ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

সম্পাদকীয়

চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে আপসহীন হোক সরকার

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ০৬:৫১ এএম

চট্টগ্রামে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্য দিবালোকে সশস্ত্র হামলা, ভাঙচুর ও কোটি টাকার চাঁদা দাবির ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর সন্ত্রাসী আক্রমণ নয়,  এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং নাগরিক নিরাপত্তার প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। হামলার আগে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং পরবর্তী সময়ে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। দাবি প্রত্যাখ্যানের পরই হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় এটি স্পষ্ট করে, সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজ চক্র এখনো ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে সক্রিয় রয়েছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, কথিত চাঁদাবাজের কণ্ঠে এমন আত্মবিশ্বাস, যেন রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের চেয়ে তার অপরাধী নেটওয়ার্কই বেশি শক্তিশালী। ভাইরাল হওয়া কলরেকর্ডে ব্যবসা চালাতে হলে নিয়মিত চাঁদা দিতে হবে, না হলে ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না, এমন প্রকাশ্য হুমকি শুধু একজন ব্যবসায়ীর প্রতি নয়, গোটা ব্যবসায়ী সমাজের জন্য আতঙ্কের বার্তা।

চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই সংঘবদ্ধ সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকারী গোষ্ঠীর কর্মকা-ে আলোচিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছে, অনেকেই বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে, আবার অনেকে দেশ ছেড়ে বিদেশে পালিয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিদেশে অবস্থান করেও প্রযুক্তির মাধ্যমে তারা যদি দেশে বসে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাহলে এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি আন্তঃসীমান্ত সংঘবদ্ধ অপরাধেরও ইঙ্গিত। ফলে এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় শুধু স্থানীয় থানার তদন্ত যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন গোয়েন্দা নজরদারি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সাইবার সক্ষমতার সমন্বিত ব্যবহার।

ব্যবসায়ী সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। একজন উদ্যোক্তা যদি বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের কাছে জিম্মি হন, তবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে নতুন উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হবেন, বিদ্যমান ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন এবং অপরাধী চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।

আমরা মনে করি, সরকারের এখন কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এ ঘটনার নিরপেক্ষ, দ্রুত ও পেশাদার তদন্ত নিশ্চিত করে জড়িতদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে। সেই সঙ্গে, বিদেশে অবস্থান করে যারা দেশে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, তাদের শনাক্ত করে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।

পাশাপাশি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানার জন্য একটি কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ও দ্রুত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু মাঠপর্যায়ের সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার করলেই হবে না, অপরাধচক্রের অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক ভিত্তিও ভেঙে দিতে হবে।

কেননা, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের অর্থের উৎস, সহযোগী নেটওয়ার্ক ও স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে না পারলে এই চক্র থামবে না।

একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদেরও ভয়ভীতি উপেক্ষা করে আইনের প্রতি আস্থা রেখে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে উৎসাহিত করতে হবে। অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে অনেক ঘটনাই সামনে আসবে না, আর অপরাধীরা সেই সুযোগেই আরও শক্তিশালী হবে।

চাঁদাবাজি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এটি অর্থনীতির শত্রু, বিনিয়োগের প্রতিবন্ধক এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের প্রতি প্রকাশ্য অবমাননা। চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক এ ঘটনা সরকারের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখন প্রয়োজন কেবল আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ। অপরাধীদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে, বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ কোনো সন্ত্রাসী চক্রের হাতে জিম্মি নয়।