ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

যখন নকল হয়ে ওঠে অধিকার

কাজী আহমেদ শামীম, লেখক বিশ্লেষক
প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ০৬:৫৩ এএম

গত ১১ জুলাই ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ফাতেমা-মতিন মহিলা কলেজ কেন্দ্রে এইচএসসি পরীক্ষা শেষে যা ঘটল, তা কেবল একটি মফস্বল শহরের পরীক্ষা কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ‘কমন না পড়া’ এবং ‘নকল করতে না দেওয়ার’ জেরে পরীক্ষার্থীদের একাংশ যেভাবে বহিরাগতদের সঙ্গে নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তা-ব চালাল, অধ্যক্ষের কক্ষ থেকে শুরু করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ভাঙচুর করল এবং শিক্ষকদের ওপর চড়াও হলোÑ তা আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক গঠনের এক চরম অবক্ষয়কে নগ্নভাবে উন্মোচিত করে। একটি দেশের সর্বোচ্চ স্তরের মাধ্যমিক পরীক্ষার শিক্ষার্থীরা যখন দাবি করে যে তাদের ‘নকল করতে দিতে হবে’ এবং সেই দাবি পূরণ না হলে তারা লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে শিক্ষকের ওপর চড়াও হয়, তখন বুঝতে হবে সংকটের শিকড় অনেক গভীরে।

বছরের পর বছর ধরে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এমন এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে শিক্ষা মানেই হলো নির্দিষ্ট কিছু সাজেস্টেড প্রশ্ন মুখস্থ করা এবং পরীক্ষায় হুবহু তা উগরে দেওয়া। শিক্ষার্থীরা যখন গৃহশিক্ষক, কোচিং সেন্টার বা বাজারচলতি গাইড বইয়ের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন তাদের পাঠ্যবইয়ের মূল বিষয়বস্তু বোঝার ক্ষমতা লোপ পায়।

আইসিটি বা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মতো একটি প্রায়োগিক ও সমসাময়িক বিষয়েও যদি শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন কিছুটা ঘুরিয়ে লিখলে বা একটু কঠিন হলে সম্পূর্ণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে, তবে বুঝতে হবে আমাদের শিখন পদ্ধতিতে বড় ধরনের গলদ রয়েছে। প্রশ্ন কমন পড়েনি মানেই যে পরীক্ষা বর্জন করতে হবে বা হল ভাঙচুর করতে হবেÑ এই মানসিকতা প্রমাণ করে, শিক্ষার্থীরা শিক্ষাকে কোনো জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখছে না; বরং একে দেখছে কেবলই একটি সার্টিফিকেট অর্জনের যন্ত্র হিসেবে, যা যেকোনো উপায়েÑ প্রয়োজনে অনৈতিকভাবে, হাসিল করতে হবে।

চরফ্যাশনের ঘটনার সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলো, শিক্ষার্থীরা সদলবলে ‘নকল করার সুযোগ’ দাবি করেছে। নকল বা অসদুপায় অবলম্বন একসময় ছিল চরম লজ্জার ও চুরির শামিল। কোনো শিক্ষার্থী নকল করতে গিয়ে ধরা পড়লে সে লজ্জায় শিক্ষকের সামনে মাথা নিচু করত। কিন্তু আজ নৈতিকতার পারদ কতটা নিচে নামলে শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধভাবে, প্রকাশ্যে এবং বুক ফুলিয়ে নকল করার অধিকার দাবি করতে পারে?

এই ঔদ্ধত্য একদিনে তৈরি হয়নি। যখন সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে জবাবদিহিতার অভাব দেখা যায়, যখন পরীক্ষায় পাস করা ও জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্য এক অন্ধ প্রতিযোগিতা তৈরি করা হয়, তখন শিক্ষার্থীরাও ধরে নেয় যে যেকোনো উপায়ে পার পেয়ে যাওয়াই কৃতিত্ব। শিক্ষকরা যখন নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষার হলে কড়াকড়ি করেন, তখন শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অসদাচরণের কারণে খাতা কেড়ে নেওয়ার মতো পাল্টা অভিযোগও আসে। কড়াকড়ি বনাম অসদাচরণের এই দ্বন্দ্ব আদতে প্রকাশ করে যে, পরীক্ষার হলের ন্যূনতম শৃঙ্খলা বজায় রাখাকেও শিক্ষার্থীরা এখন তাদের ওপর ‘অত্যাচার’ বা ‘শত্রুতা’ হিসেবে গণ্য করছে।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকÑ চরফ্যাশন সরকারি কলেজ এবং ফাতেমা-মতিন মহিলা কলেজের মধ্যকার দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক রেষারেষি। এই রেষারেষিকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আবেগকে উসকে দেওয়া হয়েছে এবং পরীক্ষা শেষে ফোন করে বহিরাগতদের ডেকে এনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়েছে।

