চলতি বছর ছিল ঢাকাই সিনেমার চরম খরার বছর। এ বছর ৪৬টি সিনেমা মুক্তি পেলেও ব্যবসাসফল সিনেমা হাতেগোনা। মানে ৯৯ ভাগ সিনেমাই লোকসান গুনেছে। এতে সিনেমা হলগুলোও পড়েছে বিপাকে। বড় বাজেটের সিনেমার সংখ্যাও ছিল সীমিত। ঢাকাই সিনেমা এখন ঈদ-কেন্দ্রিক। তাও আবার শাকিব খান নির্ভর। ব্যবসায়িক সাফল্য বিবেচনায় মাত্র পাঁচটি চলচ্চিত্র দর্শকের মনে আলোড়ন তুলতে পেরেছে। সব মিলিয়ে বিগত বছরের মতো এবারও ছিল চলচ্চিত্রের জন্য চরম মন্দার বছর। এ নিয়ে লিখেছেন রুহুল আমিন ভূঁইয়া
বছরের শুরুটাই হয় হতাশা দিয়ে। প্রথম দুই মাসে আটটি চলচ্চিত্র মুক্তি পেলেও কোনো সিনেমা আলোচনায় আসতে পারেনি। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলো হচ্ছে মধ্যবিত্ত (৩ জানুয়ারি), মেকাপ (১০ জানুয়ারি), কিশোর গ্যাং (১৭ জানুয়ারি), রিকশা গার্ল (২৪ জানুয়ারি), দায়মুক্তি (৭ ফেব্রুয়ারি), বলী (৭ ফেব্রুয়ারি), ময়না (১৪ ফেব্রুয়ারি), জলে জলে তারা (১৪ ফেব্রুয়ারি)। দর্শকশূন্য প্রেক্ষাগৃহ, দুর্বল গল্প ও নির্মাণে বছরটি যেন হতাশার সুরে শুরু হয়। দু-একটা সিনেমা ছাড়া বাকিগুলো ছিল মানহীন। এরপর রমজান মাসজুড়ে বন্ধ ছিলে দেশের সব প্রেক্ষাগৃহ।
তবে ঈদুল ফিতরে বদলে যায় প্রেক্ষাগৃহের চিত্র। এ বছর চেনা ছকের বাইরে এসে গল্পেরা কথা বলেছে আলাদা স্বরে, আলাদা অনুভবে। কোথাও হাসির হালকা রোদ, কোথাও চোখ ভেজানো নীরবতা, কোথাও আবার রহস্যের অন্ধকার গলি ধরে হাঁটতে হাঁটতে বুকের ভেতর টান টান উত্তেজনা। ঈদ উপলক্ষে ৩১ মার্চ মুক্তি পায় একসঙ্গে ছয়টি সিনেমা। তা হচ্ছে ‘বরবাদ’, ‘জংলি’, ‘দাগি’, ‘চক্কর’, ‘অন্তরাত্মা’ ও ‘জ্বীন ৩’। তবে চিত্রতারকা শাকিব খান, সিয়াম আহমেদ, আফরান নিশোদের সিনেমা ছাড়া কোনো সিনেমা সেভাবে দর্শক টানতে পারেনি। নুসরাত ফারিয়া ও আব্দুন নূর সজল অভিনীত ‘জ্বীন ৩’ সিনেমাটি দর্শকসাড়ায় ব্যর্থ হলেও ‘কন্যা’ গানটি ছিল তুমুল আলোচনায়। এর মধ্যে ‘বরবাদ’, ‘জংলি’ এবং ‘দাগি’ তিনটি সিনেমা ব্যবসায়িকভাবে ব্যাপক সাফল্য পায়। ‘দাগি’ দিয়ে সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন আফরান নিশো ও তমা মির্জা। অল্প সময়ের জন্য উপস্থিত হয়ে মুগ্ধতার গল্প লেখেন সুনেরাহ বিনতে কামাল।
