ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

প্রবাসে নারী শ্রমিক

রেমিট্যান্সের মুদ্রায় জমে থাকা নীরব আর্তনাদ

মিনহাজুর রহমান নয়ন
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ০১:৪০ এএম

ভোরের কুয়াশা মোড়ানো রানওয়েতে যখন একটি বিমান ডানা মেলে, তখন তার ভেতরে থাকা শত শত জোড়া চোখের স্বপ্নগুলো প্রস্ফুটিত হতে শুরু করে। এদের মধ্যে একটি বড় অংশজুড়ে থাকেন আমাদের মা-বোনেরা। কাঁপা কাঁপা হাতে পাসপোর্টের কভার আর সঙ্গে থাকা ছোট্ট ব্যাগটি আঁকড়ে ধরে তারা যখন বিদেশের মাটিতে পা রাখেন, তখন তাদের মনে থাকে কেবল একটিই লক্ষ্য সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করা, জরাজীর্ণ পৈতৃক ভিটেটি মেরামত করা কিংবা দেশে যে বিশাল ঋণের বোঝা রেখে পারি জমিয়েছেন বিদেশে তার হালকা কর। বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদ- হিসেবে পরিচিত যে রেমিট্যান্স, তার অন্যতম প্রধান কারিগর এই প্রবাসী নারী শ্রমিকেরা। তবে তাদের পাঠানো এই অর্থের প্রতিটি মুদ্রায় মিশে আছে অবর্ণনীয় ত্যাগ, নিঃশব্দ কান্না, হাহাকার আর হাড়ভাঙা শ্রমের গল্প।

রেমিট্যান্সের সচল চাকা ও নারীর অনন্য অবদান

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যখন ইতিহাসের রেকর্ড স্পর্শ করে, তখন সেই সাফল্যের ভাগিদার হিসেবে এই নারীদের নাম খুব একটা উচ্চারিত হয় না। অথচ বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও গবেষণা বলছে, প্রবাসী পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় নারী শ্রমিকেরা তাদের আয়ের প্রায় ৯০ থেকে ১০০ শতাংশই দেশে পাঠান।

মরুভূমির তপ্ত বালু ও বন্দি জীবনের বাস্তবতা

একটি সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় তারা বিদেশে যান ঠিকই, কিন্তু অনেকের কাছে সেই ভবিষ্যৎ হয়ে দাঁড়ায় অন্ধকার এক কারাজাল। বিশেষ করে গৃহকর্মী হিসেবে যারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যান, তাদের বড় একটি অংশ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। বিদেশের মাটিতে পা রাখার পর মুহূর্তেই অনেক নিয়োগকর্তা বা মালিক তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেয়। ফলে সেই নারী কার্যত সেখানে বন্দি হয়ে পড়েন। দিনের পর দিন চলে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টার অমানুষিক পরিশ্রম। পর্যাপ্ত খাবার এবং ঘুমের অভাবে তারা শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।

নিরাপত্তা কোথায় ও আইনি সুরক্ষার সংকট

সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকগুলোতে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা এখন এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। বিদেশে আমাদের দূতাবাস বা শ্রম উইংগুলো বিপদে পড়া নারীদের কতটুকু সুরক্ষা দিতে পারছে, তা নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় রয়েছে। নির্যাতনের শিকার হয়ে যখন কোনো নারী দূতাবাসের দ্বারস্থ হন, তখন তাদের জন্য পর্যাপ্ত ‘সেফ হোম’ বা আইনি সহায়তার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় না। ফলে জীবন বাঁচাতে অনেক নারী শূন্য হাতে বা অসুস্থ শরীর নিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন। এই নারীদের নিরাপত্তা কেবল কাগজে-কলমে থাকলে চলবে না, বরং তাদের প্রতিটি কর্মস্থলে রাষ্ট্রের নজরদারি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

প্রতারণার মায়াজাল ও অদক্ষতার মাশুল

অধিকাংশ নারী শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার আগে সঠিক তথ্যের অভাবে দালালের খপ্পরে পড়েন। মধ্যস্বত্বভোগী এই চক্রটি নারীদের আকাশছোঁয়া বেতনের স্বপ্ন দেখায়, কিন্তু বাস্তবে তাদের এমন সব পরিবেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় যেখানে শ্রম আইনের কোনো লেশমাত্র নেই। এ ছাড়া ভাষার দক্ষতা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের অভাব তাদের শোষণের সুযোগ করে দেয়। একজন নারী যখন সেই দেশের ভাষা বুঝতে পারেন না কিংবা আধুনিক যন্ত্রপাতি বা গৃহস্থালির কাজের সঙ্গে অভ্যস্ত থাকেন না, তখন নিয়োগকর্তার পক্ষ থেকে নেমে আসে গালিগালাজ ও মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে তড়িঘড়ি করে বিদেশে পাঠানোর এই প্রবণতা নারীদের আরও বেশি ঝুঁকিতে ফেলছে।

