ঢাকা সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

৯২ ভাগ ইসরায়েলির মতে ইরান বিজয়ী

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চূড়ান্ত আলোচনা শুরু

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ২২, ২০২৬, ০২:৩৪ এএম

ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ এবং পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির ফলাফল নিয়ে ইসরায়েলিদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা দেখা দিয়েছে। নতুন এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসরায়েলি মনে করেন, সংঘাত থেকে ইসরায়েলের চেয়ে ইরানই বেশি লাভবান হয়েছে। আলজাজিরা ও দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

জেরুজালেমের হিব্রু বিশ^বিদ্যালয় এবং আগাম ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৯২ দশমিক ১ শতাংশ বলেছেন, যুদ্ধে ইরানই বিজয়ী হয়েছে বা সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে। একই সঙ্গে ৮২ দশমিক ৯ শতাংশের মতে, এই সংঘাত ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাকে দুর্বল করেছে। জরিপে আরও দেখা গেছে, ডানপন্থি রাজনৈতিক জোটের সমর্থকদের মধ্যেও একই ধরনের মনোভাব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই ভোটারদের ৯৩ দশমিক ১ শতাংশ মনে করেন, ইরানই এই সংঘাত থেকে বেশি লাভবান হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির প্রতিও বিরূপ মনোভাব দেখা গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ ব্যক্তি চুক্তির বিরোধিতা করেছেন, যেখানে মাত্র ১২ দশমিক ১ শতাংশ এর পক্ষে মত দিয়েছেন।

ইসরায়েলের যুদ্ধ পরিচালনা এবং এর ফলাফল সম্পর্কেও নেতিবাচক মূল্যায়ন উঠে এসেছে। জরিপে ৮৬ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা যুদ্ধের ফলাফলকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন। এ ছাড়া, ৮৭ দশমিক ৮ শতাংশের মতে, ইসরায়েল যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে অথবা আংশিকভাবে সফল হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর দাবির প্রতিও জনগণের আস্থা কম। জরিপে ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, ইসরায়েল বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে এবং অস্তিত্বগত হুমকি দূর করেছেÑ নেতানিয়াহুর এমন বক্তব্য তারা বিশ^াস করেন না।

নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে পরিচালিত সামরিক অভিযানের মূল্যায়নে ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তার যুদ্ধ পরিচালনা দুর্বল ছিল বা ব্যর্থ হয়েছে। তবে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতি নিয়ে কঠোর অবস্থানের সমর্থন এখনো উল্লেখযোগ্য। জরিপে ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে উত্তেজনার ঝুঁকি থাকলেও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করা উচিত।

১৭ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত পরিচালিত এই জরিপে ১৭ বছর বা তার বেশি বয়সি তিন হাজার ৬৪৪ জন ইসরায়েলি অংশ নেন। গবেষকরা জানান, জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে নমুনা নির্বাচন করা হয়েছিল এবং ৯৯ শতাংশ নির্ভরযোগ্যতার ক্ষেত্রে জরিপটির সম্ভাব্য ত্রুটির হার ২ দশমিক ২ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চূড়ান্ত আলোচনা শুরু : মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস ধরে চলমান সংঘাতের স্থায়ী অবসান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতাকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডে উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে। কাতার ও পাকিস্তানের যৌথ মধ্যস্থতায় আয়োজিত এই বৈঠককে সম্প্রতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আশা, আলোচনার মাধ্যমে একটি বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তির ভিত্তি তৈরি হবে। সুইজারল্যান্ডের লুসার্ন অঞ্চলের বুর্গেনস্টক অবকাশকেন্দ্রে এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো, সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের বিভিন্ন শর্ত বাস্তবায়নের রূপরেখা চূড়ান্ত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা কমিয়ে আনা।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সমঝোতা স্মারকে অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোকে পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে রূপ দিতে বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি দল গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও তদারকির জন্য পৃথক অনুসরণকারী দলও কাজ শুরু করেছে। কাতারের মতে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ইতিবাচক রাজনৈতিক সদিচ্ছাই এই আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়ার প্রধান ভিত্তি।