ঈদুল ফিতরের পর মুক্তি পাওয়া ‘জয়া আর শারমিন’ এবং ‘আন্তঃনগর’ সিনেমা দুটি প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টানতে ব্যর্থ হয়। ঈদুল আজহায় আবারও জোয়ার আসে। মুক্তিপ্রাপ্ত পাঁচ চলচ্চিত্রের মধ্যে দুটি প্রেক্ষাগৃহে ব্যাপক দর্শক টানে। এর একটি ‘তা-ব’ এবং অন্যটি ‘উৎসব’। ‘তা-ব’ মুক্তির ১৭ দিনের মাথায় এইচডি প্রিন্ট ফাঁস হলেও সিনেমাটি শক্ত অবস্থান ধরে রাখে। অন্যদিকে, ‘উৎসব’ টানা দুই মাস ধরে সিনেপ্লেক্সে চলে। তবে ঈদুল আজহায় মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ইনসাফ’, ‘টগর’, ‘নীলচক্র’ ও ‘এশা মার্ডার’ থেকে দর্শক মুখ ফিরিয়ে নেয়। ‘তা-ব’ও ‘উৎসব’ সিনেমায় ব্যতিক্রম দুটি চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন জয়া আহসান। ‘তা-ব’ সিনেমার মাধ্যমে ১২ বছর পর জয়া আহসান ও শাকিব খানকে একসঙ্গে দেখা গেছে।
ঈদের পর মুক্তি পাওয়া প্রায় ২২টি সিনেমার মধ্যে কোনোটি দর্শকের মন জয় করতে পারেনি। অধিকাংশ চলচ্চিত্রই ছিল মানহীনÑ যার কারণে দর্শক হলে যেতে আগ্রহ দেখায়নি। দেশীয় প্রেক্ষাগৃহে রমরমা ব্যবসার পাশাপাশি কিছু সিনেমা আন্তর্জাতিক বাজারেও সাফল্য দেখা গেছে। যদিও ব্যবসায়িকভাবে সফল না হলেও কয়েকটি সিনেমা দর্শক ও সমালোচকের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা হচ্ছে ‘অন্যদিন’, ‘আলী’, ‘উড়াল’, ‘জলরঙ’, ‘ডট’, ‘আমার শেষ কথা’, ‘নন্দিনী’, ‘বাড়ির নাম শাহানা’, ‘ফেরেস্তে’, ‘সাবা’, ‘স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা’, ‘উদীয়মান সূর্য’, ‘বান্ধব’, ‘ব্যাচেলর ইন ট্রিপ’, ‘অন্ধকারে আলো’, ‘ডাইরেক্ট অ্যাটাক’, ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘কন্যা’, ‘বেহুলা দরদী’, ‘মন যে বোঝে না’, ‘সাইলেন্স’, ‘গোয়ার’, ‘দেলুপি’ এবং ‘খিলাড়ি’।
শীর্ষে শাকিব খানই
ঢালিউড চলচ্চিত্রে ২৬ বছরের ক্যারিয়ারে অসংখ্য সফল সিনেমা উপহার দিয়েছেন দেশীয় সিনেমার সবচেয়ে বড় তারকা শাকিব খান। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এই তারকার নতুন সিনেমাগুলো ব্যাক টু ব্যাক যেন নতুন ইতিহাসই তৈরি করছে!