বিদেশের গ্লানি ও দেশের অবহেলা

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, একজন প্রবাসী নারী শ্রমিক বিদেশে যেমন নিগৃহীত হন, দেশে ফিরেও অনেক সময় তিনি সামাজিক লাঞ্ছনার শিকার হন। প্রবাসী নারীদের সম্পর্কে সমাজের একটি অংশের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যারা বছরের পর বছর বিদেশের মাটিতে ঘাম ঝরিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছেন, তাদের প্রাপ্তি কেবল অবজ্ঞা আর অবহেলা। এই মানসিকতা পরিবর্তনের সময় এসেছে। সমাজ ও রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে যে, এই নারীরা কেবল পরিবারের অভাব মেটাচ্ছেন না, বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নে অসামান্য ভূমিকা রাখছেন। তাদের পুনর্বাসনের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা অপরিহার্য।

প্রবাসী নারী শ্রমিকদের মর্মস্পর্শী জবানবন্দি

দীর্ঘদিন প্রবাস জীবনে নির্যাতন সহ্য করে ফিরে আসা মমতা বেগমের ভাস্যমতে, ‘আমি গিয়েছিলাম পরিবারের অভাব দূর করতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি আমি আসলে একজন কয়েদি। দিনরাত ১৮ ঘণ্টা কাজ করাত, ঠিকমতো খেতে দিত না। প্রতিবাদ করলে মারধর জুটতো। অনেক কষ্টে দূতাবাসের সাহায্যে প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছি। আমি চাই সরকার যেন আমাদের পাঠানোর আগে আমাদের নিরাপত্তার শতভাগ গ্যারান্টি দেয়।’

এই পথের পথিক হালিমা। তিনি জানালেন, ‘এজেন্ট আমাদের বড় বড় স্বপ্ন দেখায়, কিন্তু বিদেশে বিপদে পড়লে তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ফোনের সিম কেড়ে নেওয়া হয় যাতে আমরা কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে না

পারি। আমাদের মতো নিরক্ষর নারীদের জন্য বিদেশের দূতাবাসগুলোতে যেন ২৪ ঘণ্টা খোলা হেল্পলাইন থাকে।’

সৌদি আরবে নিজের ঘাম ঝরিয়ে দেশে নিজের ভাইকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াচ্ছেন সালেহা বেগম। তার এক ফোটা ঘাম এক একটি মহাকাব্য। তিনি জানালেন,  ‘লোকে বলে আমি বিদেশে দাসের কাজ করি। কিন্তু আমি জানি, আমার পাঠানো টাকায় আমার ছোট ভাইটা আজ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। বিদেশের মাটিতে অনেক সময় না খেয়েও কাজ করেছি শুধু পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে। আমরা তো দয়া চাই না, আমরা চাই এয়ারপোর্টে বা সমাজে যেন আমাদের সম্মানটুকু দেওয়া হয়।’

সুরক্ষিত অভিবাসন ও আগামীর পথ

প্রবাসী নারী শ্রমিকদের এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুব একটা সহজ নয়, তবে অসম্ভবও নয়। সবার আগে প্রয়োজন ‘স্মার্ট অভিবাসন’ নিশ্চিত করা। নারীদের বিদেশে পাঠানোর আগে তাদের অন্তত তিন থেকে ছয় মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত, যেখানে ভাষা শিক্ষা, কাজের দক্ষতা এবং নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কৌশল শেখানো হবে। এ ছাড়া প্রতিটি এজেন্সিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। কোনো নারী বিদেশে নির্যাতনের শিকার হলে তার দায়ভার সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সিকেও নিতে হবে। পাশাপাশি বিদেশে আমাদের দূতাবাসগুলোকে আরও বেশি জনবান্ধব ও সক্রিয় হতে হবে। প্রতিটি নারী শ্রমিকের কাছে যেন দূতাবাসের জরুরি হেল্পলাইন নম্বর থাকে এবং তারা যেন যেকোনো বিপদে দ্রুত সাড়া পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

স্বপ্ন যেন লাশের কফিন না হয়

প্রবাসী নারী শ্রমিকরা বাংলাদেশের অর্থনীতির এক একটি স্তম্ভ। তাদের ত্যাগের বিনিময়ে গড়ে উঠছে আমাদের আধুনিক স্বপ্ন। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল কিংবা মেগা প্রজেক্টের পেছনে এই অদৃশ্য কারিগরদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু এই উন্নয়নের দাম যেন কোনোভাবেই কোনো নারীর জীবনের বিনিময়ে না হয়। আমরা আর কোনো মায়ের লাশ কফিনে দেখতে চাই না, আর কোনো বোনের নির্যাতনের করুণ কাহিনি শুনতে চাই না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাদের প্রতিটি ঘামের ফোঁটার মর্যাদা দেওয়া এবং বিদেশের মাটিতে তাদের সম্মান ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা। তবেই পূর্ণতা পাবে তাদের এই সুদীর্ঘ ত্যাগ আর সংগ্রাম। আসুন, আমরা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের কেবল টাকার উৎস হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করি এবং তাদের জন্য এক নিরাপদ আগামীর অঙ্গীকার করি।