ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশে অসুস্থ ফুটবল উন্মাদনা বন্ধ হোক

মোছা. মায়া আক্তার, শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: জুলাই ৯, ২০২৬, ০৭:২৩ এএম

বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের এক মহামিলন। চার বছর পরপর আয়োজিত এই আসর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলে। তবে বিশ্বকাপকে ঘিরে বাংলাদেশের মানুষের উন্মাদনা এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য বহন করে। যে দেশে জাতীয় দল এখনো বিশ্বকাপের মঞ্চে জায়গা করে নিতে পারেনি, সেই দেশেই বিশ্বকাপ এলেই দেখা যায় এক বিস্ময়কর আবেগ, উৎসবমুখর পরিবেশ এবং ফুটবলের প্রতি গভীর ভালোবাসার অনন্য প্রকাশ। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগ থেকেই বাংলাদেশের শহর, মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, গাছ কিংবা রাস্তার মোড়ে উড়তে থাকে বিভিন্ন দেশের পতাকা। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্স কিংবা পর্তুগালের সমর্থকদের মধ্যে দেখা যায় ব্যাপক উৎসাহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে তর্ক-বিতর্ক, হাস্যরস এবং প্রিয় দলের জয়-পরাজয় নিয়ে আবেগঘন আলোচনা।

কিন্তু বিগত কয়েকটি বিশ্বকাপকে ঘিরে বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তদের মাঝে বেড়ে চলেছে অসুস্থ উন্মাদনা জেনজিদের ভাষায় যাকে ট্রলিং বা বুলিং বলা হয়ে থাকে। এই অফলাইন ও অনলাইনে সরাসরি ও পরোক্ষ ট্রলিং-এখন মৃত্যুর ও আত্মহত্যার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা বাংলাদেশের বিশ্বকাপ উন্মাদনার একটি নেতিবাচক দিককে তুলে ধরে।  ট্রল বা বুলিংয়ের বিষয়বস্তুর বেশিরভাগ থাকে সমর্থকদের মধ্যে দলীয় বিভক্তি অতিরিক্ত প্রতিযোগিতামূলক রূপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক সীমা ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ, দলের ফলাফল নিয়ে একে অপরকে তিরস্কার করা, কিছু ক্ষেত্রে পতাকা টানানো বা সমর্থন প্রকাশকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে ২০২২ বিশ্বকাপ চলাকালে বাংলাদেশে বিশ্বকাপ-সম্পর্কিত বিভিন্ন ঘটনায় ২৩ জনের মৃত্যু এবং ৪৫ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ১০ ডিসেম্বর ২০২২ সালে হবিগঞ্জের বাহুবলে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের সংঘর্ষে শাহ মো. আব্দুস শহীদ নামে এক ব্যক্তির নিহত হয়। এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপেও। কুমিল্লা নগরীতে বিশ্বকাপ ফুটবলে ব্রাজিলের জয়ে আতশবাজি ফাটিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে একদল যুবক। এ সময় বাধা দেওয়ায় মো. শরীফ নামে এক পুলিশ সদস্যকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। বুধবার (২৯ জুন) রাত ১টার দিকে নগরীর থিরাপুরকুর পাড়ে এ ঘটনা ঘটে। আবার ৫ তারিখ রোববার দিবাগত রাতে বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রিয় দল ব্রাজিলের পরাজয় এবং তা নিয়ে সমর্থকদের কটাক্ষ সহ্য করতে না পেরে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় রতন (২০) নামের এক তরুণ আত্মহত্যা করেছেন। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে কয়া ইউনিয়নের ঘোড়াইঘাট গ্রামে। ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

কুমিল্লা কোটবাড়ি বিশ্বরোডের মঠপুস্কুরনী এলাকায় ৮ জুলাই দিবাগত রাতে ফুটবল বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনা বনাম মিশরের খেলাকে কেন্দ্র করে এক যুবক নিহত হয়।

জানা যায় ম্যাচ চলাকালীন উনি আর্জেন্টিনাকে ট্রল করে। ম্যাচের পরে আর্জেন্টিনার সমর্থকরা রেগে গিয়ে ওরে লাথি মারতে থাকে এলোপাতাড়ি। পরে নাক দিয়ে রক্ত বের হয়ে স্ট্রোক করে মারা যায়। এভাবই এসব অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার প্রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পতাকা টাঙাতে গিয়ে দুর্ঘটনা, সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও হত্যাকা-, খেলার উত্তেজনায় হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া, উদযাপনকালে দুর্ঘটনা বিশেষ করে ট্রলিং বুলিং। যা বাংলাদেশের ফুটবল-সমর্থন সংস্কৃতির নেতিবাচক দিক নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা সৃষ্টি করেছিল এবং এটি একই সঙ্গে বাংলাদেশের ফুটবল উদযাপনকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

তা ছাড়াও এ বিশ্বকাপ ঘিরে তৈরি হয় অনলাইন ও অফলাইন জুয়ার  আসর, মাদক সেবনের প্রবণতা ও অন্যান্য আরও অপরাধমূলক কাজ। অথচ  ফুটবলের মূল শিক্ষা হলোÑ সৌহার্দ্য, সহনশীলতা এবং ভ্রাতৃত্ববোধ। বিশ্বকাপের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন ভিন্ন মত ও পছন্দকে সম্মান জানিয়ে সবাই একসঙ্গে উৎসব উপভোগ করতে পারে এবং সবাই সচেতন থেকে খেলার আনন্দময় পরিবেশ বজায় রাখতে উদ্যোগী হয় যেন এমন দুর্ঘটনা এবং আর কোনো অকাল মৃত্যু না ঘটতে পারে। বিশ্বকাপ বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করে। যখন দেশের লাখো তরুণ গভীর আগ্রহ নিয়ে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের খেলা অনুসরণ করে, তখন প্রশ্ন জাগেÑ বাংলাদেশ কবে বিশ্বমানের ফুটবল শক্তিতে পরিণত হবে? দেশের ফুটবল অবকাঠামো উন্নয়ন, তৃণমূল পর্যায়ে প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব। বিশ্বকাপের প্রতি মানুষের এই বিপুল আগ্রহকে যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে তা দেশের ফুটবল উন্নয়নের জন্য বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায়, আলো নিভে যায়, স্টেডিয়ামগুলো আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে ফুটবলের যে আবেগ জাগিয়ে তোলে, তা থেকে যায় দীর্ঘদিন। এই আবেগ কখনো আনন্দের, কখনো হতাশার, আবার কখনো আশার। বিশ্বকাপ তাই বাংলাদেশের মানুষের কাছে শুধু একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর নয়; এটি আবেগ, স্বপ্ন, বন্ধুত্ব এবং বৈশ্বিক সংযোগের এক অনন্য অধ্যায়।

ফুটবল বিশ্বকাপের প্রতিটি আসর আমাদের মনে করিয়ে দেয়। খেলার ভাষা ভিন্ন হতে পারে, পতাকার রং ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু আনন্দ, উচ্ছ্বাস এবং মানবিক সংযোগের অনুভূতি সর্বজনীন। আমরা একে অপরের প্রতি সহনশীল হলে এই অনুভূতি আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।