ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

স্বপ্নকে জয় করার জেদ

প্রবাসে অভিবাসীর সংগ্রাম

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: মে ৪, ২০২৬, ০৬:৫০ এএম

প্রবাস জীবনের প্রতিটি ধাপে থাকে স্বপ্ন আর সংগ্রামের এক অম্লমধুর আখ্যান। দেশ ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমানো একজন সাধারণ তরুণের অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প এটি। আশরাফুল ইসলাম হাসিবের জীবন আজ লন্ডনের ব্যস্ততার সঙ্গে মিশে গেছে। কিন্তু কয়েক বছর আগে যখন তিনি ঢাকা থেকে হিথ্রো বিমানবন্দরে নেমেছিলেন, তখন চারপাশটা ছিল একদম অচেনা, কুয়াশায় ঢাকা আর ভীষণ কনকনে ঠান্ডা। সেই হাসিবের চোখ দিয়ে আজ আমরা দেখবÑ বিদেশের মাটিতে পা রেখে একজন প্রবাসী কীভাবে প্রতিকূলতা জয় করে নিজের পায়ের নিচের মাটি শক্ত করেন।  বিস্তারিত জানাচ্ছেন লন্ডন প্রবাসী আশরাফুল ইসলাম হাসিব

নতুন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়া

লন্ডনে নামার পর প্রথম যে ধাক্কাটা হাসিব খেয়েছিলেন, সেটা হলো আকাশ-পাতাল সাংস্কৃতিক তফাত। হাসিব বলেন, ‘প্রথমেই বুঝলাম, আমার দেশি চালচলন বা কথা বলার ধরন এখানে চলবে না। এখানকার আবহাওয়া যেমন অনিশ্চিত, মানুষের জীবনযাত্রাও তেমনি ঘড়ি ধরে চলে। আমি শুরুতে পথ হারিয়ে ফেলতাম, ট্রেনের ম্যাপ বুঝতাম না। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। প্রতিদিন নতুন নতুন রাস্তা চিনেছি, মানুষের হাঁটাচলা পর্যবেক্ষণ করেছি। এই অভিযোজন ক্ষমতাটাই একজন প্রবাসীকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করে।’

ভাষাগত দেয়াল ও যোগাযোগের সাহস

বইয়ের ইংরেজি আর নেটিভ ব্রিটিশদের বলার ভঙ্গি একদম আলাদা। হাসিবের ভাষায়, ‘শুরুতে যখন কেউ কথা বলত, আমি শুধু তাকিয়ে থাকতাম। কিন্তু আমি বুঝলাম, টিকে থাকতে হলে লজ্জা ঝেড়ে ফেলতে হবে। আমি ভুল ইংরেজিতেই সাহস করে কথা বলা শুরু করলাম। বাসে, সুপারশপে বা কর্মক্ষেত্রেÑ যোগাযোগটাই ছিল আমার প্রথম ‘সারভাইভাল স্কিল’। আজ আমি অনর্গল কথা বলতে পারি, কিন্তু তার পেছনে ছিল হাজারো ভুল করার সেই দিনগুলো।’

ঋণের বোঝা ও ত্যাগের দিনলিপি

বাংলাদেশ থেকে বিদেশ যাওয়ার পেছনে প্রায় প্রতিটি মানুষের থাকে বড় অঙ্কের ঋণের গল্প। হাসিবের ক্ষেত্রেও তাই ছিল। ‘জমি বন্ধক রাখা আর স্বজনদের থেকে নেওয়া ধারের সেই বোঝাটা পাহাড়ের মতো ভারী লাগত। প্রথম দুই-তিন বছর আমার কোনো শখ ছিল না, রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাওয়ার আয়েশ ছিল না। আমার প্রতিটি দিনের লক্ষ্য ছিল একটাইÑ কঠোর পরিশ্রম করে আগে দেনামুক্ত হওয়া। প্রবাসে প্রথম কয়েক বছর আসলে নিজের জন্য নয়, দেনা শোধ আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্যই লড়তে হয়।’

একাকিত্ব ও মানসিক লড়াই

পরিবার ছেড়ে হাজার মাইল দূরে থাকার কষ্টটা কেবল একজন প্রবাসই অনুভব করতে পারেন। হাসিব বলেন, ‘শুরুতে যখন ভিডিও কলে আম্মা-আব্বাকে দেখতাম, বুকটা ফেটে যেত। বিশেষ করে ঈদের দিনগুলোতে যখন দেখতাম সবাই নতুন জামা পরে একসঙ্গে খাচ্ছে আর আমি এখানে কিচেনে বা শপে একলা ডিউটি করছি, তখন মনে হতো সব ছেড়ে চলে যাই। কিন্তু আমি নিজেকে বুঝিয়েছিÑ আমি এখানে এসেছি সবার স্বপ্ন পূরণ করতে। এই মানসিক লড়াইটা জেতা খুব জরুরি।’

