× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মিনহাজুর রহমান নয়ন

প্রকাশিত: মে ২৫, ২০২৬, ০৫:৪২ এএম

আনন্দের ভিড়ে না পাওয়ার গল্প

মিনহাজুর রহমান নয়ন

প্রকাশিত: মে ২৫, ২০২৬, ০৫:৪২ এএম

আনন্দের ভিড়ে না পাওয়ার গল্প

ঈদের সকাল মানেই এক চিরন্তন আনন্দের আবহ। কিন্তু ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে এই আনন্দ যখন সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে কোনো প্রবাসী বাঙালির কড়া নাড়ে, তখন তার চিরচেনা রং অনেকটাই বদলে যায়। প্রবাসে ঈদের আনন্দ মানে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ যার একদিকে থাকে উৎসবের আমেজ, আর অন্যদিকে লুকিয়ে থাকে চেনা মানুষ, মা, মাটির গন্ধ আর ফেলে আসা শৈশবের জন্য এক বুক হাহাকার। দেশের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রতিবছরই প্রবাসীদের এই আকুলতার কথা উঠে আসে। বিশেষ করে কোরবানির ঈদে (ঈদুল আজহা) এই শূন্যতা যেন আরও একটু বেশি ভারী, আরও একটু বেশি আবেগঘন হয়ে ওঠে। যান্ত্রিক জীবনের নির্মম ব্যস্ততা আর বিদেশের কঠোর নিয়মের বেড়াজালে বন্দি থেকে প্রবাসীরা কীভাবে উদযাপন করেন তাদের এই ত্যাগের উৎসব। স্মৃতির ক্যানভাস আর বর্তমানের যান্ত্রিকতার মিশেলে তৈরি সেই বিস্তারিত কোলাজ নিয়েই এই আয়োজন।

অ্যালার্মের কর্কশ শব্দে ঈদের সকাল ও স্মৃতির হানা দেশে যেখানে ঈদের সকাল শুরু হয় মায়ের হাতের গরম সেমাই-জর্দার সুবাস, আতরের সুঘ্রাণ আর চেনা মসজিদের মাইকে ভেসে আসা “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার” ধ্বনিতে; প্রবাসে সেখানে অনেকেরই ঘুম ভাঙে ফোনের কর্কশ যান্ত্রিক অ্যালার্মে।

মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ ছাড়া ইউরোপ, আমেরিকা বা এশিয়ার বেশির ভাগ অমুসলিম প্রধান দেশেই ঈদের দিন কোনো সরকারি ছুটি থাকে না। ফলে ঈদের সকালে ঘুম থেকে উঠে উৎসবের আমেজ গায়ে মাখার চেয়ে, ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে দ্রুত তৈরি হওয়ার তাড়াটাই থাকে মুখ্য। অনেক সময় দেখা যায়, সকালে ঈদের নামাজ পড়ে এসে আধঘণ্টার মধ্যে ঈদের নতুন পাঞ্জাবিটা বদলে পরে নিতে হয় ফ্যাক্টরি, অফিস বা সুপারশপের কর্মক্ষেত্রের ইউনিফর্ম। এই যান্ত্রিকতার মাঝেই যখন কাজের ফাঁকে মনটা একটু থমকে দাঁড়ায়, তখনই হুড়মুড় করে বুকে এসে হানা দেয় দেশের বাড়ির সেই চেনা ঈদের স্মৃতিগুলো।

হাটের কোলাহল বনাম স্লটারহাউস

দেশে কোরবানি মানেই হলো ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই শুরু হওয়া এক মহোৎসব। হাটে গিয়ে দড়ি ধরে টেনে গরু কেনা, দাম নিয়ে বন্ধুদের সাথে তর্ক করা, আর ঈদের দিন সকাল থেকে বাড়ির উঠোনে বা চেনা গলিতে হইচই করে নিজেরা দাঁড়িয়ে থেকে মাংস কাটার তদারকি করা। পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে মাংস ভাগাভাগির সেই চিরন্তন সামাজিকতা প্রবাসে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। প্রবাসের কোরবানি অনেকটাই ছককাটা ও যান্ত্রিক।  বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে প্রবাসীরা এখন আর শুধু ফার্মে গিয়েই পশু খোঁজেন না। বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকায় বিভিন্ন অনুমোদিত অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ঘরে বসেই পশুর বয়স, ওজন দেখে পছন্দ করা যায় এবং ক্রেডিট কার্ডে অর্থ পরিশোধ করা যায়।

বিদেশের মাটিতে যেখানে-সেখানে পশু জবাই করা আইনত দ-নীয় অপরাধ। ফলে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে নির্দিষ্ট স্লটারহাউসে (জবাইখানা) কোরবানি দিতে হয়।  ঈদের দিন বা তার পরের দিন প্রবাসীদের নির্দিষ্ট বুথ বা কোল্ড স্টোরেজে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হয়। সেখান থেকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় নিখুঁতভাবে কাটা, রক্তহীন, পরিষ্কার হিমায়িত মাংসের একটি বা দুটি প্যাকেট। এই পুরো প্রক্রিয়ায় দেশের সেই চেনা ব্যস্ততা, গরুর হাটের কাদা-পানি আর মাংস কাটার চিরাচরিত আনন্দ-কোলাহল প্রবাসে একেবারেই পাওয়া যায় না।