হরমুজ প্রণালি ও লেবানন পরিস্থিতি প্রধান চ্যালেঞ্জ : শান্তি আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল দুটি বিষয় হলো হরমুজ প্রণালি এবং লেবানন পরিস্থিতি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও গত শনিবার ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর দাবি, আন্তর্জাতিক এই নৌপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বিশ্ববাজারে সরবরাহ অব্যাহত আছে।

ইরানের অভিযোগ, লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা যুদ্ধবিরতির চেতনার পরিপন্থি এবং যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া আশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের মতে, যুদ্ধবিরতি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখতে তারা প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ওয়াশিংটনের মতে, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য এই নৌপথ খোলা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মুখোমুখি দুই দেশের শীর্ষ প্রতিনিধিরা : যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে রয়েছেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার। বিপরীতে ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে রয়েছেন পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। প্রতিনিধি দলে আরও রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, নিরাপত্তা ও জ্বালানি খাতের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা।

মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং কাতারের প্রতিনিধিরাও আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন।

সুইজারল্যান্ডে পৌঁছানোর পর ভ্যান্স বলেন, যুদ্ধবিরতি টিকে থাকবে বলে তিনি আশাবাদী। তার মতে, পারমাণবিক ইস্যু এবং লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে বাস্তব অগ্রগতির সুযোগ রয়েছে। তিনি আরও জানান, আলোচনা কয়েক দিন পর্যন্ত চলতে পারে।

পারমাণবিক ইস্যুতেই নজর : আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করে। অন্যদিকে তেহরান বারবার বলে এসেছে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আবারও স্পষ্ট করেছেন যে, পারমাণবিক বোমা তৈরির কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। তিনি বলেছেন, প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে লিখিত প্রতিশ্রুতিও দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে এটাও বলেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার থেকে ইরান কখনোই সরে আসবে না। তার ভাষায়, এটি দেশের বৈধ অধিকার এবং শেষ পর্যন্ত অন্য পক্ষকে সেটি মেনে নিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের আলোচনাগুলোও মূলত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রশ্নে অচলাবস্থার মুখে পড়েছিল। ফলে এবারও এই বিষয়টি আলোচনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

জব্দ অর্থ ফেরত পাওয়ার দাবি : ইরানের প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া প্রাথমিক সমঝোতার অংশ হিসেবে কাতারে আটকে থাকা ৬০০ কোটি ডলার সমপরিমাণ ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা হবে।

পেজেশকিয়ানের দাবি, সমঝোতার অধিকাংশ শর্তই ইরানের অনুকূলে রয়েছে এবং আলোচনার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এর সুফল স্পষ্ট হবে। তিনি বলেন, অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

লেবাননে যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা : শান্তি আলোচনার আগে লেবানন পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে নতুন হামলার ঘটনা ঘটে। লেবাননের জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হামলায় বহু মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েল বলেছে, তারা হিজবুল্লাহর হামলার জবাব দিয়েছে। হিজবুল্লাহও পাল্টা অভিযোগ করেছে যে, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়ে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছে।

ইসরায়েল এরই মধ্যে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সঙ্গে তারা সরাসরি সম্পৃক্ত নয় এবং লেবাননে নিজেদের নিরাপত্তা অবস্থান বজায় রাখবে। তবে তারা যুদ্ধবিরতি সম্মান করার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত : বিশ্লেষকদের মতে, সুইজারল্যান্ডের এই বৈঠক কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি দুই পক্ষ পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালি, লেবানন পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ে গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে, তাহলে কয়েক মাসের সংঘাত ও অস্থিরতার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হতে পারে।

তবে হরমুজ প্রণালি নিয়ে মতবিরোধ, লেবাননে চলমান উত্তেজনা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি-সংক্রান্ত পুরোনো অবিশ্বাস এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে। ফলে বুর্গেনস্টকের আলোচনায় কী ধরনের অগ্রগতি হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা কতটা বাস্তব রূপ পায়।