× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

হাসিবুল ইসলাম

প্রকাশিত: মে ২৫, ২০২৬, ০৫:৪৫ এএম

পরবাসের আকাশেও ওড়ে ঈদের ঘুড়ি

হাসিবুল ইসলাম

প্রকাশিত: মে ২৫, ২০২৬, ০৫:৪৫ এএম

পরবাসের আকাশেও  ওড়ে ঈদের ঘুড়ি

মেশিনের মতো সাইরেন বাজিয়ে যখন অ্যালার্মটা বেজে উঠল, ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর চারটে। মে মাসের এই চিলতে শীতেও লন্ডনের ইলফোর্ডের ফ্ল্যাটটায় কুয়াশার একটা পাতলা চাদর লেপ্টে আছে। বিছানা ছেড়ে উঠতেই আরিফের বুকটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল। আজ ঈদের দিন। অথচ রান্নাঘর থেকে চেনা সুবাস আসছে না, মায়ের হাতের সেই চাটনি-সেমাইর সুঘ্রাণ নেই, নেই ছোট ভাইবোনের নতুন জামা নিয়ে কাড়াকাড়ির চেনা কোলাহল। কলতলার ঠান্ডা পানিতে ওজু করতে করতে আরিফ ভাবল, এই তো প্রবাসের ঈদ। নিয়মের ফ্রেমে বাঁধানো, অথচ এক বুক নস্টালজিয়ায় মোড়ানো।

পৃথিবীর মানচিত্রে দেশগুলো আলাদা, তাদের আইন আলাদা, যাপনের গতিও ভিন্ন। তাই লন্ডনের আরিফ, দুবাইয়ের শফিক, নিউ ইয়র্কের তানিয়া কিংবা টোকিওর সায়মনÑ সবার ঈদের সকালটা এক রকম হয় না। ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে তাদের আনন্দের রংটাও বদলে যায় দেশ ভেদে। আসুন, আজ কোনো নিয়মের বেড়াজালে বা পয়েন্টের খোপে না ফেলে, এক সুতায় গেঁথে নিই চার প্রান্তের চার প্রবাসীর ঈদের গল্প।

মরীচিকার শহরে চেনা আলোর ছটা

দুবাইয়ের আল কুইজের একটা লেবার ক্যাম্পে যখন ভোরের আলো ফুটল, শফিক তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নতুন কেনা সাদা পাঞ্জাবিটা সোজা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই মরুভূমির দেশগুলোতে ঈদের একটা নিজস্ব জাঁকজমক আছে। এখানে রমজান বা ঈদ মানে কেবল একটা উৎসব নয়, গোটা রাষ্ট্রটাই যেন থমকে দাঁড়ায় উদযাপনে। চার-পাঁচ দিনের লম্বা সরকারি ছুটি। শফিকের মনে হলো, এ যেন মধ্যপ্রাচ্যের বুকে গড়ে ওঠা এক টুকরো বাংলাদেশ।

সকাল সকাল শফিক আর তার রুমমেটরা মিলে ছুটল দুবাইয়ের গ্র্যান্ড মস্কের দিকে। কাতারে কাতারে মানুষ, যেন এক মহাসমুদ্র। সেখানে আরবের শেখদের পাশে দাঁড়িয়েই নামাজ পড়ছে বাংলাদেশের শফিক কিংবা পাকিস্তানের জাভেদ। নামাজ শেষে যখন সবাই কোলাকুলি করতে যায়, তখন চেনা-অচেনার দেয়ালটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। তপ্ত রোদের ক্লান্তি কাটাতে দুপুরের দিকে তারা সবাই মিলে তৈরি করে ‘খুবসা’ আর খাসির মাংসের বিশাল এক থালা। আরবীয় খাবার হলেও প্রবাসের এই দিনে তাতেই যেন অমৃতের স্বাদ পায় তারা। বিকেলে যখন বুর্জ খলিফার নিচে জমকালো আলোর রোশনাই জ্বলে ওঠে, শফিক তখন তার বন্ধুদের সঙ্গে হেঁটে বেড়ায়। মধ্যপ্রাচ্যের ঈদটা একটু বেশিই রঙিন, কারণ এখানে চারপাশটা অন্তত মুসলিম সংস্কৃতির চেনা আবহে মোড়ানো থাকে।

ইউরোপের নিয়মতান্ত্রিক চার দেয়াল

দুবাই থেকে হাজার মাইল দূরে, লন্ডনের সাউথহলে তখন আরিফ তার বন্ধুদের সঙ্গে স্থানীয় পার্কের দিকে হাঁটছে। ইউরোপের ঈদ মানেই একটা বড়সড় যুদ্ধ। এখানে যদি ঈদ কোনো কর্মদিবসে পড়ে, তবে আনন্দের চেয়ে দায়িত্বটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়। আরিফকে এই দিনটার জন্য প্রায় তিন মাস আগে অফিসে ছুটির দরখাস্ত দিতে হয়েছিল। যারা ছুটি পায় না, তাদের কপাল মন্দ। তারা ভোরে সাড়ে ছয়টার প্রথম জামাতে কোনোমতে শরিক হয়ে, পাঞ্জাবিটা বদলে কোট-টাই পরে ট্রেনের বগিতে চড়ে বসে। মনের ভেতর ঈদের আনন্দটা চাপা দিয়ে ল্যাপটপের কীবোর্ডে আঙুল চালাতে হয় তাদের।

ভাগ্যিস আজ আরিফের ছুটি ছিল। পার্কের সবুজ ঘাসের ওপর বিশাল সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। লন্ডনের মেয়রের অনুমতি নিয়ে, বিশাল পুলিশি পাহারায় সেখানে ঈদের নামাজ হচ্ছে। তুর্কি, মরোক্কান, সোমালি আর বাঙালিরা মিলে সেখানে এক অদ্ভুত বৈচিত্র্যের সৃষ্টি করেছে। নামাজ শেষ হতেই কিন্তু দেশে ফেরার তাড়া। ইউরোপে ইচ্ছে করলেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দেওয়া যায় না, লাউডস্পিকারে গান বাজানো যায় না। তাই বন্ধুদের নিয়ে আরিফ চলে এলো তার ছোট্ট ফ্ল্যাটে। সেখানে পোলাও আর গরুর মাংসের ধোঁয়া ওঠা বাটির পাশে বসে সবাই মিলে শুরু হলো স্মৃতিচারণ। কেউ একজন আলতো করে গেয়ে উঠল চেনা সুর। ইউরোপের এই পরিচ্ছন্ন, শান্ত পরিবেশের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক তীব্র একাকিত্ব, যা কেবল ভাঙা যায় এ রকম ছোট ছোট ঘরোয়া আড্ডায়।

টাইমজোনের ওপারে, পার্কিং লটের খোঁজে

আরিফ যখন দুপুরের খাবার খাচ্ছে, আটলান্টিকের ওপারে নিউ ইয়র্কের কুইন্সে তানিয়া তখন কেবল বিছানা ছেড়ে উঠছে। টাইমজোনের এই পার্থক্যের কারণে আমেরিকার প্রবাসীদের ঈদটা শুরু হয় একটু দেরিতে। তানিয়ার জন্য ঈদের দিন মানেই প্রথম চিন্তাÑ গাড়িটা পার্ক করব কোথায়? আমেরিকায় ট্রাফিক আইন এতটাই কড়া যে, ঈদের জামাতের চেয়ে চার্চ বা সিনাগগের পাশে খালি পার্কিং স্পট খোঁজাটাই বেশি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

আমেরিকায় খোলা মাঠে নামাজ পড়ার চেয়ে বড় বড় কমিউনিটি হল বা কনভেনশন সেন্টার ভাড়া করা হয়। তানিয়া তার ছোট ছেলেকে জামা পরিয়ে যখন হলের ভেতরে ঢুকল, তখন তার মনে হলো এ যেন এক মিনি বাংলাদেশ। মেয়েরা সেজেছে ঢাকাই জামদানি আর কাতান শাড়িতে। আমেরিকার এই যান্ত্রিক জীবনে ঈদের দিন যদি উইকএন্ডে না পড়ে, তবে আসল উৎসবটা তোলা থাকে পরবর্তী শনি বা রোববারের জন্য। যাকে তারা বলে ‘উইকএন্ড ঈদ পুনর্মিলনী’। তানিয়া ভাবছিল কোরবানির ঈদের কথা। বাংলাদেশে যেমন ঈদের সকালে দরজার সামনে গরু-খাসির হুটোপুটি থাকে, এখানে তার কিচ্ছু নেই। মাসের আগে থেকে অনলাইনের ফার্মে টাকা দিয়ে রাখতে হয়। ঈদের পরদিন ঠান্ডা হিমায়িত মাংসের বাক্স যখন ঘরে আসে, তখন সেটাকে আর কোরবানি মনে হয় না, মনে হয় সুপারশপের কোনো পার্সেল। তবুও, এই কৃত্রিমতার ভেতরেই তানিয়া চেষ্টা করে তার সন্তানকে দেশি সংস্কৃতির পাঠ দিতে।

