ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

আইনি জটিলতায় তারকারা

রকিবুল ইসলাম আফ্রিদি
প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৬:৩২ এএম

 

লাইমলাইট, ক্যামেরার ঝলকানি আর লাখো ভক্তের করতালিÑ রুপালি পর্দার তারকাদের জীবনটা বাইরে থেকে দেখতে ঠিক এমনই রূপকথার মতো। কিন্তু এই জমকালো জীবনের আড়ালেও কখনো কখনো নেমে আসে আইনি ঝড়। সম্প্রতি দেশের শোবিজ অঙ্গনের একঝাঁক তারকা জড়িয়ে পড়েছেন নানা আইনি জটিলতায়। প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, ভাঙচুর থেকে শুরু করে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন-সংশ্লিষ্ট গুরুতর ফৌজদারি মামলায় নাম আসায় এই গ্ল্যামার কন্যাদের নিয়মিত চক্কর কাটতে হচ্ছে আদালতের বারান্দায়। পর্দার রোমাঞ্চকর গল্পকে হার মানিয়ে তাদের বাস্তব জীবনের এই আইনি লড়াই এখন বিনোদন জগতের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

এই আইনি ঝড়ঝাপটায় সর্বশেষ যুক্ত হয়েছেন ছোট পর্দার দর্শকপ্রিয় অভিনেত্রী তানজিন তিশা। তার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে এই অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে সমন জারি করা হয়েছে, যা তার ক্যারিয়ারে এক নতুন আইনি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

একটি অনলাইনভিত্তিক ফ্যাশন পেজ প্রায় ২৮ হাজার টাকা মূল্যের শাড়ি নিয়ে সেটির প্রচারণা ও মূল্য পরিশোধের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগে ২০২৫ সালের শেষদিকে তানজিন তিশার নামে মামলা করেন ওই পেজটির প্রশাসক আমিনুল ইসলাম। সেই মামলায় তানজিন তিশাকে আগামী ১৩ আগস্ট আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

এ মামলা নিয়ে তানজিন তিশা বলেছেন, আমি অবশ্যই আদালতে যাব। আমারও ইচ্ছে হয়েছিল আমার সঙ্গে কী ঘটেছে কথা বলি। কিন্তু পারিনি কারণ বিষয়টি নিয়ে মামলা চলমান। দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। আমি বিশ্বাস করি, সঠিক বিচার পাব এবং আমার আইনজীবী আছে, আইনিভাবে মোকাবিলা করব। ১৪ বছর ধরে আমি সুনামের সঙ্গে এই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছি, এত শ্রম দিয়ে শিল্পী হিসেবে নিজেকে তৈরি করেছি একটা অনলাইনের শপের ২৭ হাজার টাকার শাড়ি নিয়ে প্রতারণা করার জন্য?

অন্যদিকে, ব্যাটারির মূল্য পরিশোধ না করা ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগে গুলশান থানায় দায়ের করা একটি প্রতারণা মামলায় ফেঁসেছেন চিত্রনায়িকা ইয়ামিন হক ববি। অবশ্য এই মামলায় তিনি ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করে এক হাজার টাকার মুচলেকায় জামিন লাভ করেছেন। ববির আইনজীবীর দাবি, তাকে এই ঘটনার সঙ্গে মিথ্যাভাবে জড়ানো হয়েছে।

আইনি জটিলতার হাত থেকে রেহাই পাননি নাট্যজগতের শীর্ষ অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরীও। পারিবারিক ব্যবসায় অংশীদারিত্বের নামে ২৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও হুমকির অভিযোগে মেহজাবীন ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, এমনকি একপর্যায়ে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়। পরবর্তীতে তারা আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন এবং শেষ পর্যন্ত ঢাকার এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন বিবেচনা করে তাদের এই মামলা থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি ও খালাস প্রদান করে।

