ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই, ২০২৬

চিকিৎসাসেবায় অবকাঠামো নয়, আস্থা অর্জনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ৪, ২০২৬, ০৬:২৮ এএম

দেশের চিকিৎসাসেবায় অবকাঠামোগত অগ্রগতি যতই দৃশ্যমান হোক, বাস্তবতা হলো, মানুষের আস্থা এখনো ফিরে আসেনি। হাসপাতাল বেড়েছে, আধুনিক যন্ত্রপাতি যুক্ত হয়েছে, নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমনকি বিশ^মানের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালও গড়ে উঠেছে। কিন্তু চিকিৎসা নিতে দেশের মানুষ এখনো প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ছুটছেন। এই প্রবণতা শুধু স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি অনাস্থারই বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি দেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার জন্যও উদ্বেগজনক সংকেত।

তথ্য অনুসারে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশজুড়ে বিশ^মানের হাসপাতাল অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালসহ ২০টি মেডিকেল কলেজ। চিকিৎসায় যান্ত্রিক ও বাহ্যিক এই আধুনিকায়নের পরও দেশের মানুষের বিদেশমুখী চিকিৎসার স্রোত থামানো যায়নি; বরং তা দিন দিন আরও বেগবান হয়েছে।

প্রতি বছর প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। এর ফলে চিকিৎসা ব্যয় বাবদ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়। অর্থাৎ, চিকিৎসা খাতে দেশের বিপুল সম্পদ বিদেশে স্থানান্তর হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এত অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বিপুল বিনিয়োগের পরও কেন মানুষ দেশের হাসপাতালের পরিবর্তে বিদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর বেশি আস্থা রাখছেন?

এর উত্তর খুঁজতে গেলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, ভুল রোগ নির্ণয়, চিকিৎসাগত ত্রুটি এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অসামঞ্জস্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। দ্বিতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারিÑ উভয় খাতেই চিকিৎসাসেবার ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। তৃতীয়ত, চিকিৎসক ও হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মীর অমানবিক আচরণ রোগী ও স্বজনদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করছে। একজন রোগীর কাছে শুধু ওষুধ বা অস্ত্রোপচারই গুরুত্বপূর্ণ নয়; আন্তরিকতা, সময় দেওয়া এবং সম্মানজনক ব্যবহারও চিকিৎসার অপরিহার্য অংশ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই জায়গাতেই বড় ঘাটতির অভিযোগ সবচেয়ে বেশি।

গত প্রায় দুই বছর ভারতীয় ভিসা সীমিত থাকায় অনেকে বিকল্প দেশ কিংবা দেশের ভেতরে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু সম্প্রতি ভারতীয় ভিসা পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার পর আবারও ভিসা কেন্দ্রে চিকিৎসাপ্রত্যাশীদের দীর্ঘ সারি প্রমাণ করেছে, মানুষের আস্থার সংকট এখনো কাটেনি। ক্যানসারসহ জটিল রোগের চিকিৎসায় দীর্ঘ অপেক্ষা, প্রয়োজনীয় সেবা পেতে হয়রানি এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে অনেক পরিবার জমিজমা বিক্রি করে হলেও বিদেশে চিকিৎসা করাতে বাধ্য হচ্ছে। এটি কোনো রাষ্ট্রের জন্য স্বস্তিদায়ক চিত্র হতে পারে না।

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের চিকিৎসকদের দক্ষতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন নেই। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের চিকিৎসকেরা আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান ও দক্ষতা রাখেন। সংকটটি মূলত সেবার মান, ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি এবং রোগীবান্ধব পরিবেশ নিয়ে। তাই শুধু নতুন হাসপাতাল নির্মাণ কিংবা আরও চিকিৎসক-নার্স নিয়োগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন চিকিৎসাসেবার গুণগত পরিবর্তন, কার্যকর তদারকি এবং রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা।

বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চিকিৎসা খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে আরও এক লাখ ডাক্তার-নার্স নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও বলছে, বিশৃঙ্খলা দূর করতে সময় লাগবে এবং বড় পরিসরে জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। তবে প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি দৃশ্যমান পরিবর্তনই মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনবে। একই সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও সেবার মান, ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং মানবিক আচরণের বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

দেশের স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন নতুন ভবন নির্মাণ নয়, বরং মানুষের বিশ্বাস পুনর্গঠন। যে দিন একজন রোগী নিশ্চিত হবেন তিনি দেশে বিশ্বস্ত, নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা পাবেন, সেদিনই বিদেশমুখিতা কমবে। তখন শুধু দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে না, স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি নাগরিকের আস্থাও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবার প্রকৃত উন্নয়নের মাপকাঠি হবে সেই আস্থার পুনরুদ্ধার।