একটি শিক্ষা কেন্দ্রের নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে কীভাবে ৩০০-৩৫০ জন যুবক লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে ভেতরে ঢুকে প্রশাসনিক ভবন ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ তছনছ করতে পারে, তা বড় প্রশ্ন খাড়া করে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে উত্তরপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা শিক্ষাব্যবস্থার পবিত্রতা ও গোপনীয়তার ওপর সরাসরি আঘাত। এখানে স্পষ্ট যে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে পুঁজি করে স্থানীয় কোনো কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল বা কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধী চক্র ফায়দা লোটার চেষ্টা করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যখন স্থানীয় রাজনীতি বা আধিপত্য বিস্তারের চারণভূমিতে পরিণত হয়, তখন পরীক্ষার হলের শৃঙ্খলা রক্ষা করা শিক্ষকদের জন্য জীবনঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

হামলায় কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও ইতিহাস বিভাগের একজন শিক্ষকসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়তে হয়েছে। যে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের জ্ঞান আলোয় আলোকিত করবেন, তাদেরই আজ পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে টিয়ার শেলের ধোঁয়া গিলতে হচ্ছে, ইটপাটকেলের আঘাত সইতে হচ্ছে।

শিক্ষকের গায়ে হাত তোলা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক শিক্ষার চরম দেউলিয়াত্বকে নির্দেশ করে। শিক্ষকের মর্যাদা যখন একটি সমাজের উঠতি তরুণদের কাছে ধূলিসাৎ হয়ে যায়, তখন সেই সমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হতে বাধ্য। শিক্ষকরা যদি পরীক্ষার হলে অসদুপায় ঠেকাতে গিয়ে নিজেদের অনিরাপদ বোধ করেন, তবে আগামী দিনে কোনো সৎ ও যোগ্য শিক্ষক পরীক্ষার ডিউটি নিতে বা খাতা দেখতে আগ্রহ দেখাবেন না। এর ফলে পুরো মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটাই ব্যাহত হবে।

চরফ্যাশনের এই অনাকাক্সিক্ষত ও লজ্জাজনক ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা প্রশাসন, অভিভাবক এবং সমাজকে দ্রুত শিক্ষা নিতে হবে। এ সংকট দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পরীক্ষা পদ্ধতিকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে প্রশ্ন ‘কমন পড়া’র কোনো সুযোগই না থাকে। মুখস্থবিদ্যার ওপর নম্বর দেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা এবং ব্যবহারিক দক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে। শিক্ষার্থীরা যখন জানবে যে মুখস্থ করে পার পাওয়া সম্ভব নয়, তখন তারা গাইড বই ছেড়ে মূল বই পড়ায় মন দেবে।

চরফ্যাশনের ঘটনায় যারা সরাসরি সিসিটিভি ফুটেজ বা প্রত্যক্ষদর্শীদের মাধ্যমে চিহ্নিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শিক্ষাগত ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধী শিক্ষার্থী হোক বা বহিরাগতÑ কাউকেই ছাড় দেওয়া যাবে না। উত্তরপত্র ছিনতাইয়ের চেষ্টা ও সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করার অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। কেবল জিপিএ-৫ বা ভালো ফলের পেছনে না ছুটে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও সততার শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। পরিবার ও সমাজকে বোঝাতে হবে যে, অসদুপায় অবলম্বন করে পাওয়া সনদের কোনো মূল্য নেই। এ ছাড়া পরীক্ষা চলাকালীন এবং পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা কেন্দ্র ও এর আশপাশের এলাকায় পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রাখতে হবে, যাতে কোনো অবস্থাতেই বহিরাগতরা ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।

পরিশেষে বলা যায়, ভোলার চরফ্যাশনের ঘটনাটি আমাদের জন্য একটি অশনিসংকেত। এটি কেবল একটি কলেজের জানালার কাচ ভাঙেনি, বরং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের ব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করে দেখিয়েছে। শিক্ষার্থীরা যদি পড়ার টেবিল ছেড়ে ইটের টুকরো হাতে তুলে নেয় এবং প্রশ্ন কঠিন হওয়ার অজুহাতে শিক্ষকের রক্ত ঝরায়, তবে বুঝতে হবে আমরা এক অসুস্থ  প্রজন্ম গড়ে তুলছি। এখনই সময় এই ব্যাধির মূল উৎপাটন করার। শিক্ষা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিক্ষাঙ্গনকে রাজনীতি ও অনৈতিকতার কবল থেকে মুক্ত করে আবার তার নিজস্ব মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে হবে। অন্যথায়, ‘প্রশ্ন কমন না পড়া’র এই আগুন একদিন পুরো শিক্ষাব্যবস্থাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।