২০২৩-২০২৫ টানা তিন বছর ধরে ‘ইন্ডাস্ট্রি হিট’ সিনেমা উপহার দিয়েছেন তিনি! ২০২৩ সালে ‘প্রিয়তমা’ সিনেমা দিয়ে ইন্ডাস্ট্রি হিট উপহার দেওয়া শুরু, এরপর ২০২৪ সালে ‘তুফান’ এবং ২০২৫ সালে ‘বরবাদ’ উপহার দিয়েছেন এই তারকাভিনেতা।
আরশাদ আদনান প্রযোজিত হিমেল আশরাফ পরিচালিত ২০২৩ সালে ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়া ‘প্রিয়তমা’ দেশে-বিদেশে অভাবনীয় সাড়া ফেলে। প্রযোজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এটি বিশ্বব্যাপী ৪২ কোটি টাকার গ্রস কালেকশন করে। রোমান্টিক ঘরানার এ সিনেমা দেশ-বিদেশের প্রেক্ষাগৃহে দীর্ঘসময় ধরে রমরমা ব্যবসা করে। বিশেষ করে প্রবাসী দর্শকদের কাছ থেকে রেকর্ড প্রতিক্রিয়া আসে।
২০২৪ সালের ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়া রায়হান রাফির পরিচালনায় ‘তুফান’ শাকিব খানের ইমেজ পুরোপুরি পাল্টে দেয়। মারকাটারি লুক, অ্যাটিটিউড, অ্যাকশন, গান সব মিলিয়ে এটি বছরের সবচেয়ে আলোচিত ও ব্যবসাসফল সিনেমা হয়ে ওঠে। সিনেপ্লেক্সগুলোতে রেকর্ড পরিমাণ শো এবং টানা শো হাউসফুলের মাধ্যমে এটি ইন্ডাস্ট্রি হিট হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
২০২৫-এর সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক সাফল্য পায় ‘বরবাদ’, যা ঈদুল ফিতরে মুক্তি পেয়ে সারাদেশে রীতিমতো ঝড় তোলে। নতুন যুগের গল্প, আধুনিক নির্মাণশৈলী এবং শাকিব খানের পরিণত অভিনয় দেখতে সিনেপ্লেক্স থেকে সিঙ্গেল স্ক্রিনে দর্শকদের ঢল নামে। মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই রেকর্ড আয়ের খবর আসে বিভিন্ন হল মালিকদের কাছ থেকে। রিয়েল এনার্জি প্রডাকশনের প্রযোজনায় শাহরিন সুমি জানান, সিনেমাটি ৭৫ কোটি টাকার গ্রস কালেকশন হয়।
ধারাবাহিক এই সাফল্য কীভাবে দেখছেন, জানতে চাইলে দৈনিক রূপালী বাংলাদেশকে চিত্রতারকা শাকিব খান বলেন, ‘আমি স্বপ্ন দেখি আমাদের সিনেমা আন্তর্জাতিক বাজারে সুনাম কুড়াবে। সেই দিন আর বেশি দূরে নয়। যদিও এরই মধ্যে কয়েকটি সিনেমা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। দেশের পালাবদলেও দর্শক সিনেমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে প্রেক্ষাগৃহের বেহাল দশার মধ্যেও সিনেমা দেখছেন। এটা বাংলা সিনেমার জন্য ইতিবাচক। আমাদের ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে আমি অনেক বেশি আশাবাদী। আমি বরাবরই বলছি, আমাদের সিনেমার দর্শক গুলশান টু গুলিস্তানের। তারাই আমাদের সিনেমার প্রাণ। আমি চেষ্টা করি, বদলাই, আর বিশ্বাস করিÑ প্রতিটি দিন নিজেকে আরও ভালো করার একটি সুযোগ।’ সময়ের সঠিক ব্যবহার, অভিজ্ঞতা আর শেখার প্রবল আগ্রহ তার বদলানোর পেছনের মন্ত্র বলে জানিয়েছেন।
শাকিব খানের এই সাফল্য ইতিবাচকভাবে দেখছেন চলচ্চিত্র বিশ্লেষকরা। সেইসঙ্গে তারা হতাশা প্রকাশ করে জানান, এক শাকিব খান এবং দুই ঈদের সিনেমা দিয়ে ইন্ডাস্ট্রি টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ইন্ডাস্ট্রি বাঁচাতে হলে যেমন বড় প্রযোজক দরকার তেমনি স্বাভাবিক সময়ে ভালো গল্পের সিনেমা মুক্তি দিতে হবে। প্রেক্ষাগৃহ সংস্কার করার পাশাপাশি গল্পের নায়ক তৈরি করতে হবে।

