কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে গুমের ঘটনায় করা মামলার জবানবন্দিতে বেশকিছু তথ্য দিয়েছেন সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস। গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তিনি জবানবন্দি দেন। সাক্ষ্য হিসেবে জবাববন্দিতে র্যাবে কর্মরত থাকা অবস্থায় জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে বিভিন্ন হত্যাকা-ের বর্ণনা তুলে ধরেন এ সেনা সদস্য।
জবানবন্দিতে সেনা সদস্য ইমরুল কায়েস বলেন, ২০০১ সালের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে আর্মড কোরে যোগদান করেন তিনি। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত র্যাব হেড কোয়ার্টারে তিনি প্রেষণে কর্মরত ছিলেন। র্যাব ইন্টেলিজেন্সের পরিচালকের (জিয়াউল আহসান) ‘রানার’ হিসেবে তিনি নিয়োগ পান। রানার হিসেবে তিনি জিয়াউল আহসানের সঙ্গে থাকতেন। ২০১২ সালের সম্ভবত ১৩ এপ্রিল হেডকোয়ার্টার থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে জিয়া স্যার (তৎকালীন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক), মেজর নওশাদ স্যার, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ স্যারসহ আমরা মহাখালী ফ্লাইওভারের নিকট যাই। কাকে গাড়িতে পিক করবে, তা আমি জানতাম না। জিয়া স্যার গাড়িতে বসে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করছিলেন। টার্গেট কখন আসবে, তা জানার জন্য ফোন করছিলেন। একটা পর্যায়ে জানা যায়, টার্গেট আসবে না। পরে সেখান থেকে জিয়া স্যারকে বাসায় নামিয়ে দিই এবং স্যারকে বলে পরের দিন সকালে আমি ৯ দিনের ছুটিতে যাই।’
জবানবন্দিতে ইমরুল কায়েস বলেন, ‘ছুটিতে থাকা অবস্থায় মিডিয়ার মাধ্যমে আমি জানতে পারি যে, ইলিয়াস আলী নামের একজন বিএনপি নেতাকে মহাখালী ওভারব্রিজের ওখান থেকে অপহরণ করা হয়েছে। ৯ দিন ছুটি শেষে এপ্রিল মাসের ২৩ তারিখে আমি কর্মস্থলে যোগদান করি। যোগদানের পর আমি র্যাব হেডকোয়ার্টারে থমথমে পরিবেশ লক্ষ করি। অন্য সদস্যদের মাধ্যমে জানতে পারি, কোতের অস্ত্রের ইন-আউট রেজিস্টার এবং সিসিটিভি ফুটেজ জিয়া স্যার নষ্ট করে ফেলেন।’ জিয়াউল আহসান এক দিন ফোনে কথা বলছিলেন উল্লেখ করে জবানবন্দিতে ইমরুল কায়েস বলেন, ‘ওই সময় স্যারের ফোনে অন্য একটি কল এলে স্যার বলেন, ‘তুই রাখ, তারেক স্যার (সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক) ফোন দিয়েছেন।’ জিয়া স্যার তারেক স্যারের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। অপর প্রান্তে কী বলেছে, আমি জানি না। তবে জিয়া স্যার অভিযোগের সুরে বলছিলেন, ‘স্যার, আপনাদের কথামতো ইলিয়াসকে গলফ করলাম, এখন আপনারা এমন করলে হবে! এর চেয়ে আমি কমান্ডো মানুষ, আমাকে জঙ্গলে পোস্টিং দিয়ে পাঠায়ে দেন, এটাই আমার ভালো।’
লাশের পাশে ছাগল জবাই দিয়ে খেয়েছিলেন জিয়াউলসহ বড় অফিসাররা : সাক্ষিতে জিয়াউল আহসনের দেহরক্ষী সেনা সদস্য ইমরুল বলেন, প্রথমে গুলির শব্দ। জঙ্গলে ঢুকতেই চোখে পড়ে দু-তিনজনের গুলিবিদ্ধ লাশ। কিছুক্ষণ পরই মেলে একটি ছাগল। আর এ ছাগলটিই লাশের পাশে জবাই দিয়ে দুপুরের খাবার সারেন কর্মকর্তারা। দিনভর চলা জবানবন্দিতে জিয়াউল আহসানের বিভিন্ন কুকীর্তির কথা সামনে আনেন ইমরুল কায়েস। তুলে ধরা হয় গুম-খুনের বীভৎস বর্ণনাও।
বিভিন্ন হত্যাকা-ের ঘটনায় যা বললেন সাক্ষী : সাক্ষীতে ইমরুল কায়েস বলেন, জিয়াউল স্যারের রানার থাকা অবস্থায় আমার কাজ ছিল সবসময় সঙ্গে থাকা। স্যার যেখানে প্রয়োজন মনে করতেন সেখানে নিয়ে যেতেন। স্যারের সঙ্গে আমি জাফলং বর্ডার, ডিজিএফআই হেডকোয়ার্টার, আর্মি হেডকোয়ার্টার, ডিবির প্রধান কার্যালয়ে (তখন ডিবির প্রধান ছিলেন মনির স্যার) যেতাম। মাঝে মাঝে সচিবালয়ে যাওয়া হতো। এ ছাড়া শেখ হাসিনার নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকীর বাসায় যেতেন স্যার। তার সঙ্গে জিয়া স্যারের ভালো সম্পর্ক ছিল। তারিক সিদ্দিকীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও তার সখ্য গড়ে ওঠে। এ পরিপ্রেক্ষিতে জিয়া স্যার যখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যেতেন, তখন গাড়িতে অস্ত্র-অ্যামোনিশন থাকত। কিন্তু তল্লাশি করা হতো না।
