বিদেশের মাটিতে পা রাখার পর বিমানবন্দর থেকে যখন একজন প্রবাসী বেরিয়ে আসেন, তখন তার চোখে থাকে রঙিন স্বপ্ন আর বুকভরা আশা। কিন্তু সেই ঝলমলে শহরের আকাশচুম্বী দালান আর সাজানো রাস্তার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় এক দীর্ঘশ্বাস মেশানো যাপিত জীবন। প্রবাস জীবন মানে কেবল রেমিট্যান্স বা দামি উপহার নয়; প্রবাস জীবন মানে এক অসম লড়াই, যেখানে প্রতিনিয়ত নিজেকে হারিয়ে অন্যকে ভালো রাখার চেষ্টা চলে। প্রবাস জীবনের সেই সংগ্রামী গল্প শোনাচ্ছেন প্রবাসী আশরাফুল ইসলাম হাসিব
স্বপ্নের পেছনে দৌড়ানো এক যান্ত্রিক জীবন
প্রবাস জীবনের প্রথম এবং প্রধান বাস্তবতা হলোÑ এর তীব্র ব্যস্ততা। এখানে সময়ের মূল্য আক্ষরিক অর্থেই টাকা। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শুরু হয় দিন। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে হাড়ভাঙা খাটুনি। দেশে থাকতে যারা এক গ্লাস পানি ঢেলে খেতে অভ্যস্ত ছিলেন না, প্রবাসের মাটিতে তাদেরকেই নিজের রান্না, কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে ঘরের যাবতীয় কাজ একা হাতে সামলাতে হয়। এই যান্ত্রিকতা মানুষকে স্বাবলম্বী করে ঠিকই, কিন্তু কেড়ে নেয় মনের ভেতরের সেই সহজ-সরল মানুষটিকে। এখানে অবসরের সুযোগ নেই, কারণ প্রতিটি অলস মুহূর্ত মানেই আয়ের ক্ষতি।
একাকিত্বের নীল দংশন
বিদেশের মাটিতে সবচেয়ে বড় শত্রুর নাম হলোÑ ‘একাকিত্ব’। চারদিকে হাজারো মানুষের ভিড় থাকলেও দিনশেষে প্রবাসীরা বড্ড একা। নিজের ভাষা, নিজের সংস্কৃতি আর আপনজনদের সান্নিধ্য ছাড়া জীবনটা যেন নুন ছাড়া তরকারির মতো পানসে হয়ে যায়। অসুস্থতার সময় যখন মাথার কাছে জলপট্টি দেওয়ার মতো কেউ থাকে না, তখন বিদেশের সেই দামি অ্যাপার্টমেন্টকেও মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে নির্জন কারাগার। উৎসবের দিনগুলোতে এই হাহাকার আরও বাড়ে। ঈদের নামাজ পড়ে যখন একজন প্রবাসী ঘরে ফিরে দেখেন তার জন্য অপেক্ষা করার কেউ নেই, তখন ডুকরে কেঁদে ওঠা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। অথচ সেই মানুষটিই ভিডিও কলে বাড়িতে ফোন করে হাসিমুখে বলেন, ‘আমি খুব ভালো আছি, অনেক আনন্দ করছি।’
মুদ্রার দুই পিঠ : সম্মান বনাম শ্রম
প্রবাসীদের পাঠানো টাকায় দেশে অট্টালিকা গড়ে ওঠে, ভাই-বোনেরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়, বাবা-মা পায় উন্নত চিকিৎসা। সামাজিকভাবে প্রবাসীর পরিবার অনেক উঁচুতে অবস্থান করে। কিন্তু এই সম্মানের পেছনে প্রবাসীর শ্রমের গল্পটা অনেক সময় করুণ। অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষও বিদেশের মাটিতে জীবন ধারণের জন্য রেস্টুরেন্টে ডিশ ওয়াশার, ক্লিনার কিংবা কঠোর কায়িক শ্রমের কাজ বেছে নিতে বাধ্য হন। যে মানুষটি দেশে বড় কোনো পদে বসার যোগ্যতা রাখতেন, তাকেও হয়তো বিদেশের কোনো সুপারশপে ট্রলি ঠেলতে হয়। এই যে আত্মপরিচয়ের সংকট, এটি মানসিকভাবে একজন মানুষকে কুরে কুরে খায়। কিন্তু পরিবারের সুখের কথা ভেবে তারা এই কষ্ট মুখ বুজে সহ্য করেন।
