ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের আত্মপরিচয়ের প্রতীক হলোÑ কমিউনিটির আজকের অগ্রজরা। বিলেতের মাটিতে এসব অগ্রজদের অধিকাংশ সময় কাটিয়ে আসছেন সুখে-দুঃখে-স্বপ্নে-সাফল্যের মধ্যে দিয়ে। আমাদের পূর্বসূরিদের বিলেতের মাটিতে অচেনা দেশ আর অজানা মানুষের ভিড়ে বৈরী পরিবেশের মধ্যে তাদের সংগ্রামটা ছিল শুধু বেঁচে থাকারই নয়। সম্মানের সঙ্গে তাদের উত্তরসূরিদের নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তারা কমিউনিটিতে কত যে লড়াই-সংগ্রাম করেছিলেন তার অনেকটাই আমাদের অজানা রয়ে গেছে। তাদের নিরন্তন প্রচেষ্টা আর শ্রমেই এই ব্রিটেনের বুকে আজকে গড়ে উঠেছে একটি ছোট্ট স্বদেশ। যারা যুগ যুগ ধরে এই কমিউনিটির গৌরবময় ইতিহাস বিনির্মাণ করেছেন তাদেরই একজন হলেনÑ মোহাম্মদ মনছব আলী জেপি।
পেশায় একজন প্রকৌশলী হলেও তিনি ইউ.কে তে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ ইংল্যান্ডের প্রবাসীদের মধ্যে এক উৎসর্গিত প্রাণ, সংগঠন, সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল কাজের সফল উদ্যোক্তা হিসেবে বিরল সাফল্যের অধিকারী মোহাম্মদ মনছব আলী জেপি। কমিউনিটিতে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০০২ সালে চেষ্টার অ্যান্ড এলেসমেয়ার পোর্ট এলাকার শান্তির বিচারপতি (সম্মানসূচক ম্যাজিস্ট্রেট) জেপি (ঔঁংঃরপব ঙভ চবধপব) নিয়োগ প্রাপ্ত হন। তিনি ব্রিটিশ সরকারের আইন মন্ত্রণালয়ের লর্ড চ্যান্সেলরের বিভাগ থেকে জেপি নিয়োগপ্রাপ্ত হন। বৃহত্তর সিলেটের আলোকিত পরিবারের এই মেধাবী সন্তান লেখালেখি ও সাংবাদিকতার পাশাপাশি আপাদমস্তক একজন সমাজসেবীও বটে। আশির দশকে বিলেতে বাঙালি কমিউনিটির অধিকার আদায়ে সামনের সারিতে যে কয়জন ছিলেন তাদের মধ্যে মনছব আলী জেপি ছিলেন অন্যতম একজন। বিশেষ করে বর্ণবাদীবিরোধী আন্দোলন, মূল ধারার রাজনীতিতে কমিউনিটির তরুণদের অংশগ্রহণে উদ্ধুদ্ব করণসহ বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে ও তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। দূরপ্রবাস থেকে ও তিনি বাংলাদেশের মাটি ও মানুষকে নিয়ে চিন্তার অন্ত নেই। স্বদেশপ্রেমী এই মানুষটি অবিরাম ও ক্লান্তহীন কর্মের মাধ্যমে তৈরি করেছেন সৃষ্টিশীল এক ইতিহাস। আমার কাছে এক কথায় বলতে হলে বলব এই কমিউনিটির একজন পরিশ্রমী নিভৃতচারীর নাম মনছব আলী জেপি। তিনি এখনো নর্থ ইংল্যান্ডের বাঙালি কমিউনিটির এক পিতৃতুল্য ব্যক্তিত্ব। কমিউনিটির অগ্রযাত্রায় তার ভূমিকা কখনো ভুলার নয়। বিলেতের মাটিতে আলোকিত কমিউনিটি গড়ার অন্যতম পথিকৃৎ হলেনÑ তিনি। কমিউনিটির কল্যাণে আর মানুষের সেবায় যুগ যুগ ধরে সদা নিয়োজিত ছিলেন, এখনো আছেন, আগামীতে থাকবেন এমনটাই কমিউনিটির সকল মানুষের প্রত্যাশা।
প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনছব আলী জেপি একজন মানুষ যিনি দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনে একজন ক্লান্তিহীন, পরিশ্রমী, নিষ্ঠাবান, অধ্যবসায় ও অনুকরণীয় এক সফল দৃষ্টান্তের অধিকারী ব্যক্তিত্ব। তিনি সবসময় বিশ^াস করেন ব্রিটেনে নিজেদের অবস্থানকে পাকাপোক্ত করতে হলে মূলধারার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে এই প্রজন্মের অবস্থান সুসংহত করতে দীর্ঘ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এই কমিউনিটিকে একটি শক্তিশালী ভিত রচনার প্রয়াস চালিয়ে আসছেন যুগ যুগ ধরে। মনছব আলী জেপি তিনি নিজেও একজন আলোকিত মানুষ তিনি তার জন্মভূমি ও প্রবাসের