যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের কনকনে শীতের এক সকাল। বাইরের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে। শহরের একটি বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা মিলল এক চেনা হাসিমুখের। গায়ে স্টোরের ইউনিফর্ম, নেমট্যাগ ঝুলছে বুকে। তিনি রেজাউল হাসান। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও যার পরিচয় ছিল ভিন্ন। ঢাকার গুলশানে অবস্থিত পাঁচ তারকা হোটেল ‘দ্য ওয়েস্টিন’-এর রান্নাঘরে যখন আগুনের আঁচ আর মসলার গন্ধে প্রাণবন্ত হয়ে উঠত চারপাশ, রেজাউল ছিলেন সেই যজ্ঞের অন্যতম কারিগর। আজ তিনি মিসৌরির ব্যস্ত গ্রাহকদের ভিড়ে এক নিরলস কর্মী।
ওয়েস্টিনের সেই রুপালি অধ্যায়
রেজাউল হাসানের ক্যারিয়ারের ভিত তৈরি হয়েছিল দেশের অন্যতম সেরা আবহে। ঢাকা ওয়েস্টিনের শেফ হিসেবে তার দিনগুলো ছিল সাফল্যে মোড়ানো। সেখানে কাজের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত শৃঙ্খলিত এবং রাজকীয়। প্রতিদিন শত শত ভিআইপি গেস্ট, বিদেশি কূটনীতিক এবং ভোজনরসিকদের জন্য সিগনেচার ডিশ তৈরি করতেন তিনি। শেফের সাদা অ্যাপ্রন আর উঁচু টুপি ছিল তার আভিজাত্যের প্রতীক।
রন্ধনশৈলীতে তার হাত ছিল জাদুকরী। ছুরি চালানোর নিখুঁত গতি আর ফ্লেভার ব্যালেন্সিংয়ে তার দক্ষতা তাকে সহকর্মীদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। কিন্তু মনের কোণে কোথাও একটা স্বপ্ন ছিলÑ বিদেশের মাটিতে নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করার। সেই স্বপ্নই তাকে টেনে নিয়ে যায় স্বপ্নের দেশ আমেরিকায়।
আটলান্টিকের ওপারে নতুন চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ থেকে যখন কেউ আমেরিকায় পাড়ি জমান, বিশেষ করে যারা প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী, তাদের জন্য প্রথম ধাক্কাটা হয় মানসিক। রেজাউল হাসান যখন মিসৌরিতে পৌঁছালেন, তখন তার সামনে কোনো রেডিমেড কিচেন ছিল না। বিদেশের মাটিতে প্রথম থেকেই শেফ হিসেবে কাজ পাওয়া সব সময় সহজ হয় না। লাইসেন্সিং, স্থানীয় রেসিপির সঙ্গে পরিচয় এবং কাজের সংস্কৃতির ভিন্নতা সব মিলিয়ে রেজাউল বেছে নিলেন এক ভিন্ন পথ। তিনি যোগ দিলেন মিসৌরির একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। ওয়েস্টিনের সেই শেফ কোট তুলে রেখে তিনি গায়ে জড়িয়ে নিলেন স্টোরের সাধারণ ইউনিফর্ম। এটি কোনো পিছুটান নয়, বরং নতুন এক যুদ্ধের শুরু।
মিসৌরির জীবন : সংগ্রামের প্রতিদিন
আমেরিকার মিসৌরি অঙ্গরাজ্যটি তার বৈচিত্র্যময় আবহাওয়ার জন্য পরিচিত। কখনো প্রচ- গরম, আবার কখনো হাড়কাঁপানো শীত। এই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে প্রতিদিন স্টোরে কাজ করা মোটেও সহজ নয়। ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের কাজ মানেই হলো সারাক্ষণ পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা। ইনভেন্টরি চেক করা, কাস্টমারদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং স্টোরের সেলফ সাজানোÑ সবকিছুই করতে হয় নিখুঁতভাবে।
রেজাউল হাসান এখানে কেবল একজন কর্মী নন, তিনি একজন শিক্ষার্থীও। আমেরিকান গ্রাহকদের মনস্তত্ত্ব বোঝা, তাদের সঙ্গে ইংরেজি ভাষায় সাবলীল যোগাযোগ বজায় রাখা এবং স্টোর ম্যানেজমেন্টের খুঁটিনাটি শেখা প্রতিটি দিনই তার কাছে একটি নতুন পাঠ।
অহংকার নয়, আত্মমর্যাদা
আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, উচ্চপদস্থ কাজ ছেড়ে সাধারণ কাজ করতে অনেকে লজ্জা পান। কিন্তু রেজাউল এখানে এক অনন্য উদাহরণ।
তিনি প্রমাণ করেছেন যে, কোনো কাজই ছোট নয় যদি তাতে সততা থাকে। ওয়েস্টিনের শেফ হিসেবে তিনি যেমন নিষ্ঠাবান ছিলেন, মিসৌরির এই স্টোরেও তিনি ঠিক ততটাই নিবেদিতপ্রাণ।
তিনি তার বন্ধুদের প্রায়ই বলেন, ‘আমেরিকা এমন এক দেশ যেখানে আপনি কী কাজ করছেন তার চেয়ে বড় কথা আপনি কাজ করছেন কি না। এখানে শ্রমের মর্যাদা আছে।’ এই জীবনদর্শনই তাকে প্রবাসের কঠিন দিনগুলোতে মানসিকভাবে শক্ত রেখেছে।
প্রবাসের রান্নাঘর ও নস্টালজিয়া
দিনের দীর্ঘ হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যখন রেজাউল বাসায় ফেরেন, তখন তিনি আবারও সেই পুরোনো শেফ। প্রবাসে নিজের দেশের খাবারের জন্য মন কাঁদে। তাই অবসরে তিনি রান্না করেন বিরিয়ানি, ভুনা খিচুড়ি কিংবা খাঁটি দেশি ইলিশ। তার হাতের রান্নার ঘ্রাণ যখন মিসৌরির অ্যাপার্টমেন্টে ছড়িয়ে পড়ে, তখন কয়েক মুহূর্তের জন্য তিনি ফিরে যান সেই ফেলে আসা ঢাকায়, ওয়েস্টিনের সেই ব্যস্ত রান্নাঘরে। তার প্রবাস জীবনের একাকিত্ব দূর করার অন্যতম মাধ্যম হলো রান্না এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশের মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকা। তিনি তার রান্নার অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান জীবনের সংগ্রামের গল্পগুলো শেয়ার করেন, যা অনেক নতুন প্রবাসীর জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।
আগামীর পথচলা
ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের এই কাজ রেজাউলের জন্য শেষ গন্তব্য নয়। এটি তার জন্য একটি সেতু। আমেরিকার মাটিতে নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করার এই লড়াই একদিন তাকে আবারও তার চিরচেনা রান্নাঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমরা দেখতে পাব মিসৌরির কোনো এক ব্যস্ত রাস্তায় ‘শেফ রেজাউল’-এর নিজস্ব কোনো রেস্টুরেন্ট, যেখানে আমেরিকানরা লাইন ধরবে বাংলাদেশি স্বাদের সন্ধানে।
অভিবাসীদের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে যান। অনেকে শুরুতে প্রত্যাশিত কাজ না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন। রেজাউল হাসানের গল্পটি তাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা। তিনি দেখিয়েছেন যে, পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে বদলে ফেলাই হলো প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা। একজন শেফ যদি স্টোর কিপার হিসেবে সফল হতে পারেন, তবে লেগে থাকলে সাফল্য আসবেই।