রানার হিসেবে যোগদানের ২০-২৫ দিন পর এক দিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে আমাকে ফোন দিয়ে জিয়া স্যার বলেন, কই তুই? আমি ক্যাম্পে রয়েছি জানালে দ্রুত র্যাব-১ এর সামনে যেতে বলেন তিনি। সেখানে যাওয়ার পর দুটি কালো রঙের মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। স্যার আমাকে একটি মাইক্রোবাসে উঠতে বলেন। গাড়িতে ওঠার পর স্যার আমাকে বলেন, পেছনে একটি বস্তা আছে, তা ফেলে দিতে হবে। ওই গাড়িতে জিয়াউল ছাড়াও র্যাব-১ এর সিইও রাশেদ ও ক্যাপ্টেন কাউসার ছিলেন। আরও দুজনকে চিনতে পারিনি। রাত পৌনে ১টার দিকে র্যাব-১ থেকে বের হয়ে জসিম উদ্দিন হয়ে টঙ্গীর দিকে আহসান উল্লাহ ওভার ব্রিজের ওপর দিয়ে ডান দিকে মোড় নিয়ে আমরা বেশকিছু দূর যাই। যাওয়ার পর একটি রেল ক্রসিংয়ে আমাদের গাড়ি দুটি থামে। তখন জিয়া স্যার আমাকে বলেন, ইমরুল ডিক্কিটা খুলে বস্তাটা বের কর। আমি ডিক্কি খুলে বস্তা নামানোর উদ্দেশে হাত দিতেই দেখি একটি মরদেহ। লাশটি ঠান্ডা ছিল। এতে আমি ভয় পেয়ে যাই। পরে আমার সঙ্গে থাকা অন্যদের সহায়তায় মরদেহটি রেললাইনের পাশে নিয়ে রাখা হয়। সেখানে দাঁড়ানো ছিলেন জিয়াউল স্যার। এরপর মরদেহটি রেললাইনের ওপর রেখে মাইক্রোবাসে ফিরে আসেন জিয়া স্যারসহ অন্যরা। কিছুক্ষণ পর একটি ট্রেন এসে চলে যায়।
ক্যাম্পে ফিরে আসার পর পাঁচ-সাত দিন অস্বাভাবিক ছিলেন বলে দাবি করেন ইমরুল কায়েস। তিনি জানান, এ ঘটনার পর তার কাছে খুব খারাপ লেগেছিল। কোথায় এলেন, কীভাবে চাকরি করবেন। এসব ভেবে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে পারেননি তিনি। আর এ ঘটনার কিছুদিন পরই তাকে জিয়াউল আহসানের সঙ্গে সুন্দরবন অপারেশনে কয়েকবার যেতে হয়েছিল।
বিডিআর হত্যাকা-ের পর ১০ সদস্যকে হত্যা : বিডিআর হত্যাকা- প্রসঙ্গ টেনে সেনাসদস্য ইমরুল বলেন, বিডিআর হত্যাকা-ের পর সারা দেশে অপারেশন রেবেল হান্ট চালানো হয়। শুধু পলাতক বিডিআর সদস্যদের ধরার জন্যই এ অপারেশন সাজানো হয়। ওই সময় আট-দশজন লোককে হত্যা করেন জিয়াউল আহসান স্যার। যাদের হত্যা করেছেন, তারা বিডিআর সদস্য ছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি। এসব লোককে দুভাবে হত্যা করা হয়েছে। একটি ছিল ইনজেকশন পুশ করে। আরেকটি ছিল পোস্তগোলা ব্রিজের কাছে থাকা আর্মি ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে বোটে করে নদীতে নেওয়া হতো। এরপর বোটের পাটাতনে একটি সিমেন্টবোঝাই বস্তা রেখে হত্যার শিকার ব্যক্তিকে শোয়ানো হতো। তার ওপর আরেকটি সিমেন্টের বস্তা রেখে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলা হতো। পরে মাথায় গুলি চালিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করতে নদীতে ফেলে দিতেন জিয়াউল স্যার।
১১ জনকে হত্যা : জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়, ২০১২ সালের প্রথম দিকে জিয়াউলের নেতৃত্বে তিনটি মাইক্রোতে করে টিএফআই সেল থেকে ১১ জনকে নিয়ে পোস্তগোলা সেনা ক্যাম্পে যাই আমরা। সেখানে তাদের বোটে ওঠানো হয়। বোটটি সুন্দরবন অপারেশনে জলদস্যুরা ব্যবহার করেছিলেন। তখন হঠাৎ একজন আসামি পানিতে ঝাঁপ দেন। জিয়া স্যার আমাকে বলেন, ইমরুল ধর ধর। স্যারের আদেশে আমি পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আসামিকে ধরে ফেলি। পরে রশির সাহায্যে আমাদের বোটে ওঠানো হয়। ও সময় অন্ধকার ছিল।