মাটিতে এই প্রজন্মে জন্য ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। চেষ্টার শহরে শাহজালাল মসজিদের সঙ্গে জড়িত থেকে মুসলমানদের ধর্ম চর্চার অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টি করেন। একজন সফল সংগঠক, জনদরদী কমিউনিটির সেবক হিসেবে তার খ্যাতি সর্বজনবিদিত। বর্তমানে ‘চেষ্টার শাহজালাল ইসলামিক কালচারাল সেন্টার ও মসজিদ’ (ঈযবংঃবৎ ঝযধয ঔধষধষ ঔধসব গড়ংয়ঁব ধহফ ওংষধসরপ ঈঁষঃঁৎধষ ঈবহঃৎব)-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়াও তিনি নর্থ ওয়েলসের ‘ফ্লিন্টশায়ার মুসলিম কালচার সোসাইটি’ (ঋষরহঃংযরৎব গঁংষরস ঈঁষঃঁৎধষ ঝড়পরবঃু) এর মাধ্যমে ওই এলাকায় তরুণ মুসলিমদেও জন্য আরবি এবং ইসলামি সং¯স্কৃতি শেখানোর জন্য এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। যা এখনো সংগঠনটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
ব্রিটেনে বাংলাভাষা, বাংলা সংস্কৃতিচর্চার পথিকৃৎ হিসেবে যে কয়জনের ভূমিকা স্মরণযোগ্য তাদের মধ্যে থেকে মনছব আলী জেপি অনন্য একজন। তার নিজ শহরে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি তিনি এই কমিউনিটির তরুণ প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি তুলে ধরতে গড়েছেন বাংলা স্কুল। চেস্টার অ্যান্ড নর্থ ওয়েলসের বাংলাদেশিদের উন্নয়নে ১৯৯১ সালে ‘চেষ্টার নর্থ ওয়েলম বাংলাদেশি ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশন’ (ঘড়ৎঃয ডধষবং ইধহমষধফবংযর ণড়ঁঃয অংংড়পরধঃরড়হ) প্রতিষ্ঠা করেন যার সভাপতি হিসেবে এখনো কাজ করছেন। মূলত এই সংগঠনের মাধ্যমে অত্র এলাকার তরুণদের বিনোদনের জন্য বিভিন্ন শিক্ষামূলক কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন খেলাধুলায় আয়োজন করতেন। এরমধ্যে একসময় ফুটবল প্রতিযোগিতা ছিল খুবই জনপ্রিয় পরবর্তিতে এই প্রতিযোগিতাটি জাতীয় প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছিল।
একজন সফল উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী হিসেবে যেসব কৃতি ও গুণীজন দেশের ভাবমূর্তিকে প্রবাসের মাটিকে উজ্জ্বল আলোয় ভরিয়ে দিয়েছেন তাদেরই একজন হিসেবে আমাদের দৃষ্টিতে মনছব আলী জেপি অন্যন্য। কমিউনিটির মানুষকে নিয়ে তার স্বপ্নÑ এই প্রবাসী প্রজন্মের সুযোগ্য সন্তানেরা একদিন তাদের শিকড়ভূমি বাংলাদেশের পাশে গিয়ে দাঁড়াবে। তাদের জানাতে হবে মূল ধারার কথা। তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির কথা তোলে ধরার জন্য মনছব আলী জেপি দীর্ঘ সময় কমিউনিটিতে কাজ করে আসছেন। আমার দেখা প্রতিটি অনুষ্ঠানে তিনি আমাদের অভিভাবকদের অনুরোধ জানানÑ আগামী প্রজ¤œ যেন ঠিকমতো ধর্মীয় শিক্ষা আর নিজ শিকড় ভূমির প্রতি মনোযোগী হন।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মনছব আলী জেপি আমাদের গৌরব। প্রিয় মাতৃভূমি সিলেট থেকে ব্রিটেনে এসে সফল ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক হিসেবে কমিউনিটিতে উনার রয়েছে বিশেষ অবদান। যিনি তার স্বপ্নকে নিজের মধ্যে রাখেননি ছড়িয়ে দিয়েছেন কমিউনিটির সেবায়। শৈশব থেকেই মানবতা, দায়িত্ববোধ এবং সততার শিক্ষা ছিল তার জীবনের মূল ভিত্তি। মূলত: এগুলোকে পুঁজি করে তিনি এই কমিউনিটিতে গড়ে তুলেছেন আজকের সম্মানজনক এক অধ্যায়। ইংল্যান্ডে আমার প্রাণের মানুষদের একজন মনছব আলী জেপি। বিন¤্র স্বভাবের অত্যন্ত সদালাপি, হাস্যোজ্জ্বল একজন পরিতৃপ্ত ভদ্রমানুষ। তার কথা বলার দরদ দেখে আমি প্রথম থেকেই উনার প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় আবদ্ধ হয়ে পরি।
