ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মৃত্যুঞ্জয়ী এক লিবিয়া যাত্রা

সাগর ও মাফিয়াদের ফাঁকি দিয়ে ইতালিতে কামরুল

শেখ রুবেল
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ০১:৪১ এএম

ঢাকা থেকে ইতালির রঙিন স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করা যেকোনো তরুণের জন্য লিবিয়ার মরুভূমি আর ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউ আজ এক আতঙ্কের নাম। গোপালগঞ্জের মুকসেদপুরের তরুণ কামরুল ইসলামের জীবনে সেই স্বপ্নযাত্রাই হয়ে উঠেছিল যমদূতের সঙ্গে লড়াই। ২০২৫ সালে দেশ ছাড়ার পর থেকে ইতালির মাটিতে পা রাখা পর্যন্ত কামরুলের প্রতিটি দিন ছিল মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার গল্প। একের পর এক বন্দিদশা, মাফিয়াদের পৈশাচিক নির্যাতন আর বারবার সমুদ্র থেকে ফিরে আসার এক রোমহর্ষক কাহিনি এটি।

ভুল পথে স্বপ্নের হাতছানি ও লিবিয়ার নরকে প্রবেশ : ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে বুকভরা আশা আর পরিবারের সচ্ছলতার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকা ছাড়েন কামরুল। দালালের সাজানো ছকে প্রথমে শ্রীলঙ্কা এবং পরে সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তিনি পৌঁছান লিবিয়ায়। কিন্তু লিবিয়ার মাটিতে পা রাখার পরই বদলে যায় দৃশ্যপট। যে সোনার হরিণের খোঁজে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন, তা ধরা দেওয়ার বদলে শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই। ইউরোপে প্রবেশের নেশায় কামরুল তিন-তিনবার সমুদ্রপথে অবৈধ যাত্রার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রতিবারই লিবিয়ার উপকূল রক্ষা বাহিনী বা নিরাপত্তা বাহিনীর নজরে ধরা পড়ে সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। এই ব্যর্থতার দায়ে কামরুলকে এক মাসের জন্য লিবিয়ার অন্ধকার কারাগারে জেল খাটতেও হয়।

আইনশৃঙ্খলার আড়ালে জিম্মি বাণিজ্য : লিবিয়ার মাটিতে অভিবাসীরা যে কতটা অসহায়, তার চরম অভিজ্ঞতা হয় কামরুলের চতুর্থ চেষ্টার আগে। সেখানে আইন রক্ষাকারী বাহিনী যেখানে নিরাপত্তার প্রতীক হওয়ার কথা, সেখানে তারাই হয়ে ওঠে শোষক। একবার স্থানীয় পুলিশ তাকে আটক করার পর সহায়তার বদলে উল্টো পণ্য হিসেবে বিক্রি করে দেয় এক শক্তিশালী মাফিয়া চক্রের কাছে। এই চক্রের হাতে পড়া মানেই জীবনের শেষ অধ্যায় শুরু হওয়া। পুলিশ এই অসহায় মানুষদের ধরে এনে মাফিয়াদের কাছে চড়া দামে তুলে দেয়, আর মাফিয়ারা সেই টাকা আদায় করে অভিবাসীদের রক্ত ঝরিয়ে।

স্বদেশের মানুষের হাতেই স্বদেশের মানুষ বলি : এই অপরাধ জগতের সবচেয়ে কলঙ্কিত আর যন্ত্রণাদায়ক দিক হলো এর কারিগরদের পরিচয়। লিবিয়ার এই বড় বড় মাফিয়া চক্রের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে কিছু অসাধু বাংলাদেশি। নিজ দেশের মানুষকে জিম্মি করে টাকা আদায়ের এই জঘন্য ব্যবসায় তারা লিবিয়ার মাফিয়াদের প্রধান সহযোগিতে পরিণত হয়েছে। পুলিশকে টাকা দিয়ে কিনে আনার পর এই বাংলাদেশিরাই কামরুলের মতো তরুণদের ওপর চালায় স্টিম রোলার। ভাষাগত সুবিধা নিয়ে তারা ভুক্তভোগীদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং দেশ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মূল পরিকল্পনা সাজায়।