ভিডিও কলের পর্দা ছাড়িয়ে ঈদ

এক দশক আগেও প্রবাসীদের ঈদ মানে ছিল এক মিনিটের একটা ভয়েস কল বা স্রেফ একটি বার্তা। কিন্তু বর্তমান উচ্চগতির ইন্টারনেট, স্মার্টফোন আর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে প্রবাসীদের ঈদের আসল প্রাণ লুকিয়ে থাকে মোবাইল বা ল্যাপটপের স্ক্রিনে।

এখন শুধু সাধারণ একটা ভিডিও কলই নয়, বরং ঈদের পুরো দিনটাই যেন কাটে লাইভ স্ট্রিমিংয়ে। নামাজ শেষ করে বা মাংসের প্যাকেট হাতে পেয়েই প্রথম কাজ হয় দেশের বাড়িতে ভিডিও কল দেওয়া। ফোনের ওপাশ থেকে যখন প্রশ্ন আসেÑ ‘‘বাবা, নামাজ পড়লে?’, ‘মা, এবার কী রান্না করলে?’ কিংবা ‘ভাইয়া, আমাদের গরুটা দেখলে?’ তখন এই একটা ফোনেই যেন প্রবাসী মন মুহূর্তের জন্য সীমান্ত পেরিয়ে নিজের বাড়ির ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসে। অনেকে তো ভিডিও কল চালু রেখেই দেশের বাড়ির মাংস কাটার দৃশ্য বা রান্নার তদারকি করেন। স্ক্রিনের ওপাশের প্রিয় মানুষগুলোর চেনা হাসি মুখ আর আনন্দ দেখে প্রবাসীরা নিজেদের একাকীত্ব ভুলে যান এবং ভার্চুয়ালি উৎসবের প্রতিটি মুহূর্তে জড়িয়ে থাকেন।

প্রবাসেই গড়ে ওঠে ছোট এক টুকরো বাংলাদেশ

মানুষ একা থাকতে পারে না, আর বাঙালি তো উৎসব ছাড়া বাঁচতেই পারে না। তাই শত ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর একাকীত্বের মাঝেও প্রবাসীরা চেষ্টা করেন নিজেদের মতো করে একটি চেনা পরিবেশ তৈরি করতে।

ঈদের দিন বিকেলে বা পরবর্তী কোনো ছুটির দিনে (উইকেন্ড) ব্যাচেলর কিংবা সপরিবারে থাকা প্রবাসীরা কোনো একজনের ফ্ল্যাটে বা কোনো পার্কে এক ছাদের নিচে জড়ো হন। প্রবাসের সেই আড্ডায় দেশি সংস্কৃতির এক অপূর্ব প্রতিফলন ঘটে। মেয়েরা কষ্ট করে হলেও দেশ থেকে আনা মসলা দিয়ে রাঁধেন খাসির মাংসের রেজালা, গরুর কালা ভুনা, চটপটি কিংবা ফিরনি। বসার ঘরে চলে দেশের গান, রাজনীতি আর ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতিতারণ। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে দেশি পোশাকে দলবদ্ধ ছবি আপলোড করে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানান। কিছুক্ষণের জন্য হলেও প্রবাসের সেই যান্ত্রিক শহরটি হয়ে ওঠে মিনি বাংলাদেশ। পরস্পরের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিয়ে তারা বুকের ভেতরের দেশের টানটাকে কিছুটা হলেও শান্ত রাখার চেষ্টা করেন।

দেশের জন্য ত্যাগ এবং প্রবাসীদের ঈদ উপহার

প্রবাসীদের ঈদের আরেকটি বড় দিক হলো নিজেরা উৎসব না করলেও দেশের মানুষের উৎসবকে রঙিন করে তোলা। ঈদের মাসখানেক আগে থেকেই প্রবাসীরা নিজেদের খরচ কমিয়ে দেশে বেশি করে রেমিট্যান্স বা টাকা পাঠাতে শুরু করেন।  নিজেরা হয়তো ঈদের দিন একটি সাধারণ টি-শার্ট পরে কাটিয়ে দেন, কিন্তু দেশে থাকা সন্তান, মা-বাবা বা ভাইবোনের জন্য সবচেয়ে ভালো পোশাক আর সবচেয়ে ভালো কোরবানি নিশ্চিত করতে তারা বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেন না। দেশের মানুষ যেন ঈদে ভালো খেতে পারে, ভালো পরতে পারে, এই চিন্তাই একজন প্রবাসীকে বিদেশের মাটিতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করার শক্তি জোগায়।

ত্যাগের আসল মহিমা যেখানে মিশে থাকে

ঈদুল আজহা বা কোরবানির মূল শিক্ষাই হলো ত্যাগ। প্রবাসের ঈদ হয়তো দেশের মতো অতটা রঙিন, কোলাহলপূর্ণ, আতশবাজি বা মেলাময় উৎসবমুখর হয় না। কিন্তু নিজের সুখ, আরাম, আহ্লাদ আর উৎসবের আনন্দকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়ে যারা মাইলের পর মাইল দূরে উষর মরুভূমিতে কিংবা বরফঢাকা কোনো শহরে প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য দিনরাত উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তাদের এই পুরো জীবনটাই তো এক প্রকা- কোরবানি (ত্যাগ)। তাই বাহ্যিক চাকচিক্য না থাকলেও, এই নীরব আত্মত্যাগ আর পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধের মাঝেই লুকিয়ে থাকে প্রবাসের ঈদের আসল সৌন্দর্য, গভীরতা ও মহিমা।

দেশ থেকে দূরে থাকলেও প্রতিটি প্রবাসীর হৃদয়ে স্পন্দিত হয় বাংলাদেশ, আর এটাই তাদের ঈদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!