ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সুখে মোড়ানো একাকিত্ব

রেজা হাসান
প্রকাশিত: মে ২৫, ২০২৬, ০৫:৪৭ এএম

রমজানের পঁচিশ তারিখের পর থেকেই গ্রামের ওই চিলতে টিনের ঘরের দাওয়ায় মায়ের চোখ দুটো বারবার মোবাইলের স্ক্রিনে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। এই বুঝি একটা মেসেজ এলো! শহরের কোনো এক জরাজীর্ণ ভাড়া বাসায় বসে এক তরুণী স্ত্রীও মনে মনে বারবার হিসাব কষেন। ঠিক তখনই, বিকাশ কিংবা ব্যাংকের চেনা নোটিফিকেশনটা বেজে ওঠে ‘রেমিট্যান্স ট্রান্সফার সাকসেসফুল।’ মুহূর্তে ঘরের সব মলিনতা কেটে গিয়ে যেন এক ফালি চাঁদের আলো এসে পড়ে। সুদূর মরুভূমির তপ্ত বালি, মালয়েশিয়ার গহিন জঙ্গল কিংবা ইউরোপ-আমেরিকার কনকনে ঠান্ডা ফ্যাক্টরিতে যে মানুষটা নিজের রক্তকে পানি করে খেটেছেন, তার পাঠানো সেই কষ্টের টাকাটা যখন দেশের মাটিতে এসে পৌঁছায়, তখনই মূলত কোটি কোটি পরিবারে ঈদের আসল আনন্দটা শুরু হয়।

প্রবাসীদের পাঠানো এই টাকা কেবল একটা সংখ্যার হিসাব নয়, এর প্রতিটি মুদ্রায় মিশে থাকে এক বুক ভালোবাসা, সীমাহীন ত্যাগ আর মাটির টান। এই টাকা দিয়ে দেশের মানুষ কীভাবে ঈদ উদযাপন করে, তা কোনো নিয়মের খোপে বেঁধে রাখা সম্ভব নয়। এটি এক পবিত্র আবেগের আখ্যান, যা প্রতি বছর আমাদের চারপাশকে এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে রাখে।

অপেক্ষার অবসান ও বিপণিবিতানে আনন্দের ছোঁয়া

টাকাটা আসার পরদিনই দেশের চেনা বাজারগুলোতে এক উৎসবমুখর ব্যস্ততা নেমে আসে। প্রবাসীর পাঠানো সেই টাকায় যখন তার ফুটফুটে চার বছরের সন্তানটি পছন্দের লাল জামাটা বুকে জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হেসে ওঠে, কিংবা তার আদরের ছোট বোনটি কাঁচের চুড়ির টুংটাং শব্দে পুরো বাড়ি মুখরিত করে তোলে, তখন সেই আনন্দের তরঙ্গ আটলান্টিক পেরিয়ে পৌঁছে যায় প্রবাসীর একাকী ঘরেও। মা যখন অনেক দিন পর নিজের জন্য একটা নতুন সুতি শাড়ি কেনেন আর বাবা নতুন পাঞ্জাবিটা গায়ে দিয়ে প্রবাসী ছেলের জন্য দুই হাত তুলে মোনাজাত করেন, তখন সেই দোয়ার অদৃশ্য সুতায় বাঁধা পড়ে হাজার মাইলের দূরত্ব। প্রবাসীরা নিজেদের সব শখ, নতুন জামা কেনার বাজেট কাটছাঁট করে সবটুকু সুখ পাঠিয়ে দেন দেশের ঠিকানায়, যাতে তাদের প্রিয় মানুষেরা উৎসবের দিনে কারো চেয়ে পিছিয়ে না থাকে।

রসুইঘরের সুবাস ও সামাজিকতার মেলবন্ধন

ঈদের দিন সকালের রান্নায় যে চেনা সুবাস ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তার পেছনের কারিগরও কিন্তু সেই দূর পরবাসে থাকা মানুষটি। মায়ের হাতের দুধ-সেমাইর মিষ্টি স্বাদ, দুপুরের ধোঁয়া ওঠা পোলাও আর খাসির মাংসের রাজকীয় আয়োজনÑ সবকিছুই সম্ভব হয় প্রবাসীর সেই হাড়ভাঙা খাটুনির পয়সায়। শুধু নিজের পরিবারই নয়, গ্রামের কোনো এক কোণে এতিম শিশুটি যে আজ নতুন জামা পরে ঘুরছে কিংবা কোনো এক দরিদ্র প্রতিবেশীর ঘরে যে আজ ঈদের চুলা জ্বলেছে, তার পেছনেও জড়িয়ে থাকে কোনো এক প্রবাসীর পাঠানো জাকাত ও ফিতরার টাকা। প্রবাসীরা যেন এক একজন নিঃশব্দ ফেরিওয়ালা, যারা নিজেরা দূর দেশে একাকিত্বের মেঘ বুকে নিয়ে ঘোরেন, অথচ দেশের বুকে বিলিয়ে দেন এক আকাশ আনন্দের রোদ।

কোরবানির হাটে মর্যাদার একান্নবর্তী লড়াই

কোরবানির ঈদের গল্পটা তো আরও বেশি আবেগের। হাটে গিয়ে যখন প্রবাসীর ভাই বা বাবা শত মানুষের ভিড়ে বুক ফুলিয়ে একটা হৃষ্টপুষ্ট গরু কেনেন, তখন গ্রামের মানুষের চোখে যে সমীহ জাগে, তা ওই প্রবাসী মানুষটার সামাজিক মর্যাদা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।

নিজেরা হয়তো ঈদের দিন দূর দেশে একটা ফ্রোজেন বা হিমায়িত মাংসের প্যাকেট খোলে, অথচ তাদের টাকায় দেশের বাড়িতে তখন উৎসবের ধুম লেগে যায়। প্রতিটি পশুর দাম চুকানোর পেছনে মিশে থাকে প্রবাসীর কত রাতের বিনিদ্র কর্মঘণ্টা, তা কেবল সেই মানুষটিই ভালো জানে।

স্ক্রিনের ওপারে এক ফোঁটা সার্থকতার জল

ঈদের দিন দুপুরের পর যখন দেশের বাড়ির সবাই নতুন পোশাক পরে, সুগন্ধি মেখে একসঙ্গে ড্রয়িংরুমে বসে, তখন সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি তৈরি হয়। মোবাইল স্ক্রিনের ওপারে ভেসে ওঠে মলিন, ক্লান্ত কিন্তু এক জোড়া তৃপ্ত চোখ। ভিডিও কলে যখন প্রবাসী বাবা বা স্বামী দেখেন তার পাঠানো টাকায় সন্তানটি হাসছে, মা পরম শান্তিতে খাচ্ছেন, তখন তার সব ক্লান্তি নিমেষেই ধুয়ে মুছে যায়। প্রবাসীর চোখের কোণে তখন এক ফোঁটা জল চিকচিক করে ওঠেÑ সে জল কষ্টের নয়, সে জল পরম সার্থকতার।

প্রবাসীদের ঈদ হয়তো চার দেয়ালের মাঝে, ফোনোফোরামের এক চিলতে ঘরে একাকিত্বেই কেটে যায়। কিন্তু তাদের পাঠানো সেই ভালোবাসার টাকা দেশের কোটি কোটি মানুষের ঈদকে করে তোলে প্রাণবন্ত, উৎসবমুখর আর পরিপূর্ণ। তারা নিজেরা কাঁদেন, কিন্তু দেশকে হাসাতে কখনো ভুল করেন না।