ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

শব্দের জাদুকর আনন্দ বক্সী

সাধারণ মানুষের হৃদস্পন্দন

মো. সায়েম ফারুকী
প্রকাশিত: জুলাই ১৭, ২০২৬, ০১:৩০ এএম

বলিউড সিনেমার ইতিহাসে এক ব্যক্তিত্বের নাম আনন্দ বক্সী, যিনি নিজের সহজ, সরল অথচ গভীর লেখনী দিয়ে কোটি মানুষের মনের কথা প্রকাশ করেছেন। প্রায় সাড়ে চার দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি লিখেছেন ৬ হাজারেরও বেশি গান। তার লেখা গানগুলো কেবল সিনেমার দৃশ্যকে জীবন্ত করেনি, বরং ভারতীয় উপমহাদেশের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ এবং উৎসবের চিরন্তন সঙ্গী হয়ে উঠেছে।

রাওয়ালপিন্ডি থেকে মুম্বাই: এক রোমাঞ্চকর জীবন যুদ্ধ, ১৯৩০ সালের ২১ জুলাই অবিভক্ত ভারতের রাওয়ালপিন্ডিতে (বর্তমান পাকিস্তান) জন্মগ্রহণ করেন আনন্দ প্রকাশ বৈদ। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল গায়ক হওয়া। তবে ভাগ্যের ফের এবং ভারত ভাগের পর দেশান্তরের কারণে জীবনের শুরুটা সহজ ছিল না। তিনি ভারতীয় নৌবাহিনী এবং পরে সেনাবাহিনীতে প্রায় এক দশক চাকরি করেন। কিন্তু মনের ভেতর পুষে রাখা গানের প্রতি ভালোবাসা তাকে শেষ পর্যন্ত টেনে আনে মুম্বাইয়ের রুপালি জগতে। ১৯৫৮ সালে ‘ভালা আদমি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে গীতিকার হিসেবে তার অভিষেক ঘটে।

সহজ শব্দের অসাধারণ মেলোডি: আনন্দ বক্সীর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার ভাষা। তিনি কোনো জটিল বা ভারী শব্দ ব্যবহার না করে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে কবিতায় রূপ দিতেন। তার গানের পঙ্ক্তিগুলো শুনলেই মনে হতো, এটি যেন শ্রোতার নিজের জীবনেরই গল্প। তিনি আরাধনা, অমর প্রেম, ববি, শোলে, দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে, থেকে শুরু করে তাল এবং মোহাব্বাতাইন-এর মতো ব্লকবাস্টার সিনেমার গান লিখেছেন।

‘মেরে সপনো কি রানি’, ‘কুছ তো লোগ কাহেঙ্গে’, ‘ইয়ে দোস্তি হাম নেহি তোড়েঙ্গে’, কিংবা ‘তুঝে দেখা তো ইয়ে জানা সনম’Ñ তার লেখা এই গানগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আজও সমান জনপ্রিয়। সুরকার ও গায়কদের প্রিয় মানুষ শচীন দেব বর্মণ, আর ডি বর্মণ, লক্ষ্মীকান্ত-পেয়ারেলাল থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশকের এ আর রহমানÑ সব প্রজন্মের সুরকারদের সঙ্গেই তিনি সমানে তাল মিলিয়ে কাজ করেছেন। লতা মঙ্গেশকর, মোহাম্মদ রফি এবং কিশোর কুমারের মতো কিংবদন্তি গায়কেরা তার লেখা গান গেয়ে অমরত্ব পেয়েছেন। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি রেকর্ডসংখ্যক ৪০ বার ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন এবং ৪ বার এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার লাভ করেন।

চিরন্তন অবসান: ২০০২ সালের ৩০ মার্চ ৭১ বছর বয়সে এই মহান গীতিকার মুম্বাইয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি শারীরিকভাবে চলে গেলেও তার রেখে যাওয়া হাজার হাজার গান আজও এফএম রেডিও, স্পটিফাই বা ইউটিউবে প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ শুনছেন। আনন্দ বক্সী প্রমাণ করে গেছেন, সত্যিকারের শিল্প কখনো মরে না; তা বেঁচে থাকে মানুষের হৃদয়ে, সুরের মূর্ছনায়।