উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ও বিভিন্ন আইনি জটিলতার কারণে ব্যাংক খাতের ১ লাখ ৮২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকার ঋণখেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করা যাচ্ছে না। ফলে বিপুল অঙ্কের অনাদায়ী ঋণ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতারা নিয়মিত গ্রাহক হিসেবে বিভিন্ন ব্যাংকিং সুবিধা ভোগ করছেন। এতে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্রও আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট-২০২৫’ এ উঠে এসেছে, বিভিন্ন ব্যাংকের ১ হাজার ৩৭৯ জন ঋণগ্রহীতার দায়ের করা ৮৪৫টি রিট মামলার কারণে এসব ঋণ নিয়মিত হিসেবে দেখানো হচ্ছে। ফলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকরা নতুন ঋণ গ্রহণ, ঋণ পুনঃতপশিল এবং অন্যান্য ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সিআইবিতে (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) নাম অন্তর্ভুক্তি ঠেকাতে ঋণখেলাপিরা এখন নতুন কৌশল অবলম্বন করছেন। ২০১৮ সালের শেষদিকে আপিল বিভাগের নির্দেশনার পর সরাসরি এ ধরনের রিট করার সুযোগ সীমিত হয়ে গেলেও ঋণগ্রহীতারা প্রথমে নি¤œ আদালতে ঘোষণামূলক মামলা করছেন। পরে সেই মামলা খারিজ হলে উচ্চ আদালতে আপিল করে স্থগিতাদেশ নিচ্ছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্থগিতাদেশের মেয়াদ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সিআইবিতে নাম অন্তর্ভুক্তি আটকে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আদালতের এ ধরনের স্থগিতাদেশের সুযোগ নিয়ে অন্তত ৪৫ জন ঋণখেলাপি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ১১ জন নির্বাচিতও হন। তবে দুটি আসনের ক্ষেত্রে ঋণসংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ করেনি। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য। সংশোধিত আইনে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচিত হওয়ার পরও কেউ ঋণখেলাপি বা হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন বলে প্রমাণিত হলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করা যেতে পারে। ফলে আদালতের স্থগিতাদেশ উঠে গেলে বা ঋণ পুনরায় খেলাপি হলে সংশ্লিষ্টদের জন্য আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে আদালতের স্থগিতাদেশে আটকে থাকা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ২৬ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ হাজার ৫৩২ কোটি টাকায়। ২০২৪ সালে এ অঙ্ক ১ লাখ ১ হাজার ৪২৯ কোটি টাকায় পৌঁছায়। আর ২০২৫ সালে তা আরও ৭৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৮২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আদালতের স্থগিতাদেশ নেওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ও ব্যাবসায়িক নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো খেলাপির তালিকা এড়াতে এ পথ বেছে নিয়েছে। নতুন করে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও খেলাপিমুক্ত অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় অনেকেই আদালতের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইন ও নীতিমালা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তার কার্যকর প্রয়োগ হচ্ছে না। ফলে অনেক ঋণগ্রহীতা বছরের পর বছর ঋণ পরিশোধ না করেও আদালতের স্থগিতাদেশের মাধ্যমে নিয়মিত গ্রাহকের সুবিধা ভোগ করছেন। একই সঙ্গে অর্থঋণ আদালতে মামলা করেও অনেক ক্ষেত্রে ঋণ আদায়ে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি হচ্ছে না। খেলাপি ঋণসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ২০২৪ সালে ব্যাংকগুলোর আইন বিভাগ শক্তিশালী করার নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দেশনায় ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে চিফ লিগ্যাল অফিসার নিয়োগ এবং দক্ষ আইনজীবী ও প্রয়োজনীয় জনবল বাড়ানোর কথা বলা হয়। বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ও অনাদায়ী অর্থের পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে লিগ্যাল টিম গঠনের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে ঋণ আদায় প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ব্যাংকগুলোর তারল্যের ওপর চাপ বাড়ছে। বিপুল অংকের অর্থ আটকে থাকায় নিয়মিত সুদ আদায় সম্ভব হচ্ছে না, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মুনাফায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেশের ব্যাংক খাত সম্মিলিতভাবে লোকসানে পড়েছে। ২০২৪ সালে ব্যাংক খাতের সম্মিলিত নিট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর সঙ্গে আদালতের স্থগিতাদেশে আটকে থাকা ১ লাখ ৮২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা যোগ করলে মোট ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭ লাখ ৭১ হাজার ১২৩ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, খেলাপি ঋণসংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী আইনজীবী নিয়োগ এবং নিয়মিত তদারকি জোরদারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। শুধু মামলা দায়ের করে বসে থাকলে হবে না, দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। অন্যথায় মামলার দীর্ঘসূত্রতায় ব্যাংকগুলোর ব্যয় আরও বাড়বে।

