হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে রোগীদের দীর্ঘ সারি। কারো হাতে প্রেসক্রিপশন, কারো চোখেমুখে অসুস্থতার ছাপ। সেই ভিড়ের মধ্যে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ৬৫ বছর বয়সি বৃদ্ধ খোশদা বেগম। বয়সের ভার আর অভাবের যন্ত্রণায় নুয়ে পড়া এই মহিলার চোখেমুখে শুধুই অনিশ্চয়তা। কিন্তু সেই ভিড়ের মধ্য থেকেই মানবিকতার একজোড়া সজাগ দৃষ্টি পড়ে বৃদ্ধার ওপর। এই দৃষ্টি ফেলা চিকিৎসক হলেন কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান।
ঘটনাটি গতকাল রোববারের। আউটডোরে রোগীদের সেবা দেওয়ার ফাঁকে ডা. হাবিবুরের চোখে পড়ে লাইনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ওই বৃদ্ধার দিকে। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষমাণ বৃদ্ধার শারীরিক অবস্থা দেখে তিনি আর দেরি করলেন না। তাকে ডেকে নিয়ে এলেন নিজের কার্যালয়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, উপজেলার তরগাঁও ইউনিয়নের দেওনা গ্রামের বাসিন্দা খোশদা বেগমের স্বামী মারা গেছেন অনেক আগেই। অভাবের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর দশা। অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে এলেও টাকার অভাবে চিকিৎসা করানো তার কাছে ছিল বিলাসিতা। বৃদ্ধার সেই করুণ কাহিনি শুনে মুহূর্তেই যেন বদলে গেলেন এই চিকিৎসক।
হাসপাতালের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তা যেন এদিন সব ব্যস্ততা ঝেড়ে ফেলে হয়ে উঠলেন এক মমতাময় চিকিৎসক। বৃদ্ধার যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা তো করালেনই, পাশাপাশি সরকারি স্টকের বাইরের জরুরি ওষুধগুলোও নিজ অর্থায়নে কিনে দিলেন। যাওয়ার সময় বৃদ্ধার হাত ধরে শান্ত গলায় বলে দিলেন, ‘ওষুধ শেষ হলে আবারও আসবেন, আমি আছি।’
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডা. হাবিবুর রহমানের এমন মানবিক রূপ নতুন কিছু নয়। দায়িত্ব পালন করেও তিনি প্রতিদিন নিয়ম করে বসেন আউটডোরে। স্থানীয়রা বলছেন, তার যোগদানের আগে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ আর অব্যবস্থাপনার কারণে এই হাসপাতালের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা প্রায় তলানিতে ঠেকেছিল। কিন্তু এই মানবিক চিকিৎসক যেন সেই হারানো আস্থা আবারও ফিরিয়ে এনেছেন।
একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন সাধারণ মানুষের সঙ্গে এমন আত্মিক বন্ধনে জড়ান, তখন হাসপাতাল কেবল চিকিৎসার কেন্দ্র থাকে না, হয়ে ওঠে ভরসার জায়গা। খোশদা বেগম হয়তো হাসপাতালের প্রেসক্রিপশন নিয়ে বাড়ি ফিরলেন, কিন্তু তার হৃদয়ে গেঁথে রইল এক মানবিক চিকিৎসকের ভালোবাসার গল্প। চিকিৎসাসেবার এমন নজিরই হয়তো আমাদের স্বাস্থ্য খাতকে একদিন মানবিকতার অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।