না পাওয়ার আক্ষেপ ও চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ
প্রবাস জীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা হলোÑ আপনজনদের থেকে দূরে থাকা। সন্তানের বেড়ে ওঠা দেখা হয় না, বাবার শেষ বিদায়ের সময় পাশে থাকা যায় না, কিংবা মায়ের অসুস্থতায় সেবা করা সম্ভব হয় না। অনেক প্রবাসী বছরের পর বছর দেশে যেতে পারেন না শুধু পাসপোর্টের জটিলতা বা অতিরিক্ত খরচের আশঙ্কায়। ফোনের ওপারে প্রিয়জনের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর যে তীব্র যন্ত্রণা, তা পৃথিবীর কোনো মাপকাঠি দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। এই অপরাধবোধ আর আক্ষেপ অনেক প্রবাসীকে সারাজীবন দগ্ধ করে। তারা পরিবারের জন্য টাকা পাঠান ঠিকই, কিন্তু নিজের অনুপস্থিতির শূন্যতা কোনো টাকা দিয়ে পূরণ করা যায় না।
প্রবাসীদের মনস্তাত্ত্বিক চাপ
একজন প্রবাসীকে সবসময় কয়েক ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়:
আর্থিক চাপ : প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেশে পাঠানোর বাধ্যবাধকতা।
পরিবারের প্রত্যাশা : পরিবারের চাহিদা দিন দিন বাড়তেই থাকে, যা মেটাতে প্রবাসী নিজেকে বিলিয়ে দেন।
বৈষম্য ও বর্ণবাদ : অনেক সময় বিদেশের মাটিতে বর্ণবাদ বা বৈষম্যের শিকার হতে হয়, যা প্রকাশ করার মতো কোনো জায়গা থাকে না।
প্রাপ্তি ও বিসর্জনের সমীকরণ
তবে প্রবাস জীবন মানেই যে শুধু অন্ধকার, তা নয়। প্রবাস জীবন একজন মানুষকে লড়াকু হতে শেখায়। প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার শক্তি জোগায়। একজন প্রবাসী যখন তার রেমিট্যান্সের টাকায় নিজের ছোট ভাই বা বোনকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখেন, কিংবা নিজের জমানো টাকায় বাবা-মাকে হজে পাঠান, তখন তার সমস্ত কষ্ট এক নিমেষে মুছে যায়। এই পরম তৃপ্তিই তাদের বেঁচে থাকার রসদ।
প্রবাস জীবন হলো এক নিঃশব্দ আত্মত্যাগের মহাকাব্য। এটি এমন এক জীবন যেখানে মানুষটি বিদেশে থাকলেও তার আত্মাটা পড়ে থাকে দেশের মেঠো পথে। তারা আমাদের অর্থনীতির মেরুদ-, তারা আমাদের গর্ব। কিন্তু আমাদের মনে রাখা উচিত, প্রবাসীরা কেবল ‘টাকা বানানোর মেশিন’ নন। তাদেরও আবেগ আছে, তাদেরও ক্লান্তি আছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স যেমন দেশের চাকা সচল রাখে, তেমনি তাদের প্রতি আমাদের একটু সহমর্মিতা আর ভালোবাসা তাদের কঠিন জীবনকে কিছুটা হলেও সহজ করে তুলতে পারে।
প্রবাসের সেই ঝকঝকে জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘশ্বাসগুলো যদি আমরা অনুধাবন করতে পারতাম, তবে হয়তো আমরা তাদের ত্যাগের সঠিক মর্যাদা দিতে শিখতাম। দিনশেষে প্রতিটি প্রবাসীর স্বপ্ন একটাইÑ সব গুছিয়ে একদিন নিজের শেকড়ে ফিরে আসা।
সেই ফেরার প্রতীক্ষাতেই কেটে যায় হাজারো বিনিদ্র রজনী।