মনছব আলী জেপি ১৯৮২ সালে ইংল্যান্ড পাড়ি জমান। নিজেকে বদলানো আর নিজ মাতৃভূমি ও মানুষের জন্যে কিছু করা তার পাশাপাশি সংগ্রামকে সঙ্গী করে মূলত: ইংল্যান্ড পাড়ি দেন। শুরুর দিনগুলো তখন ততটা সহজ ছিল না। কিন্তু তিনি থামেননি। ধীরে ধীরে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে নিজের অবস্থান গড়ে তুলেছেন। একজন সফল সংগঠকের পাশাপাশি সফল ব্যবসায়ী হিসেবে ও তার খ্যাতি ব্রিটেনের সর্বত্র। প্রবাস জীবনের শুরুটা হয়েছিল রেস্টুরেন্টে কাজের মাধ্যমে। প্রথমে তিনি লন্ডনের বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট কাজ করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৮৫ সালে নিজের মালিকানাধীন রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। ১৯৮৮ সালে ‘বেঙ্গল ডাইনেস্টি’ নামের একটি রেস্টুরেন্ট চালু করেন। রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৯৯১ সালে নর্থ ওয়েলসের ডি সাইড এলাকায় একই নামের আরও একটি রেস্টুরেন্ট চালু করেন। কারি শিল্পের সফলতার প্রেক্ষিতে তিনি পরবর্তীতে নর্থ ওয়েলস অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেন। সেরা ভারতীয় বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট হিসেবে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি সম্মাননা অর্জন করেন। ২০০০-২০০২ সালে ‘গুড কারি গাইড’ কর্তৃক ‘বেস্ট রেস্টুরেন্ট ইন ওয়েলস’ হিসেবে তার প্রতিষ্ঠান মনোনীত হয়। তারপর থেকে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ কারি অ্যাওয়ার্ড অনেক বার অর্জন করেন।
ব্রিটেনের মূলধারার সঙ্গে কারি শিল্পকে গৌরবান্বিত প্রভাব বিস্তারকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আমাদের এই অগ্রজ। এই শিল্পের প্রতি আগ্রহ থেকে তিনি জওচঐঐ (জড়ুধষ ওহংঃরঃঁঃব ঙভ ঐবধষঃয ্ ঐুমরবহব) উরঢ়ষড়সধ-এর মাধ্যমে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। উনার মতো অনেকেই বাংলাদেশি গুণীজন এই কমিউনিটিতে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ ব্রিটেন ও বাংলাদেশেদের, অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রেখে গেছেন যুগ যুগ ধরে। মনছব আলী জেপি উনাদের মতো অগ্রজদের কর্মগুণের ফলেই ব্রিটেনের বহুজাতিক সংস্কৃতির মধ্যে আজকে আমাদের অবস্থান বদলানোর পাশাপাশি তারা বদলে দিয়েছিলেন ব্রিটিশ খাদ্যাভ্যাস। ফলে কারি শিল্প বর্তমানে ব্রিটেনের এক বিশ^াসযোগ্য স্থানে উঠে এসেছে।
বিলেতের বৃহত্তর সিলেটবাসীসহ সমগ্র বাংলাদেশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে মনছব আলী জেপি এই কমিউনিটিতে যুগ যুগ ধরে কাজ করে আসছেন আপন মনে। একজন উদ্যমী ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি তার স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটিয়ে আমাদের কমিউনিটিকে ক্রমাগত সামনের দিকে এগিয়ে যাবার পথ দেখিয়ে যাচ্ছেন। তাদের মতো অনেকেই আমাদের এই কমিউনিটিতে ত্যাগ স্বীকার করেই আজ বাংলাদেশ তথা ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের অবদানকে সারা বিশে^ জানান দিচ্ছেন। প্রতিভাদীপ্ত ওইসব অগ্রজদের কারণেই মূলত: ব্রিটিশ বাঙালি নতুন প্রজন্মদের এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে।
লেখক : সভাপতি, লিভারপুল বাংলা প্রেসক্লাব ইউ.কে লিভারপুল, ইংল্যান্ড

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন