল্যের আনন্দে কিংবা যেকোনো শুভক্ষণে প্রিয়জনের হাতে তুলে দিই একটি গাছের চারা। কারণ একটি গাছ শুধু একটি গাছ নয়; এটি আগামী দিনের নির্মল বাতাস, শীতল ছায়া, পাখির আবাস, পরিবেশের ভারসাম্য এবং মানবতার প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধের জীবন্ত প্রতীক।

প্রিয়জনকে গাছের চারা উপহার দিন ভালোবাসার স্মৃতি বাঁচুক, সবুজ হোক বাংলাদেশ, নিরাপদ হোক ভবিষ্যৎ।