বাংলা সাহিত্যকে যেমন তিনি আমূল বদলে দিয়েছিলেন, ঠিক তেমনি নাটক, সিনেমা আর সংগীতের আঙিনাতেও এক অবিস্মরণীয় সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ। বইয়ের পাতা থেকে জীবন্ত হয়ে ওঠা তার একেকটি চরিত্র কিংবা সেলুলয়েডের ফিতায় বোনা একেকটি দৃশ্য আজও বাঙালিকে হাসায়, কাঁদায় ও নস্টালজিক করে তোলে।
আজ নন্দিত এই কথাসাহিত্যিকের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১২ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে ক্যানসারের চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার প্রয়াণের পর এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে তার তৈরি করা শূন্যতা অপূরণীয়।
১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। ১৯৭২ সালে তার প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ দিয়ে বাংলা সাহিত্যে যে আলোড়ন তুলেছিলেন, তা আজও ম্লান হয়নি। নুহাশ পল্লীর শান্ত পরিবেশে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত থাকলেও, কোটি পাঠকের হৃদয়ে তিনি বেঁচে আছেন এবং থাকবেন তার অমর সৃষ্টির মাধ্যমে।
নব্বইয়ের দশকে ঢাকাই সিনেমার যখন চরম ক্রান্তিকাল, তখন ভিন্ন ধারার গল্প আর নান্দনিক নির্মাণশৈলী নিয়ে চলচ্চিত্র পাড়ায় আগমন ঘটে হুমায়ূন আহমেদের। মধ্যবিত্ত পরিবারকে তিনি সিনেমা হলমুখী করেছিলেন।
১৯৯৪ সালে ‘আগুনের পরশমণি’ দিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালনায় আসার পর থেকে তিনি বাংলা সিনেমাকে দিয়েছেন এক নতুন গতিপথ। তার নির্মিত অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘চন্দ্রকথা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’, ‘আমার আছে জল’, ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ প্রভৃতি।
ইন্টারনেট বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বহু আগেই, আশির দশক থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত বিটিভির পর্দায় পুরো বাংলাদেশকে আটকে রাখতেন তিনি। তার নাটক প্রচারের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যাওয়ার গল্প আজ রূপকথা মনে হয়। ‘এই সব দিনরাত্রি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আজ রবিবার’, ‘বহুব্রীহি’ ও ‘অয়োময়’-এর মতো পারিবারিক মূল্যবোধ, প্রগতিশীল চিন্তা এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত অসংখ্য দর্শকপ্রিয় নাটক উপহার দিয়েছেন তিনি।
হুমায়ূন আহমেদ কেবল চমৎকার দৃশ্যই তৈরি করতেন না, তিনি ছিলেন একজন অসামান্য সুররসিক ও গীতিকার। তার নিজের লেখা এবং তার চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত লোকগানগুলো বাঙালি শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। ‘একটা ছিল সোনার কন্যা’, ‘যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো’, ‘চাঁদনী পসরে কে আমারে স্মরণ করে’ কিংবা ‘ও আমার উড়াল পঙ্খীরে’ গানগুলো আজও প্রতিটি বাঙালির মন ভালো ও খারাপের সঙ্গী।
হাছন রাজা ও উকিল মুন্সীর গানকে তিনি তার ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ও ‘চন্দ্রকথা’ সিনেমার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় করে তোলেন। ‘মানুষ ধরো মানুষ ভজো’ কিংবা ‘পুবালী বাতাসে’ গানগুলো তারই উদাহরণ।
নুহাশ পল্লীর লিচুতলায় হুমায়ূন আহমেদ আজ শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন। তবে তার অমর সৃষ্টিÑ তা হোক হিমুর হলুদ পাঞ্জাবি, বাকের ভাইয়ের চশমা, কিংবা ‘সোনার কন্যা’র মিষ্টি সুরÑ বাঙালি সংস্কৃতির পরতে পরতে আজীবন অম্লান থাকবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন