ইতিহাসের পাতায় কিছু সময় এমনভাবে চিহ্নিত হয়ে থাকে, যা কেবল স্মরণীয় হয়ে থাকে না, বরং একটি জাতির অস্তিত্বের নতুন সংজ্ঞা হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৪ সালের জুলাই মাস বাংলাদেশের জন্য এমনই এক যুগসন্ধিক্ষণ যা কেবল কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া একটি আন্দোলনের নাম নয়; বরং ছিল পনেরো বছরের জমানো ক্ষোভ, দীর্ঘদিনের গুম, খুন, দুর্নীতি এবং ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে এক বিশাল গণবিস্ফোরণ। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায়, ‘আঠারো বছর বয়স কি দুঃসহ,/স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি।’ জুলাইয়ের সেই ছাত্রসমাজ তাদের স্পর্ধায় রাষ্ট্রকাঠামোর লৌহকপাট ভেঙে ফেলেছিল।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যখনই কোনো শাসক জনগণের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে যান, তখনই সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসে। যেমন, ২০১১ সালের আরব বসন্তের কথা ধরা যাক। তিউনিসিয়ার মোহাম্মদ বুয়াজিজির আত্মাহুতির পর যে স্ফুলিঙ্গ জ্বলেছিল, তা পুরো আরব বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। তিউনিসিয়ার বেন আলি, মিশরের হোসনি মোবারক বা লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি, কারো দম্ভই জনতার জোয়ারের সামনে টিকতে পারেনি। তিউনিসিয়ার সাধারণ মানুষের মতো বাংলাদেশের ছাত্র-জনতাও প্রমাণ করেছে, বন্দুকের নলের চেয়েও শক্তিশালী হচ্ছে জনগণের দৃঢ়প্রতিজ্ঞা।
জুলাই বিপ্লব কেন হয়েছিল প্রথম কারণ যদি আমরা খুঁজি তাহলে দেখব জনতার দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ স্বৈরাচারী দম্ভের উপর আছড়ে পড়েছিল। শেখ হাসিনার দীর্ঘ পনেরো বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ এক অদ্ভুত ‘ভয়ের সংস্কৃতি’র আবর্তে আটকে গিয়েছিল। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন, ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনের প্রহসন সাধারণ মানুষের হৃদয়ে ক্ষোভের দাহ সৃষ্টি করেছিল। গুম হওয়া মানুষের স্বজনদের কান্না, আয়নাঘরের বিভীষিকা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর ক্রমাগত আঘাতÑ সব মিলিয়ে রাষ্ট্রটি এক ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো পরিচালিত হচ্ছিল। তৎকালীন সরকারের দম্ভ ছিল আকাশচুম্বী। তারা মনে করত, উন্নয়নের দোহাই দিয়ে সব অন্যায় ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, যখনই জনগণের অধিকার সংকুচিত হয়েছে, তখনই কোনো না কোনো স্ফুলিঙ্গ দাবানল হয়ে জ্বলে উঠেছে। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার বলেছিলেন, ‘যখন বিচারব্যবস্থা আর ন্যায়বিচার পায় না, তখনই বিপ্লবের জন্ম হয়।’ জুলাইয়ের আন্দোলন ছিল ন্যায়বিচারহীনতার বিরুদ্ধে এক স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
জুলাইয়ের সেই রক্তস্নাত দিনগুলোর কথা আমরা যদি মনে করি তাহলে দেখব ১ জুলাই থেকে আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে ছিল। কারণ, শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক দাবি ছিল সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা সংস্কার। কিন্তু সরকার এই যৌক্তিক দাবিকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পরিবর্তে পুলিশ, র্যাব এবং ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দিয়ে দমনের চেষ্টা করে।
এই বিপ্লবে বিএনপির ভূমিকা ও অংশগ্রহণ ছিল ক্যারিশমেটিক। যদিও কথিত যে, বিপ্লব ছিল ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ। দীর্ঘদিন ধরে সরকারের দমন-পীড়নের শিকার বিএনপি এবং অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো এই আন্দোলনে কৌশলগত অবস্থান নেয়। বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ছাত্রদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে নেমেছিল। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলনকারীদের সুরক্ষা দিয়েছে এবং স্বৈরাচারী পতনের ডাককে একদফায় রূপান্তর করতে রাজনৈতিক শক্তি জুগিয়েছে। অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করেন, ছাত্ররা যদি স্ফুলিঙ্গ হয়, তবে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠ পর্যায়ের উপস্থিতি ও জনসমর্থন একে এক বিশাল দাবানলে রূপান্তর করেছিল। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন সহ্য করার ইতিহাস এই আন্দোলনকে একটি শক্ত মেরুদ- প্রদান করেছিল।
৫ আগস্ট ছিল পতন ও পলায়ন এবং ক্ষমতার চূড়ান্ত পরিণতির ঐতিহাসিক এক মহাকাব্যিক দিন। যে ক্ষমতার দাপটে দেশজুড়ে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল, জনতার ঢলের সামনে তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। হাজার হাজার মানুষ যখন গণভবনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল, তখন স্বৈরাচারের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল, আর পালানোর পথ নেই। বিকেলের দিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে, শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে করে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। এটি কেবল একজন প্রধানমন্ত্রীর দেশত্যাগ ছিল না; ছিল একটি ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত পরাজয়। পলায়নরত এই চিত্রটি প্রমাণ করল, স্বৈরাচার যত শক্তিশালীই হোক, জনতার শক্তির চেয়ে বড় কোনো শক্তি পৃথিবীতে নেই।
জুলাই বিপ্লবের রক্তিম পথ বেয়ে আজকের বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন ও সাহসী সংকল্পের সামনে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সাম্প্রতিক ঘোষণা এই সংকল্পকে আরও স্পষ্ট করেছে। যা বাংলাদেশের ভিত্তি-দায়বদ্ধতা ও বিচার ব্যবস্থার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, জুলাই আন্দোলনে নির্বিচার হত্যাকা-ে জড়িত থাকা এবং দীর্ঘদিনের দুঃশাসনের দায়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কবর রচিত হয়েছে। তার মতে, জনগণের রায়ে দলটি এখন বাংলাদেশে কেবল জনবিচ্ছিন্নই নয়, বরং একটি বিলুপ্ত রাজনৈতিক সত্তা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য জুলাইয়ের শহিদদের ত্যাগের প্রতি এক ধরনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। তিনি যখন বলেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগ আর কখনোই বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ পাবে না, তখন তিনি মূলত গণ-আকাক্সক্ষার প্রতিধ্বনি করছেন। কারণ, যে দল একটি পুলিশি রাষ্ট্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে পাখির মতো মানুষ হত্যা করেছে, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তাদের পুনর্বাসন হওয়ার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে মন্ত্রীর বার্তাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট করেছেন, সন্ত্রাসী কর্মকা-ের দায়ে দলটিকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। এটি কেবল প্রতিশোধ নয়, বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার একটি জরুরি পদক্ষেপ। ফরাসি বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে যেমন পুরোনো ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছিল, আজকের বাংলাদেশেও তেমন এক আমূল শুদ্ধি প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছে। এই বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে যে, ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী যেন ক্ষমতার দম্ভে জনগণের ওপর অস্ত্র তুলে ধরার দুঃসাহস না দেখায়।
বিপ্লব কেবল ভাঙচুর নয়, বিপ্লব হলো বিনির্মাণ। জুলাইয়ের রক্ত আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, জনগণ যখন জেগে ওঠে, তখন শাসকের বন্দুক নিথর হয়ে যায়। আমাদের এখন সময় এসেছে বিভেদ ভুলে একটি সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই কঠোর অবস্থান সেই লক্ষ্য অর্জনেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশÑ একটি নতুন ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিশ্রুতি।
প্রাচীন প্রবাদে আছে, ‘অন্ধকার যত গভীর হয়, প্রভাত ততই নিকটবর্তী হয়।’ জুলাইয়ের সেই অন্ধকারের পর আমরা এখন এক নতুন প্রভাতে দাঁড়িয়ে আছি। এই ভোরের আলোয় যদি আমরা সততা, দেশপ্রেম এবং ত্যাগের মহিমা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারি, তবেই আমাদের শহিদদের রক্ত সার্থক হবে। ইতিহাস ক্ষমা করবে না যদি আমরা এই অর্জিত স্বাধীনতাকে আবার হাতছাড়া করি। জুলাই বিপ্লব আজ কেবল একটি ঘটনা নয়, এটি আমাদের জাতীয় সংকল্পের নাম। আমরা সেই সংকল্প নিয়েই গড়ে তুলব আজকের বাংলাদেশÑ যেখানে থাকবে না কোনো বৈষম্য, যেখানে থাকবে কেবল মানবিক মর্যাদা ও সাম্যের জয়গান।
নতুন বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রায় প্রতিটি নাগরিকের ভূমিকা অপরিসীম। তরুণ প্রজন্ম এখন কেবল ভবিষ্যতের স্বপ্নদ্রষ্টাই নয়, তারা পরিবর্তনের কারিগর। আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র সংস্কার কোনো এক রাতের কাজ নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ও শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, দক্ষ বিচার বিভাগ এবং জবাবদিহিতামূলক রাজনৈতিক কাঠামো গড়ার মাধ্যমেই আমরা জুলাই বিপ্লবের মূল লক্ষ্য অর্জন করতে পারব। যদি আমরা দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হতে পারি, তবেই বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ একটি অদম্য ও উন্নত জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। আমাদের লক্ষ্য এখন একটাইÑ স্বৈরাচারমুক্ত, ন্যায়পরায়ণ ও কল্যাণকামী এক আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। তবে পরিশেষে শুধু একটাই প্রশ্ন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি পারবে এমন একটি দেশ গড়তে?