মামলা-হামলার তালিকায় সবচেয়ে বেশি চর্চিত নাম চিত্রনায়িকা পরীমণি। ২০২১ সালে বনানীর বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় তাকে দীর্ঘ ২৮ দিন কাশিমপুর কারাগারে বন্দি থাকতে হয়েছিল, যা এখনো আদালতে বিচারাধীন। এর পাশাপাশি সাভারের বোট ক্লাবে ভাঙচুর, মারধর ও চুরির অভিযোগে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিনের দায়ের করা মামলায় পিবিআই-এর তদন্তের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে সমন জারি হলে তিনি জামিন নেন। এ ছাড়া অল কমিউনিটি ক্লাবে গভীর রাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে গুলশান থানায় তার বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছিল। যদিও সম্প্রতি এই মামলা নিয়ে মুখ খুলেছেন অভিনেত্রী।

তিনি দাবি করেছেন, ২০২১ সালের ৪ আগস্ট তাকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এবং বিশেষ একটি মহলের স্বার্থে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। র‌্যাবের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল খাইরুল ইসলামকে ধন্যবাদ জানিয়ে পরীমনি জানান, সম্প্রতি একটি অনলাইন টক শোতে তার দেওয়া বক্তব্যের মাধ্যমে দেশের মানুষ জানতে পেরেছেন, বনানীর বাসায় দীর্ঘ অভিযানের পর তৎকালীন র‌্যাব মহাপরিচালক ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের নির্দেশে তাকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে শোবিজ তারকাদের গায়েও। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ভাটারা এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও হত্যাচেষ্টার মামলায় আসামি হয়েছেন বেশ কয়েকজন শিল্পী। এই মামলায় জড়িয়ে ঢালিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও উপস্থাপক নুসরাত ফারিয়া থাইল্যান্ড যাওয়ার পথে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটক হন। প্রথমে আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠালেও পরদিনই তিনি জামিনে মুক্তি পান।

একই হত্যাচেষ্টা মামলায় অন্যতম আসামি চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাস আইনি ঝামেলা এড়াতে হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নেওয়ার পর ছদ্মবেশে বোরকা পরে সিএমএম আদালতে আত্মসমর্পণ করে স্থায়ী জামিন লাভ করেন। তবে অপুর আইনি ঝামেলা এখানেই শেষ নয়, ইউটিউব চ্যানেল হাতিয়ে নেওয়া ও প্রতারণার অভিযোগে প্রযোজক সিমি ইসলাম কলির দায়ের করা একটি ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে, পাশাপাশি অতীতে বাদশাহ বুলবুল নামের এক ব্যবসায়ীর করা চেক প্রতারণার লিগ্যাল নোটিশও পেয়েছিলেন তিনি।

একই রাজনৈতিক হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি হয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন চিত্রনায়িকা নিপুণ আক্তার। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর সিলেট বিমানবন্দর দিয়ে গোপনে লন্ডন যাওয়ার চেষ্টা করার সময় ইমিগ্রেশন পুলিশ ও এনএসআই তাকে আটকে দেয় এবং তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর বাইরে কোটা আন্দোলনের সময় শিল্পী সমিতির অফিশিয়াল প্যাড জালিয়াতি করে রাজনৈতিক বিবৃতি দেওয়ার অপরাধে তাকে সমিতি থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়। একই সাথে ২০২৪ সালের শিল্পী সমিতির নির্বাচনে হেরে গিয়ে হাইকোর্টে রিট করা এবং ২০২২ সালের নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদের ‘স্থিতাবস্থা’ ভঙ্গ করে চেয়ারে বসায় চিত্রনায়ক জায়েদ খানের দায়ের করা আদালত অবমাননার মামলা নিয়ে নিপুণকে বছরের পর বছর সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বারান্দায় দৌড়াতে হয়েছে।

এ ছাড়াও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে ২০১৫ সালের ২০ এপ্রিল হামলা করে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। সেই হামলার অভিযোগে চিত্রনায়ক জায়েদ খান, অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয় ও সাজু খাদেমসহ ৫০ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে।

মানহানির অভিযোগে ঢাকাই সিনেমার সেরা নায়ক শাকিব খানের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করেছিলেন প্রযোজক রহমত উল্লাহ। এ নিয়ে আদালতের বারান্দায় যেতে যেতে হয়েছিল এই অভিনেতাকে।

