ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

আমিরাতে গোল্ডেন ভিসার আদ্যোপান্ত

মিনহাজুর রহমান নয়ন
প্রকাশিত: মে ১১, ২০২৬, ০৬:০৮ এএম

সংযুক্ত আরব আমিরাত বা টহরঃবফ অৎধন ঊসরৎধঃবং বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও বিনিয়োগ কেন্দ্র। উন্নত জীবনযাত্রা, আধুনিক অবকাঠামো, করমুক্ত আয় এবং নিরাপদ পরিবেশের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস ও কাজ করার আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

এই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘গোল্ডেন ভিসা’। এটি এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি আবাসন সুবিধা, যার মাধ্যমে বিদেশিরা দীর্ঘ সময় ধরে আমিরাতে বসবাস, কাজ, ব্যবসা ও বিনিয়োগের সুযোগ পান।

বিশেষ করে উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, মেধাবী শিক্ষার্থী ও দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য এই ভিসা নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।

গোল্ডেন ভিসা কী

গোল্ডেন ভিসা হলোÑ আমিরাত সরকারের দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি রেসিডেন্সি ভিসা। সাধারণত ৫ বছর বা ১০ বছরের জন্য এই ভিসা দেওয়া হয় এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে এটি নবায়নযোগ্য। আগে আমিরাতে বসবাসের জন্য কোনো কোম্পানি বা নিয়োগদাতার স্পন্সর প্রয়োজন হতো। কিন্তু গোল্ডেন ভিসার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই নিজস্ব স্পন্সরশিপ ছাড়াই দীর্ঘমেয়াদে বসবাস করা সম্ভব হয়।

এই ভিসাধারীরা পরিবারসহ আমিরাতে বসবাস করতে পারেন এবং ব্যবসা, চাকরি বা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন।

কেন চালু করা হয় গোল্ডেন ভিসা

আমিরাত সরকার মূলত দক্ষ জনশক্তি, বিনিয়োগকারী ও প্রতিভাবান ব্যক্তিদের আকৃষ্ট করার জন্য গোল্ডেন ভিসা চালু করে।

বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে দেশটি দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগ ও মেধাবী কর্মীদের ধরে রাখতে চায়।

এ ছাড়া প্রযুক্তি, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্যবসা ও সৃজনশীল খাতকে এগিয়ে নিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়।

কারা গোল্ডেন ভিসা পেতে পারেন

বিনিয়োগকারী

যারা আমিরাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেন বা সম্পত্তি ক্রয় করেন তারা গোল্ডেন ভিসার জন্য আবেদন করতে পারেন।

বিশেষ করে রিয়েল এস্টেট খাতে বিনিয়োগকারীদের জন্য এই ভিসা বেশ জনপ্রিয়।

উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী

স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতা বা সফল ব্যবসায়ীরা গোল্ডেন ভিসার আওতায় আবেদন করতে পারেন। যেসব উদ্যোক্তার ব্যবসা উদ্ভাবনী বা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও দক্ষ পেশাজীবী

চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, আইটি বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, গবেষক এবং উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবীদের জন্যও গোল্ডেন ভিসার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে দক্ষ জনশক্তিকে আমিরাত বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

মেধাবী শিক্ষার্থী

উচ্চ ফলাফল অর্জনকারী শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটরাও গোল্ডেন ভিসার সুযোগ পেতে পারেন।

বিশ্বমানের মেধাবীদের আমিরাতে ধরে রাখার জন্য এই সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

শিল্পী ও সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব

সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, মিডিয়া ও সৃজনশীল খাতে বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তিদের জন্যও গোল্ডেন ভিসা চালু রয়েছে।

গোল্ডেন ভিসার সুবিধা

দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের সুযোগ

সাধারণ ভিসার তুলনায় গোল্ডেন ভিসা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা দেয়। ৫ বা ১০ বছর পর্যন্ত বসবাসের সুযোগ থাকায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা সহজ হয়।

পরিবারের সদস্যদের স্পন্সর করা যায়

ভিসাধারীরা স্ত্রী, সন্তান এবং কিছু ক্ষেত্রে বাবা-মাকেও স্পন্সর করতে পারেন। এতে পরিবার নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করা সহজ হয়।

ব্যবসা ও চাকরির স্বাধীনতা

গোল্ডেন ভিসাধারীরা ব্যবসা পরিচালনা বা চাকরি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি স্বাধীনতা পান। নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভরশীলতা কম থাকায় পেশাগত সুযোগও বাড়ে।

করমুক্ত আয়ের সুবিধা

আমিরাতে ব্যক্তিগত আয়ের ওপর কর নেই। ফলে অনেক পেশাজীবী ও উদ্যোক্তা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হন।

উচ্চমানের জীবনযাত্রা

উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, নিরাপদ পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো গোল্ডেন ভিসাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

আবেদন প্রক্রিয়া

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

গোল্ডেন ভিসার জন্য সাধারণত প্রয়োজন হয়- বৈধ পাসপোর্ট, ছবি, শিক্ষাগত বা পেশাগত সনদ, বিনিয়োগের প্রমাণপত্র, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, স্বাস্থ্য পরীক্ষা রিপোর্ট, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স।

কোন ক্যাটাগরিতে আবেদন করা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে কাগজপত্র ভিন্ন হতে পারে।

অনলাইনে আবেদন

বর্তমানে বেশিরভাগ আবেদন অনলাইনের মাধ্যমে করা যায়। আমিরাতের সরকারি ইমিগ্রেশন ও রেসিডেন্সি পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন জমা দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদনের আগে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই করা হয়।

খরচ

গোল্ডেন ভিসার খরচ আবেদনকারীর ক্যাটাগরি, ভিসার মেয়াদ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ফি অনুযায়ী ভিন্ন হয়।

এ ছাড়া স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মেডিকেল ইন্স্যুরেন্স ও কাগজপত্র প্রসেসিংয়ের জন্যও অতিরিক্ত খরচ হতে পারে।

বাংলাদেশিদের আগ্রহ কেন বাড়ছে

বাংলাদেশ থেকে অনেক উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও দক্ষ পেশাজীবী এখন গোল্ডেন ভিসার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। বিশেষ করে যারা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি বা উন্নত জীবনযাত্রা চান তাদের কাছে এটি আকর্ষণীয়।

অনেকে রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগের মাধ্যমেও গোল্ডেন ভিসা পাওয়ার চেষ্টা করছেন।

সতর্কতা ও সচেতনতা

ভুয়া এজেন্সি থেকে সাবধান

গোল্ডেন ভিসার নাম ব্যবহার করে অনেক প্রতারক চক্র সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। অতিরিক্ত টাকা নিয়ে ভুয়া প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। তাই সরকারি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোথাও অর্থ লেনদেন করা উচিত নয়।

নিয়ম-কানুন ভালোভাবে জানা জরুরি

গোল্ডেন ভিসার শর্ত সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সরকারি ওয়েবসাইট বা অনুমোদিত সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে আমিরাত আরও বেশি দক্ষ কর্মী ও বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করতে গোল্ডেন ভিসা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবেশবান্ধব খাতে দক্ষদের জন্য সুযোগ আরও বাড়তে পারে।

আমিরাতের গোল্ডেন ভিসা শুধু একটি আবাসন সুবিধা নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার, ব্যবসা ও উন্নত জীবন গড়ার একটি সুযোগ। দক্ষ পেশাজীবী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য এই ভিসা নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। তবে আবেদন করার আগে সঠিক তথ্য জানা, সরকারি নিয়ম অনুসরণ করা এবং প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।