সূর্যোদয়ের দেশে এক টুকরো নীরবতা

পৃথিবীর আরেক প্রান্তে, জাপানের টোকিওর একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে সায়মন তখন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। প্রযুক্তির এই দেশে মুসলমানের সংখ্যা এতই কম যে, পাশের ফ্ল্যাটের মানুষটাও জানে না আজ সায়মনের জীবনের অন্যতম বড় আনন্দের দিন। জাপানে ঈদ মানে সম্পূর্ণ নিজের ভেতরের এক নীরব উদযাপন।

সায়মনকে আজ সাত সকালেই একটা ট্যাক্সি নিয়ে ছুটতে হয়েছে অনেক দূরের একটা ইসলামিক সেন্টারে। কারণ টোকিওতে মসজিদের সংখ্যা আঙুলে গোনা। সেখানে নামাজের পর কোলাকুলি করার মতো চেনা মানুষ খুব বেশি ছিল না। সায়মন নামাজ শেষ করে একটা জাপানি রেস্তোরাঁয় ঢুকে সুশি অর্ডার করার সময় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কোথায় ঈদের দিনের মায়ের হাতের ক্ষীর, আর কোথায় এই কাঁচা মাছের সুশি! তবে সায়মনরা হাল ছাড়ে না। সন্ধ্যার পর টোকিও আর চিবার যত বাঙালি আছে, তারা সবাই মিলে জড়ো হয় কোনো এক প্রবাসীর এক চিলতে ফ্ল্যাটে। দেশ থেকে চড়া দামে আনিয়ে নেওয়া রাঁধুনি মসলা দিয়ে সেদিন তৈরি হয় খাসির রেজালা। জাপানি নিয়মের বেড়াজালে বন্দি থেকেও তারা ঘরের ভেতর বাঙালি আড্ডার সেই চিরচেনা ঝড়টা তুলতে ভুলবে না।

সব গল্পের এক মোহনা

রাত বাড়ে। দুবাইয়ের আলোর রোশনাই তখন নিভে আসছে, লন্ডনে তখন গোধূলির আলো, নিউ ইয়র্কের আকাশে দুপুরের সূর্য আর টোকিওতে তখন মধ্যরাত। চার দেশের চারজন প্রবাসীÑ শফিক, আরিফ, তানিয়া এবং সায়মনÑ সবাই যার যার বিছানায় ক্লান্ত শরীরে ফিরে আসে।

কিন্তু ঘুমানোর আগে, প্রত্যেকেই নিজের হাতের স্মার্টফোনটা তুলে নেয়। স্ক্রিনের ওপারে ভেসে ওঠে বাংলাদেশের কোনো এক চেনা বারান্দা, চেনা বিছানা কিংবা মায়ের মলিন কিন্তু হাসিমুখ। স্ক্রিনের এপার থেকে যখন বলা হয়, ‘মা, ঈদ মোবারক, ভালো আছ তো?’, তখন চার প্রান্তের চারটে আলাদা গল্প এক মোহনায় এসে মিলে যায়। প্রযুক্তি হয়তো ভৌগোলিক দূরত্ব কমাতে পারেনি, কিন্তু প্রবাসের এই নিয়মের খাঁচায় বন্দি ঈদগুলোকে এক অদ্ভুত মায়ায় বাঁচিয়ে রেখেছে। দেশ ভেদে প্রবাসীদের ঈদের নিয়ম যতই আলাদা হোক না কেন, তাদের মনের ভেতরের সেই চেনা মাটির টান আর একাকিত্বের সুরটা কিন্তু একদম এক।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!