আইনি বিড়ম্বনার এই তালিকায় সরাসরি আসামি না হয়েও সাবেক স্বামীর কারণে চরম সামাজিক ও মানসিক হয়রানির শিকার হয়েছিলেন ‘ম্যাডায় ফুলি’খ্যাত অভিনেত্রী সিমলা। ২০১৯ সালে ঢাকা থেকে দুবাইগামী বাংলাদেশ বিমানের উড়োজাহাজ ছিনতাই চেষ্টার ঘটনায় কমান্ডো অভিযানে নিহত পলাশ আহমেদ ছিলেন সিমলার সাবেক স্বামী। এই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী মামলার তদন্তের স্বার্থে ভারতের মুম্বাই থেকে দেশে ফিরে এসে সিমলাকে দীর্ঘ সময় ধরে সিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল এবং জবানবন্দি দিতে হয়েছিল।

এ ছাড়া অন্যান্য তারকাদের মধ্যে চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি ওমরাহ পালনকালে ফেসবুক লাইভে এসে পুলিশের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ তোলায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং পরে জামিন পান।

অপু বিশ্বাসের সঙ্গে ব্যক্তিগত কোন্দল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাদা ছোড়াছুড়ির জেরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছিল শবনম বুবলীকেও।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে অর্থ আত্মসাতের মামলায় জড়িয়ে হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিতে হয়েছিল দুই বাংলার জনপ্রিয় মুখ রাফিয়াত রশিদ মিথিলা, তাহসান খান ও শবনম ফারিয়াকে। তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও প্রতারণার অভিযোগে ২০১৮ সালে কণ্ঠশিল্পী শফিক তুহিনের দায়ের করা মামলায় কারাগারে যেতে হয়েছিল আরেক কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবরকে। পরবর্তীতে ১০ হাজার টাকা মুচলেকা দিয়ে জামিন পান তিনি।

অন্যদিকে, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত চিত্রনায়িকা তমা মির্জাকে নিয়ে টেলিভিশন ইন্টারভিউ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর মন্তব্য করার জেরে ১০ কোটি টাকার মানহানির মামলার মারপ্যাঁচে পড়তে হয়েছিল অভিনেত্রী মিষ্টি জান্নাতকে। তমার পক্ষে তার আইনজীবীর পাঠানো আইনি নোটিশে উল্লেখ করা হয়, সংবাদমাধ্যমে মিষ্টির এমন মন্তব্যে তমার ১০ কোটি টাকার মানহানি হয়েছে এবং নোটিশপ্রাপ্তির সাত দিনের মধ্যে জনসমক্ষে ক্ষমা চেয়ে এই ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়।

এর জবাবে মিষ্টি জান্নাত তমা মির্জার নোটিশকে অসত্য আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবি জানান এবং উল্টো তিন দিনের মধ্যে ২০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে পাল্টা আইনি নোটিশ পাঠান, অন্যথায় দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। এই পাল্টাপাল্টি আইনি নোটিশ ও মামলার কারণে মিষ্টি জান্নাতকে বেশ বড় ধরনের আইনি ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

এ ছাড়াও কণ্ঠশিল্পী মমতাজ, অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী, রিয়াজ আহমেদ, ইরেশ যাকের, ফেরদৌস আহমেদ, সিদ্দিক, অভিনেত্রী শমী কায়সার, মেহের আফরোজ শাওন, রোকেয়া প্রাচীসহ অনেকেরই আইনি জটিলতায় নাম জড়িয়েছে।

রুপালি পর্দার মোহনীয় জগতের আড়ালে তারকাদের এই দীর্ঘ আদালত-যাত্রা ও মামলার বিবরণী প্রমাণ করে যে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউই নন। ভক্তদের প্রত্যাশা, আইনি জটিলতার এই কালো মেঘ কাটিয়ে দেশের এই গুণী অভিনয়শিল্পীরা খুব দ্রুতই আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন এবং তাদের মূল চারণভূমি অর্থাৎ অভিনয়েই পুরোপুরি মনোনিবেশ করবেন।