বর্ষার নাম শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। তীব্র গরমের পর ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফোঁটায় শীতল আবহাওয়া, সবুজ প্রকৃতির নবজাগরণ, বৃষ্টির দিনে খিচুড়ির আয়োজন কিংবা জানালার পাশে বসে এক কাপ গরম চা হাতে বৃষ্টি উপভোগ। এসবই যেন বর্ষার চিরচেনা রূপ। কিন্তু এই মনোরম দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা। বর্ষা যেমন কারো জীবনে স্বস্তি, সৌন্দর্য ও আনন্দ নিয়ে আসে, তেমনি কারো জীবনে ডেকে আনে দুর্ভোগ, দুঃখ আর সর্বনাশ। বাংলাদেশে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। এই বন্যার পেছনে যেমন প্রাকৃতিক কারণ রয়েছে, তেমনি মানবসৃষ্ট কারণও কম দায়ী নয়। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ।
অসংখ্য নদ-নদী আমাদের অর্থনীতি, কৃষি, যোগাযোগ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু এই নদীগুলোই যখন মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার অঞ্চলে সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, খোয়াইসহ বিভিন্ন নদীর পানি অতিবৃষ্টির কারণে বিপৎসীমা অতিক্রম করে বন্যার সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন নদীতে পলি জমে নাব্য কমে যাওয়া এবং ময়লা-আবর্জনায় নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে নদীর পানি ধারণক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে সামান্য অতিবৃষ্টিতেই নদীর পানি উপচে আশপাশের জনপদ প্লাবিত হয়।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চল অন্যান্য এলাকার তুলনায় নিচু হওয়ায় উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল খুব দ্রুত এসব এলাকা প্লাবিত করে। ভারতের আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরায় ভারি বৃষ্টিপাত হলে তার সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পড়ে। ফলে প্রায় প্রতি বছরই এই অঞ্চলের মানুষ ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হয়। শুধু উত্তর-পূর্বাঞ্চলই নয়, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলেও বর্ষা অনেক সময় ভয়াবহ দুর্যোগ বয়ে আনে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে অতিবৃষ্টি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে টানা বর্ষণে ভয়াবহ বন্যা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-নালা দখল এবং কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। প্রতি বছর চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষকে এই জলাবদ্ধতার চরম মূল্য দিতে হয়। চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিকসহ প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ দুর্ভোগে পড়েন। বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে, কর্মস্থলে যাওয়া ব্যাহত হয়, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়। একই সঙ্গে পানিবন্দি এলাকায় বিষাক্ত সাপ-বিচ্ছু ঘরে ঢুকে পড়ায় শিশু ও বয়স্কদের জীবন আরও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বন্যার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো দুর্ঘটনা। রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কোথায় গর্ত বা ড্রেন রয়েছে তা বোঝা যায় না। ফলে প্রায়ই যানবাহন দুর্ঘটনা ঘটে এবং মানুষ আহত হয় বা প্রাণ হারায়। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের আরেকটি বড় দুর্যোগ হলো পাহাড়ধস। এই বিপর্যয়ের জন্য অনেকাংশেই দায়ী মানুষ। অবৈধভাবে পাহাড়ের গাছ কেটে ফেলা, মূল্যবান কাঠ পাচার এবং পর্যটন বা বসতি স্থাপনের জন্য পাহাড় কেটে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
গাছপালা কমে যাওয়ায় ভারি বৃষ্টিতে মাটি আলগা হয়ে সহজেই পাহাড়ধসের সৃষ্টি হয়। এর ফলে প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ মাটিচাপা পড়ে প্রাণ হারান, অনেক পরিবার চিরদিনের জন্য নিঃস্ব হয়ে যায়। বন্যাকবলিত মানুষরাই প্রকৃত অর্থে বুঝতে পারেন বর্ষা কতটা নির্মম হতে পারে। অথচ অন্যদিকে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্ষা যেন শুধুই রোমান্টিকতা, বিলাসিতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক। কেউ বৃষ্টিতে ভেজা ছবি, কেউ জানালার পাশে বসে এক কাপ চায়ের ছবি, আবার কেউ খিচুড়ির প্লেটের ছবি পোস্ট করে বর্ষাকে উদযাপন করেন। কিন্তু সেই একই সময়ে দেশের কোথাও না কোথাও অসংখ্য মানুষ নিজের জীবন, ঘরবাড়ি ও স্বজনদের রক্ষার জন্য সংগ্রাম করছেন। যেখানে কেউ বৃষ্টিকে উৎসব হিসেবে দেখছেন, সেখানে অন্য কেউ একমুঠো খাবার কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য অপেক্ষা করছেন।
গ্রামাঞ্চলেও একই বৈপরীত্য চোখে পড়ে। নদী-ভাঙনপ্রবণ এলাকার মানুষ নদীর করাল গ্রাস থেকে নিজেদের বসতভিটা রক্ষায় ব্যস্ত থাকেন। অন্যদিকে নতুন বন্যার পানিতে মাছ ধরে অনেকেই ভালো আয় করেন। আবার কেউ কেউ নৌকা নিয়ে পানি দেখতে বের হয়, শাপলা ফুল তুলতে এবং হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে যায়। কিন্তু অনেক সময় তাদের এই আনন্দ বিষাদে রূপ নেয়। হাওরাঞ্চলে পানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় নৌকা ডুবে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে ফলে অনেকেই প্রাণ হারায়। অর্থাৎ একই বর্ষা একদিকে কারো জীবিকার নতুন দ্বার খুলে দেয়, অন্যদিকে কারো সারাজীবনের সঞ্চয়, ঘরবাড়ি ও স্বপ্ন মুহূর্তেই ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তাই বর্ষাকে শুধু সৌন্দর্যের ঋতু হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি একই সঙ্গে সতর্কতার ঋতুও।
বর্ষার এই বিরূপ প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সরকার, প্রশাসন এবং জনসাধারণ সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। নিয়মিত নদী খনন করে নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে হবে যেন নদীর ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, শহরাঞ্চলে কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যেন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি না হয়, পাহাড় ও বন সংরক্ষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বেশি বেশি বৃক্ষরোপণ করতে হবে। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ নয়, বরং প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলার মধ্যেই টেকসই সমাধান নিহিত।
পাশাপাশি বন্যাপ্রবণ এলাকায় পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যাবস্থা, প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং স্যানিটেশনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু প্রশাসন নয়, সকল জনসাধারণকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে এবং দুর্দশাগ্রস্ত মানুষদের পাশে দাঁড়াতে হবে সার্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে। তবেই একটি সুন্দর মানবিক সমাজ এবং রাষ্ট্র গঠিত হবে। কারণ একটি রাষ্ট্র উন্নতির পেছনে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন। তাই বর্ষার সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি আমাদের উচিত দুর্যোগে আক্রান্ত মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করা এবং এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে বর্ষা আনন্দের বার্তা বয়ে আনবে, দুর্ভোগের নয়।