‘কমিউনিটি’ই যখন নতুন পরিবার

একাকিত্ব দূর করতে হাসিব খুঁজে নিলেন নিজের দেশের মানুষদের। ‘এখানকার বাংলাদেশি কমিউনিটি, স্থানীয় মসজিদ আর বাঙালি পরিচিতরাই আমার নতুন পরিবার হয়ে উঠল। কারো অসুখে পাশে দাঁড়ানো বা ছুটির দিনে একটু আড্ডা দিয়ে দেশি খাবার খাওয়াÑ এগুলোই আমাকে প্রবাসে মানসিকভাবে সুস্থ রেখেছিল। প্রবাসীদের জন্য একে অপরের পাশে দাঁড়ানোটা বেঁচে থাকার রসদ।’

দক্ষতা অর্জন : শূন্য থেকে শিখর

হাসিবের প্রবাস জীবনের মূল দর্শন হলোÑ “বিদেশে আপনার ডিগ্রির চেয়ে আপনার ‘স্কিল’ বা হাতেনাতে কাজ জানাটা বেশি দামি। আমি দেশ থেকে মাস্টার্স করে এলেও লন্ডনে এসে ড্রাইভিং শিখেছি, রান্নার কাজ রপ্ত করেছি, এমনকি ইলেকট্রিক কাজের ছোটখাটো কোর্সও করেছি। কোনো কাজকেই আমি ছোট মনে করিনি। আজ আমি যে ভালো পজিশনে আছি, তার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল সেই শুরুর দিকের কাজগুলোই।”

খরচের লাগাম ও রেমিট্যান্সের গুরুত্ব

অনেকেই প্রথম কয়েক মাসের বেতন পেয়েই দামি ফোন বা গ্যাজেট কেনেন। হাসিবের পরামর্শÑ ‘প্রথম তিন বছর আপনার খরচ হওয়া উচিত একদম হিসাব করে। কারণ এই সময়টা আপনার ভিত্তি গড়ার সময়। মনে রাখবেন, আপনার পাঠানো একেকটা টাকা দেশে আপনার পরিবারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করছে। আমি সবসময় বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছি, যা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি আমাকেও আইনিভাবে নিরাপদ রেখেছে।’

বৈধতা ও ব্রিটিশ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা

বিদেশে আপনার সবচেয়ে বড় সুরক্ষা হলো আপনার ‘কাগজ’ বা লিগ্যাল স্ট্যাটাস। হাসিবের মতে, ‘অনেকে বেশি আয়ের আশায় দালালের খপ্পরে পড়ে ইলিগ্যাল হয়ে যান। এটি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। আমি সবসময় নিয়ম মেনেছি, সময়মতো ট্যাক্স দিয়েছি এবং ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের সব কাজ ঠিক রেখেছি। আজকের এই স্থায়ী বসবাসের সুযোগ (চবৎসধহবহঃ জবংরফবহপু) আমার সেই নিরবচ্ছিন্ন আইনি স্বচ্ছতারই পুরস্কার।’

প্রবাস মানেই সফলতার হাতছানি

আশরাফুল ইসলাম হাসিবের এই গল্প আসলে এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি প্রবাসীর প্রতিচ্ছবি। শুরু সেই কনকনে ঠান্ডা আর একাকিত্ব জয় করে হাসিব আজ একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষ। তার মতে: ‘বিদেশের মাটি যেমন পাথরের মতো কঠিন, তেমনি এখানে শ্রম দিলে তা সোনার মতো উর্বর। যদি আপনি ধৈর্য, সততা আর পরিশ্রমের বীজ বপন করতে পারেন, তবে সফলতার ফসল আপনি ঘরে তুলবেনই।’

পরামর্শ

স্বপ্ন দেখুন বিশাল, কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে দাঁড় করানোর জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে তবেই প্রবাসে পা দিন। মনে রাখবেন, বিদেশের রাস্তাগুলো সবসময় মসৃণ নয়, কিন্তু আপনার জেদ থাকলে গন্তব্যটা অবশ্যই সুন্দর হবে। নিজেকে ভালোবাসুন, নিজের দেশের সম্মান রক্ষা করুন। ধৈর্য ধরুন, পরিশ্রম করুন; এই প্রবাস আপনাকে কখনো খালি হাতে ফেরাবে না।