ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

শব্দের জাদুকর মজরুহ সুলতানপুরী

শতাব্দী পেরিয়েও অম্লান যার সুরের কাফেলা

মো. সায়েম ফারুকী
প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ০৬:৩৪ এএম

‘ম্যাঁয় আকেলা হি চলা থা জানিব-এ-মঞ্জিল মগর, লোগ সাথ আতে গয়ে অউর কারভাঁন বনতা গয়া’ (আমি একাই গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলাম, কিন্তু মানুষ পাশে এসে দাঁড়াল আর তৈরি হলো এক বিশাল কাফেলা)। নিজের জীবন ও সৃষ্টিকে এই একটি লাইনে যিনি বেঁধে ফেলেছিলেন, তিনি আর কেউ নন; বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উর্দু কবি এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী গীতিকার মজরুহ সুলতানপুরী। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া হাজারো কালজয়ী গান আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে সুরের ঝংকার তোলে।

হেকিম থেকে শব্দের জাদুকর

উত্তর প্রদেশের সুলতানপুরে ১৯১৯ সালের ১ অক্টোবর এক রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্ম নেন মজরুহ। তার আসল নাম ছিল আসরার উল হাসান খান। বাবার ইচ্ছায় মাদ্রাসায় প্রথাগত শিক্ষা শেষে লখনউ থেকে ইউনানি চিকিৎসায় ‘হেকিম’ (চিকিৎসক) ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। কিন্তু তার অবচেতন মনে চিকিৎসকের স্টেথোস্কোপের চেয়ে শব্দের ছন্দই বেশি আলোড়ন তুলত। চিকিৎসালয় ছেড়ে তিনি ঝুঁকে পড়েন কবিতা ও শায়েরির প্রতি। সুলতানপুরের এক মুশায়েরায় (কবিতা পাঠের আসর) নিজের গজল পড়ে রাতারাতি জনপ্রিয়তা পান এবং নিজের ছদ্মনাম নেন ‘মজরুহ’, যার অর্থ ‘আহত আত্মা।

প্রগতিশীল আন্দোলন ও রুপালি পর্দায় আগমন

চল্লিশের দশকে মজরুহ যুক্ত হন ‘প্রগতিশীল লেখক আন্দোলনের সঙ্গে। ব্রিটিশবিরোধী কবিতা ও বামপন্থি রাজনৈতিক ভাবাদর্শের কারণে তাকে প্রায় দুই বছর কারাবাসও করতে হয়েছিল। ১৯৪৫ সালে মুম্বাইয়ের এক মুশায়েরায় প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা এ আর কারদার তার শায়েরি শুনে মুগ্ধ হন। তার হাত ধরেই ১৯৪৬ সালে ‘শাহজাহান’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক ঘটে মজরুহের। কিংবদন্তি সংগীত পরিচালক নওশাদের সুরে এবং কে. এল. সায়গলের কণ্ঠে তার লেখা গান ‘জব দিল হি টুট গয়া’ দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এছাড়াও ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ সিনেমায় ‘অ্যায় মেরে হামসফর’ জনপ্রিয় এই গানসহ অসংখ্য গান তিনি রচনা করেছেন।

ছয় দশকের দীর্ঘ সংগীত যাত্রা

বলিউডের ইতিহাসে মজরুহ সুলতানপুরীই একমাত্র গীতিকার, যিনি নওশাদ, এস ডি বর্মণ থেকে শুরু করে আর ডি বর্মণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের এ আর রহমান ও যতিন-ললিতের মতো সুরকারদের সঙ্গে সমান তালে কাজ করেছেন। কে এল সায়গল থেকে শুরু করে উদিত নারায়ণÑ সবার কণ্ঠেই প্রাণ পেয়েছে তার শব্দমালা।

বহুমুখী প্রতিভার অনন্য নিদর্শন

রোমান্টিক ও কৌতুক রসাত্মক গান : ‘ছোড় দো আঁচল জমানা ক্যায়া কহেগা’ বা ‘হাল ক্যায়সা হ্যায় জনাব কা’ গভীর বিরহ ও জীবনদর্শন: ‘তেরি আঁখো কে সিবা দুনিয়া মে রাখা ক্যায়া হ্যায়’

তারুণ্যের উন্মাদনা : নব্বইয়ের দশকে এসেও তরুণ হৃদয়ের স্পন্দন বুঝে তিনি লিখেছিলেন ‘পহেলা নেশা, পহেলা খুমার’ (জো জিতা ওহি সিকান্দর)-এর মতো তুমুল জনপ্রিয় গান।

স্বীকৃতি ও অবিনশ্বর কীর্তি

১৯৬৫ সালে ‘দোস্তী’ চলচ্চিত্রের ‘চাহুঙ্গা ম্যাঁয় তুঝে সাঁঝ সাভেরে’ গানের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান ১৯৯৩ সালে চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’-এ ভূষিত হন তিনি। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনিই প্রথম গীতিকার, যিনি এই সম্মানজনক পুরস্কারটি লাভ করেন।

২০০০ সালের ২৪ মে ৮০ বছর বয়সে মুম্বাইয়ে এই মহান কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মজরুহ সুলতানপুরী শুধু গান লেখেননি, তিনি হিন্দি গানের ভাষাকে আমজনতার কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিলেন সাহিত্যিক মর্যাদা অক্ষুণœ রেখেই। আজ তিনি শারীরিকভাবে অনুপস্থিত, কিন্তু রেডিওর তরঙ্গে কিংবা ইয়ারফোনের সুরে যখনই কোনো প্রেমিক মন গুনগুনিয়ে ওঠে, তখনই বেঁচে থাকেন শব্দের জাদুকর মজরুহ সুলতানপুরী।