× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

প্রবাস প্রতিবেদক

প্রকাশিত: মে ৪, ২০২৬, ০৬:৫২ এএম

স্বপ্নের অপমৃত্যু

এক যুগে হাজার প্রবাসীর কফিন আর বেঁচে থাকার লড়াই

প্রবাস প্রতিবেদক

প্রকাশিত: মে ৪, ২০২৬, ০৬:৫২ এএম

এক যুগে হাজার প্রবাসীর কফিন  আর বেঁচে থাকার লড়াই

বাংলাদেশি অর্থনীতির প্রাণভোমরা বলা হয় প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সকে। কিন্তু এই রেমিট্যান্সের প্রতিটি ডলারের পেছনে লুকিয়ে আছে এক একটি বিষাদময় গল্প। ভাগ্য বদলানোর এক বুক আশা নিয়ে প্রতিবছর কয়েক লাখ বাংলাদেশি পাড়ি জমান ভিনদেশে। কিন্তু সেই স্বপ্নের গন্তব্য অনেকের জন্যই শেষ ঠিকানা হয়ে দাঁড়ায়। গত এক দশকের পরিসংখ্যান এক ভয়াবহ ও করুণ চিত্র তুলে ধরেছে এক যুগেই ৪২ হাজার ৩২৭ জন প্রবাসী শ্রমিকের নিথর দেহ ফিরেছে মাতৃভূমিতে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্যমতে, গত এক দশকে লাশের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে।  ২০২৪ সালেই ৪ হাজার ৮১৩ জন প্রবাসীর মরদেহ দেশে এসেছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০টি মরদেহ দেশে আসে। গত ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই সংখ্যা ৪২ হাজার ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ জন প্রবাসী লাশ হয়ে ফিরছেন।

কেন মরছে তরুণেরা? মৃত্যুর নেপথ্য কারণ

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মৃতদের মধ্যে একটি বড় অংশই তরুণ এবং মধ্যবয়সি। বিমানবন্দরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মৃত্যুর প্রধান কারণগুলো হলো:

মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ : মৃত প্রবাসীদের প্রায় ৫৬ শতাংশই মারা যান ব্রেন স্ট্রোকে। তরুণ বা মধ্যবয়সি শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এটি এক অস্বাভাবিক বিষয়।

হৃদরোগ : ২০ শতাংশ মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত গরম থেকে হঠাৎ এসির ঠান্ডায় আসা বা দীর্ঘ সময় পানিশূন্যতায় থাকা হার্টের ওপর প্রচ- চাপ সৃষ্টি করে।

প্রতিকূল পরিবেশ ও অমানুষিক পরিশ্রম : মধ্যপ্রাচ্যের মরু আবহাওয়ায় প্রচ- গরমে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয় অনেক অদক্ষ শ্রমিককে। এই অতিরিক্ত শারীরিক চাপ শরীর সহ্য করতে পারে না।

মানসিক চাপ ও নিঃসঙ্গতা : জমি বিক্রি বা ঋণ করে বিদেশে যাওয়ায় কিস্তি শোধের চিন্তা, পরিবারের থেকে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা এবং প্রবাস জীবনের একাকিত্ব থেকে তৈরি হওয়া মানসিক চাপ স্ট্রোকের অন্যতম বড় কারণ।

অস্বাস্থ্যকর আবাসন : একটি ছোট ঘরে

গাদাগাদি করে ১০-১২ জন থাকা এবং পুষ্টিকর খাবারের অভাব তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

প্রবাসে জীবন বাঁচাতে করণীয় কি

প্রবাসে কেবল হাড়ভাঙা খাটুনি দিলে চলবে না, নিজের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। হাসিবের মতো সফল হতে এবং সুস্থ শরীরে দেশে ফিরতে নিচের বিষয়গুলো অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা প্রয়োজন:

পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুমের ভারসাম্য

টাকা উপার্জনের নেশায় ওভারটাইম করা প্রবাসীদের সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু টানা ১২-১৮ ঘণ্টা কাজ করা শরীরের জন্য আত্মঘাতী। শরীরকে রিকভারি করার সময় দিতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ৬-৭ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম মস্তিষ্ক ও হৃৎযন্ত্রকে সচল রাখে এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি ৫০% পর্যন্ত কমিয়ে দেয়।

তীব্র গরম ও পানিশূন্যতা থেকে সাবধান

মরু অঞ্চলের প্রচ- গরমে কাজ করার সময় শরীর থেকে প্রচুর লবণ ও পানি বেরিয়ে যায়। একে ‘হিট স্ট্রোক’ বা ডিহাইড্রেশন বলে। কাজের ফাঁকে প্রচুর পানি পান করতে হবে। সম্ভব হলে ওরস্যালাইন বা লেবুর শরবত পান করা উচিত যাতে শরীরে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় থাকে।

তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তন এড়িয়ে চলা

বাইরে যখন তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তখন হঠাৎ করে তীব্র এসি রুমে ঢুকে পড়া বা ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করা হার্টের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। বাইরে থেকে এসে কিছুক্ষণ স্বাভাবিক তাপমাত্রায় বিশ্রাম নিয়ে শরীর ঠান্ডা হওয়ার পর এসি চালানো বা গোসল করা উচিত।

খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা

অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার এবং রেড মিট (গরু বা খাসির মাংস) এড়িয়ে চলতে হবে। নিয়মিত রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা করানো জরুরি। উচ্চ রক্তচাপের সামান্য লক্ষণ দেখা দিলে স্থানীয় ক্লিনিকে পরামর্শ নিতে হবে। মনে রাখবেন, প্রবাসে চিকিৎসা ব্যয়বহুল হলেও এটি আপনার জীবনের চেয়ে মূল্যবান নয়।

মানসিক স্বাস্থ্যের যতœ ও যোগাযোগ

ঋণের বোঝা বা পারিবারিক সমস্যার চাপে প্রবাসীরা অধিকাংশ সময় বিষণœতায় ভোগেন। এই মানসিক চাপ একা সহ্য না করে নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা এবং বিশ্বস্ত বন্ধুদের সঙ্গে মনের কথা শেয়ার করা উচিত। কমিউনিটির মানুষের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা মানসিক প্রশান্তি দেয়।

রাষ্ট্রীয় ও দূতাবাস পর্যায়ের পদক্ষেপ

প্রবাসীদের অকাল মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে রাষ্ট্রীয় গবেষণার পাশাপাশি প্রতিটি দেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোতে নিয়মিত ‘হেলথ ক্যাম্প’ ও ‘মানসিক কাউন্সেলিং’ চালু করা এখন সময়ের দাবি। এ ছাড়াও বিমা সুবিধা নিশ্চিত করা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা জরুরি।

রেমিট্যান্সের চাকা সচল রাখা প্রবাসীরা আমাদের দেশের গর্ব। কিন্তু কফিনের এই দীর্ঘ মিছিল আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, তাদের জীবনের নিরাপত্তা আজও অবহেলিত। সচেতনতা এবং সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই পারে এই অকাল মৃত্যুর মিছিল থামাতে। আপনার পরিবার আপনার পাঠানো টাকার চেয়ে আপনার সুস্থ শরীরের ফেরার অপেক্ষায় বেশি উন্মুখ। তাই আগে জীবন, তারপর জীবিকা।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!