নির্যাতন কেন্দ্রের বিভীষিকা ও মুক্তিপণের হাহাকার : মাফিয়াদের সেই গোপন নির্যাতন কেন্দ্রে কামরুলের ওপর চলত অমানবিক এবং পৈশাচিক অত্যাচার। সেখানে দিন-রাতের পার্থক্য ঘুচে যেত চাবুকের আঘাতে। কামরুলের পরিবারের কাছে ফোন করে দাবি করা হতো বিশ থেকে শুরু করে কখনো কখনো চল্লিশ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ। নির্যাতনের তীব্রতা এতটাই নিষ্ঠুর ছিল যে, তারা সরাসরি ভিডিও কলের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের সেই পৈশাচিক দৃশ্য দেখাত। নিজের সন্তানের আর্তনাদ ফোনের পর্দায় দেখে দেশ থেকে কামরুলের পরিবার সব সহায়-সম্বল বিক্রি করে দিতে বাধ্য হতো।

সর্বস্বান্ত পরিবার ও ঋণের অতল গহ্বর : ইতালিতে পৌঁছানোর এই দীর্ঘ যাত্রায় এবং মাফিয়াদের হাত থেকে কামরুলের প্রাণ বাঁচাতে তার পরিবারকে সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে। এই বিশাল অঙ্কের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে মুকসেদপুরের এই সাজানো-গোছানো মধ্যবিত্ত পরিবারটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। দালালের চাহিদা মেটাতে তারা ধাপে ধাপে যা হারিয়েছে:

ভিটেমাটি ও জমি : পৈতৃক সূত্রে পাওয়া চাষের জমি এবং মাথাগোঁজার শেষ আশ্রয় ঘর-বাড়িটুকুও বিক্রি করে দিতে হয়েছে নামমাত্র মূল্যে।

স্বর্ণালঙ্কার : কামরুলের মা ও বোনের গায়ে থাকা শেষ সম্বল স্বর্ণের গহনাগুলোও বিক্রি করে তুলে দেওয়া হয়েছে দালালের হাতে।

কিস্তির ঋণের বোঝা : জমি ও গহনা বিক্রির টাকায়ও যখন সংকুলান হচ্ছিল না, তখন নিরুপায় পরিবারটি বিভিন্ন বেসরকারি সাহায্য সংস্থা বা এনজিও থেকে চড়া সুদে মোটা অঙ্কের ঋণ নিতে বাধ্য হয়। ব্র্যাক, আশা এবং সাজেদা ফাউন্ডেশনের মতো সংস্থা থেকে নেওয়া এই ঋণের কিস্তি শোধ করতে গিয়ে এখন কামরুলের পরিবার দিশাহারা।

চতুর্থবারের মরণপণ যাত্রা ও কামরুলের কাক্সিক্ষত সফলতা : সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়া কামরুল ইসলাম চরম মানসিক ও শারীরিক আঘাত সহ্য করেও হাল ছাড়েননি। লিবিয়া থেকে চতুর্থবারের মতো এক ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় অংশ নেন তিনি। উত্তাল ভূমধ্যসাগরের ঢেউ আর রাবারের ডিঙি নৌকায় করে জীবনের শেষ বাজি ধরেন। দীর্ঘ অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুভয় জয় করে চলতি মাসেই কামরুল অবশেষে ইতালির মাটিতে পা রাখতে সক্ষম হন। লিবিয়ার সেই নরক থেকে এই স্বাধীনতার স্বাদ পেতে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে এক দুর্গম ও রক্তক্ষয়ী পথ।

রঙিন স্বপ্নের ধূসর বাস্তব : কামরুল ইতালি পৌঁছাতে পারলেও এই যাত্রার ক্ষত মুছে যাওয়ার নয়। শুধুমাত্র এই সফলতার জন্য তাকে এবং তার পরিবারকে যে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, তা বর্ণনাতীত। এই কাহিনি শুধু একজনের সফল হওয়ার গল্প নয়, বরং এটি লিবিয়া হয়ে ইউরোপ যাত্রার প্রতিটি ধাপে ওতপেতে থাকা মহাবিপদ আর দালালদের প্রতারণার এক জীবন্ত দলিল। বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই যাত্রা যেমন অনিশ্চিত, তেমনি প্রতিটি পদক্ষেপে এটি রক্তেভেজা এক অধ্যায়। কামরুল ইসলামের কাহিনি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, স্বপ্নের আড়ালে কত বড় মরণফাঁদ পেতে রেখেছে লিবিয়ার মাফিয়ারা।